
পুঁজিবাজারে লোকসান করলেই লাভ করার রাস্তা তৈরি হয় বলে মনে করেন ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক ও বিএলআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন। এছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য আইনি কাঠামো তৈরি একইসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কোম্পানিগুলোকে তালিকাভূক্ত করতে সরকারের সদিচ্ছা থাকা জরুরী বলেও মনে করেন তিনি। একইসঙ্গে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে ভাল মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে তালিকাভূক্ত করার জোরালো উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
বিনিয়োগবার্তা’র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব কথা বলেন ডিএসইর এই পরিচালক।
মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বাজারে একটি ভালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিছুদিন পরই আবার নেতিবাচক অবস্থা তৈরি হলো। এই হোঁচট খাওয়ার পেছনে যেসকল কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছিল এর মধ্যে- তারল্য সংকট, আস্থার সংকটের পাশাপাশি আইপিও’র নীতিমালায় অনেক অসামঞ্জস্যতার বিষয়গুলো খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রথমত, আইপিওতে স্পন্সরদের শেয়ার দেওয়া, প্লেসমেন্ট দেওয়া এবং পাবলিক অফারিংগুলোর মধ্যে পারসেন্টেজে ব্যাপক অসামঞ্জস্যতা ছিল। আইপিওতে স্পন্সরদের আইন অনুযায়ী ৩০ শতাংশ শেয়ার থাকে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্লেসমেন্টে ৫০-৬০ শতাংশ শেয়ার চলে যায়। আর পাবলিকের কাছে যে পরিমাণ শেয়ার ছাড়া হয় তা মাত্র ১৫-২০ শতাংশ। এই পাবলিকের অংশের মধ্যেই রয়েছে ৪০ শতাংশ ইলিজিবিল ইনভেস্টর, ১০ শতাংশ এনআ
রবি, ১০ শতাংশ মিউচ্যুয়াল ফান্ড এবং ৪০ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারী। অর্থাৎ টোটাল আইপিও’র মাত্র ১০-১৫ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়।
“বিনিয়োগকারীদের লাভ-লস দুটোই গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। লস করলেন আর হতাশ হয়ে বাজার ছেড়ে চলে গেলেন-তাহলে কিন্তু হবে না। এখানে ধৈর্য্য সহকারে টিকে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, লোকসান করলেই কিন্তু লাভ করার রাস্তা তৈরি হয়।”
এই অল্প পরিমান শেয়ারেই সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ২০/৩০ গুন আবেদন করে। এতে স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে মনে হয় শেয়ারটির অনেক ডিমান্ড। আসলে কিন্তু কম শেয়ার দেওয়ার কারণে কৃত্রিম ডিমান্ড তৈরি হয়। ফলে বাজারে এসে প্রথম দিকে নতুন শেয়ারের একটা অযৌক্তিক দাম হয়। একবছর লকইনের পরে প্লেসমেন্টের শেয়ারটি বাজারে বিক্রি করে প্লেসমেন্ট হোল্ডাররা লাভ তুলে নেওয়ার পর দামের ব্যাপক পতন হয়।
ডিএসইর এই পরিচালক বলেন, মূলত এই প্লেসমেন্ট যারা নিচ্ছে তাদের বেশিরভাগই উদ্যোক্তার নিকটবর্তী লোকজন। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে মনে হচ্ছে যে খুব একটা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি হয়েছে, প্রচুর বিনিয়োগ আসছে। আসলে কিন্তু তা নয়। প্লেসমেন্ট বাণিজ্যটা কিছু লোকের হাতে চলে যাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঐ প্লেসমেন্ট ধারীদের লাভ করানোর জন্য কোম্পানিগুলো ইস্যু ম্যানেজারের সঙ্গে মিলে বা অডিটরের সঙ্গে মিলে নিরীক্ষিত প্রতিবেদনের ভেতরে নানারকম অসঙ্গতি তৈরি করেছে।
ফলে দেখা যাচ্ছে, বাজারে যে বিনিয়োগটা সুস্থভাবে হওয়ার কথা সেটি হচ্ছে না। প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডাররা অল্প টাকায় নিয়ে অতি অল্প সময় বিনিয়োগ করে বাজারে বেশি দরে বিক্রি করে লাভ নিয়ে চলে যাওয়াতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে| যে কারণে আইপিও কোম্পানি বাজারে আসার দেড়-দুই বছর পর শেয়ার দর কমে যায়।
