করোনায় নরসিংদীর সবজি বাজারে ধস; বিপাকে চাষীরা

মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা, নরসিংদী: করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে সাধারণ ছুটি ও গণপরিবহণ বন্ধের কারণে নরসিংদীর পাইকারী সবজির বাজারে ধস নেমেছে। কাঁচা বাজারগুলোতে ক্রেতাদের আনা গোনা কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। সবজি উৎপাদনে নরসিংদী জেলার খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। এ জেলার উৎপাদিত ৭৫% সবজি দেশের বিভিন্ন জেলাসহ বিদেশে রপ্তানী হয়। সবজি উৎপাদনে দেশে অন্যতম জেলা নরসিংদীর পাইকারী বাজারগুলোতে গত তিন সপ্তাহ ধরে নেই ক্রেতা সমাগম, সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশে বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে না। ক্রেতাশূন্য হয়ে পড়ায় পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না কৃষকেরা। একদিকে নির্দিষ্ট সময় হলে সবজি ক্ষেতে রাখা যায় না, অন্যদিকে এসব উৎপাদিত সবজি পচনশীল পণ্য হওয়ায় কৃষকরা তা কম দামে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। সবমিলিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন জেলার সবজি চাষীরা।

মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকাল থেকে সরেজমিনে বারৈচা, নারায়ণপুর, জঙ্গি শিবপুর, যোশরসহ নরসিংদীর বিভিন্ন পাইকারী সবজি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ক্রেতাশূণ্য বাজারগুলো। যে দু’একজন ক্রেতা দেখা গেছে তারা স্থানীয়।

এসময় কৃষকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের উৎপাদিত সবজি ভ্যান রিক্সায় করে নিয়ে এসে সারাদিনে রোদে পুড়ে ক্রেতাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। যাও দু’একজন ক্রেতার সাক্ষাৎ মিলছে তারা ন্যায্য মূল্য দূরের কথা স্বাভাবিক দামও দিচ্ছে না। যে দামে তাদেরকে সবজি বিক্রি করতে হচ্ছে তাতে কোনরকমে ভ্যানের ভাড়া পরিশোধ করতে পারছে। তাই অনেকে ক্ষেতের সবজি ক্ষেতেই নষ্ট করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে লোকসানের শিকার হবেন কৃষকেরা। বর্তমান সময়ে বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতিমন বেগুন প্রকার বেধে ১০০ থেকে ২৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। উচ্ছে প্রতিমন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, টমাটো ১০০ থেকে ২০০ টাকা, সিম ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা, ঢেরস ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, শশার ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, বরবটি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, ঝিঙে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা, লাউপ্রতিটি ৮ থেকে ১০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতিটি আকার বেধে ২০ থেকে ৪০ টাকা, ডাটা প্রতি আটি (৮০টি) ২০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি পাল্লা (৫ কেজি) ১৫০-১৭৫ টাকা, বাজারে আসা নতুন সবজি সজনে প্রতি আটি (২০টি) ২০ টাকা।

বারৈচা পাইকারী সবজি বাজারে আসা কৃষকেরা জানান, লোকসানে সবজি বিক্রি করে কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামীতে সবজির দাম আরও কমে যেতে পারে বলে তাদের ধারণা। আর তখন পরিবার নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।

কৃষকদের দাবি, সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব সবজি ঢাকায় নেওয়া হোক। একইসঙ্গে সবজি চাষীদের সরকারি সহযোগিতা দেওয়ার দাবিও জানান তারা।

বাহেরচর এলাকার কৃষক মো: কাসেম বলেন, “ক্ষেতের টমেটো পেকে লাল হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তোলার সাহস পাচ্ছি না। যদিও কিছু তুলেছি কিন্তু বাজারে তেমন কোন  ক্রেতা পাওয়া যায় নি ফলে পানির দরে বিক্রি করতে হয়েছে।”

নারায়ণপুর এলাকার কৃষক হোসেন আলী জানান, গত কয়েক দিনে বাজারে সবজির দাম যেভাবে পড়ে গেছে তাতে লাভ তো দূরের কথা, মনে হয় পুঁজিও উঠাতে পারবো না। প্রতি কেজি টমেটোর পেছনে ৬ থেকে ৭ টাকা খরচ পড়ে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদেরকে লোকসান গুণতে হবে।

নিলক্ষ্যা গ্রামের কৃষক হরমুজ আলী জানান, অনেক খরচ করে চরে উচ্ছে আবাদ করে বিপাকে পড়েছেন তিনি। হাটে এনে ২৫০-৩৫০ টাকা মণ দরে উচ্ছে বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে উচ্ছে মাঠ থেকে তোলার খরচই উঠছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘মাত্র মাস খানেক আগে এই উচ্ছা খেতেই বেচছি ৭০-৮০ টাকা কেজি আর অহন তা মন বেচতে হয় ২৫০- ৩০০ টাকা।’

বাজারে আসা এক পাইকার বলেন, করোনার কারণে কোন যানবাহণ চলছে না যার কারণে মাল ঢাকায় পাঠানো যাচ্ছে না ফলে আমরা কেউ মালও কিনছি না।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচলক শোভন কুমার ধর বলেন, ‘নরসিংদীতে সারা বছর সবজির আবাদ হয়। করোনা ভাইরাসের প্রভাব পড়েছে কৃষিখাতেও। আমরা আশা করছি এ অবস্থা কেটে গেলেই কৃষকরা তাঁদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য ফিরে পাবেন। ক্ষতিগ্রস্ত এসব কৃষকদের প্রণোদনা দিতে সরকারকে জানানো হবে। কৃষিবান্ধব সরকার এই মহাদুর্যোগে অবশ্যই কৃষকদের পাশে দাঁড়াবেন বলে আশা করি।’

(রাজু/শামীম/০৮ এপ্রিল ২০২০)


Comment As:

Comment (0)