
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: বিনিয়োগকারীদের দুশ্চিন্তা আরো বাড়িয়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আরো এক বছর যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি হচ্ছে না, তা অনেকটাই স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এ ঘোষণায় গতকাল এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা দেয়। খবর রয়টার্স।
মঙ্গলবার ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছেন, বেইজিংয়ের সঙ্গে একটি চুক্তি করার জন্য তার সামনে কোনো ‘ডেডলাইন বা নির্দিষ্ট তারিখ’ নেই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, চীনের সঙ্গে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে তিনি আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান। তবে চীনারা এখনই চুক্তি করতে চায়। আমরা দেখতে চাইছি চুক্তিটি সঠিক হচ্ছে কিনা। চুক্তিটিকে অবশ্যই সঠিক হতে হবে।
১৫ ডিসেম্বর চীনা পণ্যের ওপর আরেক দফা শুল্ক আরোপের কথা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। ট্রাম্পের এ বক্তব্য বলছে, তারা এ সিদ্ধান্ত থেকে হয়তো পিছু হটবে না।
এর আগে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর এবং ফ্রান্সের ২৪০ কোটি ডলারের শ্যাম্পেন, হ্যান্ডব্যাগ, পনির ও অন্যান্য পণ্যের ওপর শতভাগ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। ওই দেশগুলো পাল্টা জবাব দেবে বলে জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এতে বিশ্বজুড়ে শুল্কযুদ্ধের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে। এবার চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি করতে আরো সময় লাগবে বলে জানালেন ট্রাম্প। অর্থাৎ বিশ্বের দুই শীর্ষ অর্থনীতির বাণিজ্যযুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে, যেটি বিনিয়োগকারীদের জন্য দুঃসংবাদই বটে।
প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। দেশ দুটি পরস্পরের কয়েক হাজার ডলারের ওপর পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপ করেছে। এ যুদ্ধের কারণে দেশ দুটির যেমন নিজের ক্ষতি হচ্ছে, তেমন বড় বিপাকে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীরা আরো সতর্ক করে উঠেছেন। এর প্রভাব পড়েছে এশিয়ার শেয়ারবাজারে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে, এতে বেড়েছে বন্ডের মূল্য এবং স্বর্ণের দাম পৌঁছায় এক মাসের সর্বোচ্চে।
গতকাল জাপানের বাইরে এশিয়া প্যাসিফিকের এমএসআইসি বিস্তৃত সূচক কমে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। জাপানের নিক্কেইয়ের সূচক কমে ১ দশমিক ২ শতাংশ। হংকং ও কোরিয়ার শেয়ারবাজারে একই ধরনের পতন দেখা গেছে, যা ছিল অক্টোবরের পর তাদের সর্বোচ্চ পতন। সাংহাই ব্লু চিপস সিএসআই-৩০০ কমে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এসঅ্যান্ডপি/এএসএক্স-২০০ কমে ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রভাব পড়েছে মার্কিন শেয়ারবাজারেও। বেঞ্চমার্ক এসঅ্যান্ডপি-৫০০ সূচকের পতন হয় ১ দশমিক ২২ শতাংশ, যা প্রায় দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন।
বাণিজ্যযুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট অনিশ্চয়তা যুক্তরাষ্ট্র ও বাকি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ‘ট্যারিফ ম্যান’ ট্রাম্পের উচিত ছিল সমঝোতা নিয়ে ইঙ্গিত দেয়া, কিন্তু তিনি উল্টো পথে হাঁটছেন।
মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ও কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো জেনিফার হিলম্যান বলেন, বাণিজ্যযুদ্ধ অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে এবং ট্রাম্প এজন্য অনেকাংশে দায়ী।
চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেইজিং ও ওয়াশিংটনের সূত্রগুলো জানিয়েছে, দুই দেশ বেশকিছু বিষয়ে এগিয়েছে, তবে এখনো চীনা পণ্যের ওপর আরোপ করা মার্কিন শুল্ক তুলে নেয়া ও চীনের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে।
বেইজিংকে চুক্তি আলোচনায় সহায়তা করে এমন একটি সূত্র জানিয়েছে, চীনা পক্ষ শুল্ক তুলে নেয়ার দাবি জানাবেই, কেননা তারা আরো বেশি মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এভাবে লেনদেন চলবে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনভিত্তিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র কিছু শুল্ক তুলে নিতে ইচ্ছুক, তবে তারা প্রযুক্তিগত বিষয়ে বেইজিংয়ের কাছ থেকে আরো ছাড় চায়।
বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ১ সেপ্টেম্বর সাড়ে ১২ হাজার কোটি ডলারের চীনা পণ্যে যে ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছিল, তা তুলে নেয়া হতে পারে।
তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ বক্তব্য চীনা কর্মকর্তাদের চিন্তায় ফেলবে। আদৌ ট্রাম্প একটি বাণিজ্য চুক্তি করতে চান কিনা তা নিশ্চিত হতে নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হবে তাদের।
( এসআর /০৫ ডিসেম্বর ২০১৯)