তবে নানা তর্ক-বিতর্ক এবং অংশীজনদের দাবির প্রেক্ষিতে সম্প্রতি আইপিও নীতিমালা বিষয়ে কমিশন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিএসইসির কাছে আমাদের জোরালো দাবি ছিল যে, এই আইপিও নীতিমালা সংশোধন করা হোক। একপর্যায়ে এ দাবি এতো জোরালো হলো যে, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আইপিও সংক্রান্ত কিছু মতামত প্রদান করে। এরপর বিএসইসির চেয়ারম্যান সাহেব জানালেন শিগগিরই আইপিও নীতিমালার সংশোধন আসবে এবং প্লেসমেন্টসহ অন্যান্য লকইনের বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত আসবে। বাজারসংশ্লিষ্ট সবাই প্লেসমেন্ট লকইন বাড়ানোর বিষয়ে একমত পোষণ করে। শুধু মার্চেন্ট ব্যাংক এসোসিয়েশন দুই বছর লকইন চেয়েছে আর অন্যরা চায় তিন বছর লকইন। অবশেষে দুই বছর লকইন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। ট্রেডিংয়ের দিন থেকে যদি এই দুই বছর গণনা করা হয়, সেটিও বাজারের জন্য ভালো। এই দুইটা বছর কোম্পানির কিন্তু ভালো ডিভিডেন্ড দিতে হবে।
“বাংলাদেশের মার্কেটের যে ডেপথ, যে টার্নওভার, তাতে এটা কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় মার্কেট নয়। তারা লাভের জন্য আসে। যখন তারা লাভ দেখবে তারা এমনিতেই আসবে। এজন্য সে সুযোগটি তৈরি করে দিতে হবে।”
নতুন আইপিও নীতিমালা নিয়ে মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, আইপিওর ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কোটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এখানে আপাত ১০ শতাংশ কোটা বাড়ানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে কিন্তু এতে টোটাল আইপিওেআবেদনকারীর পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে। কারণ, এখন যে সিস্টেমে আইপিওগুলো আসবে তাতে ন্যূনতম একটা পরিমাণ আইপিও অফারিং হতে হবে এবং পেইড আপ কত হবে সেটিও নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। নতুন আইপিও নীতিমালায় এই যে বাধ্যবাধকতাগুলো করা হয়েছে, এর ফলে পাবলিকের শেয়ারের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়ে যাবে। আগে যে পরিমাণ শেয়ার পাবলিক পেতো তার চেয়ে এখন বেশি পরিমাণ শেয়ার পাবে। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আর বাজার ছেড়ে যাবে না।
বুক বিল্ডিংয়ে কৃত্রিমভাবে দর বৃদ্ধির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে বুক বিল্ডিংয়ের সিন্ডিকেট করে প্রাইস মেক করার একটি অভিযোগ ছিলো। কিন্তু এখন আর আগের মতো এভারেজ প্রাইসে হবে না। যেই বিডার যে প্রাইসে আবেদন করবে তাকে সেই প্রাইসেই শেয়ারটি নিতে হবে। ফলে এখানে সিন্ডিকেটের প্রাইস করার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক কমে যাবে। যদিও এর প্রভাব রাতারাতি পাওয়া যাবে না। এজন্য আরও সময় অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, যাদের আইপিও কমিশনে জমা দেওয়া আছে বা বিডিং সম্পন্ন করে ফেলেছে তারা আগের নিয়মেই আসবে। নতুনগুলোর জন্য এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে।
স্মল ক্যাপ মার্কেটে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বিষয়ে ডিএসইর এই পরিচালক বলেন, সবগুলো মার্কেটতো সবার জন্য থাকার দরকার নেই। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্যতো পাবলিক আইপিও আছেই। স্মল ক্যাপ মার্কেট যেটি করা হয়েছে সেখানে ৩০ কোটি টাকার নিচে যাদের টাকার প্রয়োজন সেই আইপিগুলো আসবে। সেক্ষেত্রে অনেক রুলস- রেগুলেশনস দেওয়া আছে। এটি একটি আলাদা মার্কেট। ছোটো ছোটো উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য এই মার্কেট করা হয়েছে।
“আইপিওর ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের কোটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে টোটাল আইপিও আবেদনকারীর পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে যাবে। আগে যে পরিমাণ শেয়ার পাবলিক পেতো তার চেয়ে এখন বেশি পরিমাণ শেয়ার পাবে। ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আর বাজার ছেড়ে যাবেনা।”
