
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে টালমাটাল বিশ্ব অর্থনীতি। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিবাদ নিরসনে কয়েক দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও সমাধানের দেখা মেলেনি, উল্টো বাণিজ্যযুদ্ধের তীব্রতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির মধ্যকার বাণিজ্য বিবাদের কারণে অনেক দেশ লাভবানও হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সুযোগের ফায়দা লোটার দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ভিয়েতনাম। আমদানিকারকরা উচ্চতর শুল্ক এড়ানোর জন্য নিজেদের বাণিজ্য অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার কারণে এখন পর্যন্ত লাভবান দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে দেশটি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনাম। চীনের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে দেশটির।
নমুরা হোল্ডিংস ইনকরপোরেটেড অর্থনীতিবিদ রব সুব্বারামান, সোনাল ভার্মা ও মাইকেল লুরের করা গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৯ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত এক বছরে শুল্ক আরোপিত পণ্যের বাণিজ্য ডাইভারশনের কারণে ভিয়েতনাম যে পরিমাণ আদেশ পেয়েছে, তা দেশটির জিডিপির ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। লাভবানদের তালিকায় দ্বিতীয় তাইওয়ান, যারা পেয়েছে জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ আদেশ। উভয় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর চীনের বাড়তি শুল্কারোপের চেয়ে চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন বাড়তি শুল্কারোপের কারণে বেশি লাভবান হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মার্কিন-চীন বাণিজ্য বিবাদের জের ধরে বাড়তি শুল্কারোপকৃত ১ হাজার ৯৮১ পণ্যের মধ্যে অর্ধেকের বেশি পণ্যের মার্কিন ও চীনা আদেশ নতুন উৎস খুঁজে নিয়েছে। এতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নতুন বিজয়ী ও ক্ষতিগ্রস্ত সৃষ্টি হয়েছে।
নমুরা শুল্কারোপকৃত পণ্যের তালিকার সঙ্গে ওইসব পণ্যের মাসিক বাণিজ্য তথ্যের তুলনা করেছে। হিসাব করেছে ২৫ হাজার কোটি ডলারের চীনা পণ্য ও ১১ হাজার কোটি ডলার মার্কিন পণ্যকে। বিশ্লেষকরা খতিয়ে দেখেছেন ১২ মাস সময়ে বিশ্বের শীর্ষ ৫০ লাভবান অর্থনীতিকে।
চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্কারোপ প্রধান ইলেকট্রনিক পণ্যের বিকল্প আমদানি উৎস খোঁজা জোরদার করেছে। এরপর রয়েছে আসবাব ও ভ্রমণ পণ্য। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের পর চীনা শুল্কারোপকৃত, সয়াবিন, এয়ারক্রাফট, শস্য ও তুলার জন্য আদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরে গিয়ে তৃতীয় দেশ যেমন চিলি ও আর্জেন্টিনায় চলে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনে কার্যক্রম পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে বাড়তি শুল্কারোপ এড়াতে অন্য গন্তব্যে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। বহু কোম্পানি বাড়তি শুল্কারোপ নেই এমন দেশগুলোয় যাওয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আর এতে ক্রমেই ব্যবসাবান্ধব হয়ে ওঠা ভিয়েতনাম সবচেয়ে লাভবান হচ্ছে।
ভিয়েতনামের সস্তা শ্রম ও আকর্ষণীয় ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে চীনে কার্যক্রম পরিচালনাকারীসহ অন্যান্য বিদেশী কোম্পানি আগ্রহী হয়ে উঠছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো চীনা পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এর আগে থেকেই দেশটির প্রতি বিদেশী কোম্পানিগুলোর আগ্রহ ছিল। বাণিজ্যযুদ্ধ এ আগ্রহের পালে জোর হাওয়া দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের মেরি লাভলি বলেন, চীনে মজুরি বৃদ্ধির কারণে এরই মধ্যে লাভবান হতে শুরু করেছে ভিয়েতনাম।
এদিকে গত বছর চীনা পণ্যের মার্কিন শুল্কারোপ শুরুর পর থেকে দেশটিতে বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে। ২০১৮ সালে ভিয়েতনামে চীনের বিনিয়োগের ৬৫ শতাংশ এরই মধ্যে ২০১৯ সালে প্রথম চার মাসে করা হয়েছে।
বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে দেশে বিপুল পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ আসায় ভিয়েতনামের প্রবৃদ্ধির গতি বেড়েছে। তবে প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি ভিয়েতনামের অর্থনীতির ওপর চাপও সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, (আইএলও) ২০১৮ সালে ভিয়েতনামে শিল্প খাতে কাজ করা লোকের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ১ কোটি ৪৫ লাখ। অন্যদিকে চীনে কাজ করেন ২০ কোটির বেশি।
মে মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ২০ হাজার কোটি ডলার সমমূল্যের চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধের তীব্রতা আরো বেড়ে গেছে। এবং দুই দেশের মধ্যে আপাতত আলোচনা বন্ধ থাকায় শিগগিরই যে বাণিজ্যযুদ্ধের ইতি ঘটবে এমনটা মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। আর বাণিজ্যযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ভিয়েতনামের লাভের পরিমাণ আরো বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই বিশ্লেষকদের। সূত্র: ব্লুমবার্গ।
(এসএএম/ ১০ জুন ২০১৯)