
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা, চট্টগ্রাম : একটি সুস্থ পুঁজিবাজার গড়ে তোলাই কমিশনের প্রধান কাজ বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেন।
তিনি বলেন, একটি সুস্থ বাজার গড়ে তুলতে কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেওয়া। আপনারা যারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেভিংস করেন, তারা শেয়ারবাজারে আসেন। আপনাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দিতে আমরা সর্বেোচ্চ চেষ্ঠা অব্যাহত রাখবো।
শনিবার (৩০ মার্চ) চট্টগ্রাম নগরীরর ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে আয়োজিত ‘বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা কনফারেন্স’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ঘোষিত দেশব্যাপি বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এ কনফারেন্সের আয়োজন করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, বিনিয়োগ সুরক্ষার প্রধান উপায় হলো বিনিয়োগ শিক্ষা। দ্বিতীয় উপাদান হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের জন্য অল্টারনেটিভ প্রোডাক্ট বের করা। আর তৃতীয় উপাদান হিসেবে রয়েছে বাজারে স্ট্যাবেলিটি মেইনটেইন করা। সর্বশেষ ও চতুর্থ উপাদান হচ্ছে- যারা ভিন্ন উপায়ে বাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাদেরকে শাস্তি আওতায় আনা।
তিনি বলেন, শেয়ারবাজার থেকে সর্বোচ্চ রিটার্ন পাওয়ার জন্য বিনিয়োগ শিক্ষা অতি প্রয়োজনীয়। কারন এর মাধ্যমে যার কাছে যেটুকু পুঁজি আছে, তা সচেতনভাবে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়। এরফলে বিনিয়োগে ঝুঁকি কমে আসে এবং লাভের সম্ভাবনা বেশি তৈরী হয়। তাই বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসারে স্টক ডিলার, ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংকারসহ সব স্টেকহোল্ডাররাও কাজ করছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীরা যদি অবিবেচনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ হন, তা পুষিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই। তবে আপনাদের সাথে কেউ প্রতারণা করলে, তার দায়িত্ব অবশ্যই আমরা নেব। কিন্তু আপনার ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষতির দায়িত্ব নেব না। সার্ভিলেন্স সফটওয়্যার স্থাপনের ফলে শেয়ার লেনেদেনে কেউ অসৎ উপায় অবলম্বন করলে, তা সঙ্গে সঙ্গে সনাক্ত করা সম্ভব। এছাড়া শেয়ারবাজার বিষয়ক ট্রাইবুন্যালের মাধ্যমেও অপরাধীদেরকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। দেশের শেয়ারবাজারে আরেকটি ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের মতো ধস সৃষ্টির সুযোগ নাই। বিগত কয়েক বছরে নানা সংস্কারের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের ভিত্তি মজবুত করা হয়েছে।
ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, ব্যাংক থেকে একবার ঋণ নিলে, তা ফেরত দিতে হয়। সুদও দিতে হয়। অথচ ব্যাংকগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন করে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের দায়িত্ব শেয়ারবাজারের। যেসব ঋণ খেলাপি হয়েছে এবং কখনো আদায় করা যাবে না, সেগুলো বন্ধ হবে যদি দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বন্ধ করে। তাহলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই শেয়ারবাজার থেকে অর্থায়ন করবে। তাহলে এই বাজারে তারল্যও বাড়বে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘শেয়ারবাজারে সবাই বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু আমি বলব শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের প্রধান হাতিয়ার হলো জ্ঞান। এর মাধ্যমে কোথায় ও কোন ধরনের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে হবে এবং কখন বের হয়ে যেতে হবে-তার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।’
তিনি বলেন, সকল বিনিয়োগকারীর মাঝে সচেতনতা তৈরী করার জন্য বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তারা যেন জেনে বুঝে বিনিয়োগ করে, জেনে শুনে নয়। জেনে শুনে বিনিয়োগ করলে লোকসানের সম্ভাবনাই বেশি। কারন যার কাছে শুনতে যাবেন, সেই তার কেনা শেয়ার বেশি করে কিনতে বলবে। আর কিনতে গেলেই তারা বিক্রয় করে বেরিয়ে যাবে। তখন লোকসানে পড়তে হবে। কাজেই আপনি যে তথ্য পেলেন তা, যদি ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা না থাকে, তাহলে কখনো লাভবান হতে পারবেন না।
শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কমিশন কাজ করছে বলেও জানান বিএসইসি চেয়ারম্যান।
এলক্ষ্যে বন্ড মার্কেটকে সেকেন্ডারিতে আনার কাজ শুরু করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংককে হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ড অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এগুলোকে সেকেন্ডারি মার্কেটে আনা হবে। এগুলোতে ফিক্সড ইনকাম আছে। এছাড়া অন্যান্য ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজ শেয়ারবাজারে আনা হবে।
তিনি বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে ধনী রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়ানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী তৈরী করার কথা বলেছেন।প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার সৃষ্টিকারীর ভূমিকার মাধ্যমে শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করবে।
মধ্যম ও নিম্ন উদ্যোক্তাদের জন্য বোর্ড গঠনের জন্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন বলে জানিয়েছেন ড. এম খায়রুল হোসেন। এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হবে ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কোন কার্যক্রম সফল হবে না। যদি বিনিয়োগ শিক্ষা দেশব্যাপি সম্প্রসারিত করতে না পারি।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় টেক্স কারিকুলামে বিনিয়োগ শিক্ষাকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও পাঠ্যবইয়ে বিনিয়োগ শিক্ষাকে অন্তর্ভূক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ সময় শিক্ষা উপমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, আমরা ২০২০ সালে একটি পূর্ণ কারিকুলাম তৈরী করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেব। এতে শুধুমাত্র শেয়ারবাজার অন্তর্ভূক্ত হবে না; বরং আর্থিক বাজার, সেভিংস, ডিপোজিট বিষয়েও তুলে ধরা হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী, ড. স্বপন কুমার বালা ও খন্দকার কামালউজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও কনফারেন্সে চট্ট্রগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শত শত বিনিয়োগকারী উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের ৮ই জানুয়ারি দেশে শিক্ষিত ও সচেতন বিনিয়োগকারী গড়ে তুলতে দেশব্যাপি বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর থেকে বিএসইসি ও এর স্টেকহোল্ডাররা ধারাবাহিকভাবে দেশের বিভন্ন অঞ্চলে এ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বিএসইসির দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ি এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২৬ হাজার লোককে সরাসরি বিনিয়োগ শিক্ষিত করা হয়েছে। এছাড়া অন্তত কয়েক লক্ষ লোক পরোক্ষভাবে বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে বলে জানায় সংস্থাটি।
(এমএ/এসএএম/ ৩০ মার্চ ২০১৯)