বহুজাতিক ও সরকারি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির বিষয়ে মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আনার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আসলে এটার জন্য আইনী কাঠামো তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন প্রণয়ন করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন হলে কিংবা নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত হতে হবে-এমন আইন তৈরি করতে হবে। এককথায় তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যেকোন ক্রাইটেরিয়া বেঁধে দিতে হবে। এর সঙ্গে প্রয়োজনে তাদেরকে বিভিন্ন ইনসেনটিভ দিতে হবে| তাহলেই পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তালিকাভুক্ত হবে। আর সরকারি কোম্পানি বাজারে আসার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ সরকারের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। কারণ, সরকার যদি আন্তরিকভাবে না চায় তাহলে কখনোই সরকারি কোম্পানি লিস্টেড করানো যাবে না। একসময় ডেসকো, পাওয়ারগ্রীড, তিতাস ডিরেক্ট লিস্টিংয়ে বাজারে এসেছে এবং তখন কিন্তু কোম্পানিগুলো ভালো দাম পেয়েছিল। কারণ, সরকারি কোম্পানির শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রবল আগ্রহ ছিল যা এখনো রয়েছে। কিন্তু দুখ:জনক হলেও সত্য যে, দীর্ঘ সময় ধরে শুধু মুখে বলা হচ্ছে কিংবা এক/দুটি মিটিং করেই দায় সাড়া হচ্ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই বলছি, মাল্টিন্যাশনাল এবং সরকারি কোম্পানির শেয়ার আনার ব্যাপারটি পুরোপুরি সরকারের ওপর নির্ভরশীল। আমরা দাবী জানাতে পারি, আবেদন করতে পারি, আন্দোলন করতে পারি, কিন্তু রেজাল্ট হচ্ছে সরকার না চাইলে হবে না।
“পুঁজিবাজারে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আনার জন্য আইনী কাঠামো তৈরি করতে হবে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইন প্রণয়ন করতে হবে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন হলে কিংবা নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হলে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে তালিকাভুক্ত হতে হবে-এমন আইন তৈরি করতে হবে।”
বিদেশি লেনদেন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন রকমের পরামর্শ দেন মিনহাজ মান্নান ইমন। তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রণ করে আসলে কাউকে ধরে রাখা যায় না। বরং তাকে মুক্ত করে দিতে হবে- সে ইচ্ছে মতো শেয়ার কিনবে, বিক্রি করবে। যত নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হবে, তত বিনিয়োগ কম হবে। এতো বেশি নিয়ন্ত্রণ দেখেই আমাদের এখানে বিদেশিরা লেনদেন করতে আসতে চান না। কারণ, বিনিয়োগের পর তাকে লাভ করতে হবে, তাকে টাকা নিয়ে বের হতে হবে। এটা ফ্রি মার্কেট, যারা এখানে আসে তারা প্রত্যেকেই লাভের জন্যই আসে। কেউতো এখানে গল্প, কবিতা

লেখার জন্য আসে না। তাই তাকে যদি লাভ নেওয়ার সুযোগ করে না দেওয়া হয়, টাকা স্থানান্তর করার সুযোগ না দেওয়া হয়, রেমিট করার সুযোগ না দেওয়া হয় তাহলে বিনিয়োগে আসবে না। তবে আইনী কাঠামোতে দেখতে হবে তারা বেআইনী কিছু করছে কিনা। টাকা আনলো এক পথে কিন্তু নিয়ে গেলো অন্য পথে- সেগুলোকে অবশ্যই দেখতে হবে। এ বাজারে অল্পকিছু বিদেশি ফান্ড আছে সেগুলো দীর্ঘকাল ধরেই আছে। তারাও মার্কেটের আকর্ষণ দেখে আসে নি। তাদেরকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে এখানে বিনিয়োগে আনা হয়েছে। নতুন করে কিন্তু খুব বেশি বিদেশি ফান্ড নিয়ে আসছে না। তারা যে শুধু আইনের জন্য আসে না তা নয়। বাংলাদেশের মার্কেটের যে ডেপথ, যে টার্নওভার, এটা কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় মার্কেট নয়। তারা লাভের জন্য আসে। যখন তারা লাভ দেখবে তারা এমনিতেই আসবে। এজন্য সে সুযোগটি তৈরি করে দিতে হবে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে পুঁজিবাজারের এই অভিজ্ঞজন বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য সবসময় একটাই কথা যে, জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। যখনই আপনি না জেনে বিনিয়োগ করবেন, যখনই শিক্ষিত না হয়ে বিনিয়োগ করবেন তখনই আপনাকে ক্ষতির সম্মুখিন হতে হবে। বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়ী মনোভাব নিয়ে বাজারে আসতে হবে। লাভ বা লস হবে- সেই মনোভাব নিয়েই বাজারে থাকতে হবে। এটি গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। লস করলেন আর হতাশ হয়ে বাজার ছেড়ে চলে গেলেন-তাহলে কিন্তু হবে না। এখানে ধৈর্য্য সহকারে টিকে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে লোকসান করলেই কিন্তু লাভ করার রাস্তা তৈরি হয়।
( এমআরআই/ এসএএম/ ০২ নভেম্বর ২০১৯)