ফুরমোন ভ্রমণ

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম:  খবরে জানতে পারলাম প্রশাসন বহু বছর পর ঠেগামুখ প্রবেশে সাধারণ বাঙ্গালীদের উপর হতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে, রাঙ্গামাটি সদর হতে সরাসরি জাহাজ চলাচল। খবরে জানতে যতটা না দেরী হল, তার চাইতেও অনেক বেশি তাড়াতাড়ি ভ্রমণ পাগলুরা নিয়ে নিলো প্রস্তুতি। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরাও পিছিয়ে নেই। গ্রুপের সবাইকে না জানিয়ে, অনেকটা গোপনেই ছুটলাম ঠেগামুখ। সাত সকালেই রাঙ্গামাটি পৌঁছে, লাইনের জাহাজে না চড়ে রিজার্ভ স্পীড বোটে ভাসলাম। খেয়াল একটাই,যত দ্রুত সম্ভব ঠেগা পৌঁছানো যায়। কারণ নিরাপত্তার অজুহাতে, প্রশাসনের মর্জি কখন কি হয়।

মহানন্দে ঠেগামুখ যাচ্ছি। কাপ্তাই লেকের নীলাভ পানি, সবুজ পাহাড় সবই  আপন মনে হয়। লেকের জলে ঘুরে বেড়াই সেই ১৯৯৪ সাল হতেই। কিন্তু যতবারই আসি ততোবারই কাপ্তাই লেকটাকে নতুন রুপে আবিষ্কার করি। লেক ঘিরে এই অঞ্চলের মানুষের রয়েছে, দুঃখভরা ইতিহাস। এক রাতেই লেকের জলে ভিটাবাড়ি হারিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। কথায় আছে না- কারো পৌষমাস আবার কারোবা সর্বনাশ। সহায় সম্বল হারানোদের কষ্ট ঘেরা কাপ্তাই লেক, বর্তমানে ভ্রমণ বিলাসি,পিপাসু ও ভ্রমণ বাণিজ্য- এই তিন দলের জন্যই হয়েছে মোক্ষম সুখস্মৃতি ধারনের অন্যতম দর্শনিয় প্রান্তর।

লেকের স্বচ্ছ জলে দ্রুতগামী বোট সব কিছু পিছনে ফেলে, যেতে যেতে বরকল চেকপোস্টে থামে। কোনরকম ঝামেলা ছাড়াই ক্যাম্প হতে ছাড়পত্র মিলে। ভালোলাগার পারদ রেড়ে এখন, ৯৫ ডিগ্রী ছুইছুই।কারণ বছর সাত আগে এই বরকলেই আটকে রেখেছিলো ঘন্টা দুই।

বোট চালক একজন চাকমা। যার ফলে অনেক কিছুই তার চেনাজানা। সে কখনো লেকের জলে, কখনো খালে, আবার কখনোবা কর্ণফুলির নদীর জল কেটে এগিয়ে যায়। বুঝতে পারলাম সে শটকাট মারছে। তাতে কি? বরং আমাদের চোখে ধরা পড়ল প্রকৃতির নানান রুপ। বিশেষ করে নদী দু’পারের অসাধারণ প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম দৃশ্য, আর ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের যাপিত জীবনের চালচিত্র মনে রাখার মত। শটকাটের যোগসুত্রে আমাদের ভ্রমণের ঝুলিও ভারী হতে থাকে । প্রকৃতির নজরকাড়া দৃশ্য দেখতে দেখতে মাত্র আড়াই ঘন্টার মধ্যেই ছোট হরিণা ক্যাম্পে পৌঁছি। চা’চক্রের সুযোগে কথা হয় হরিণা বাজারে বাঙালী এক যুবকের সঙ্গে। তার সঙ্গে আলাপ জুড়াতে গিয়ে যেন মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। আজ সকাল হতেই নাকি, পূণরায় নিষেধাজ্ঞা জারী। তাহলে উপায়? স্থানীয় কোন উপজাতি ম্যানেজ করতে পারলে নাকি,যাবার সুযোগ মিলতে পারে। শুরু হল দৌড়ঝাপ। ম্যানেজও হল।ক্যাম্পে নাম-ঠিকানা এন্ট্রিও হল। কিন্তু একি হায়! তীরে এসে তরী ডুবল। যে কারণে এবার ভ্রমণ সঙ্গী বেশী কাউকে রাখিনি।তারপরেও হয়তো আমাদের কোন কথার কারণেই ঠেগামুখ যাওয়া ঠেকে গেলো। যে ঠেকা সরানো গেলোনা,পূর্ব পরিচিত জনৈক এক লেঃ কর্ণেলকে দিয়ে ফোন করিয়েও। কি আর করা। মলিন মনে স্পীড বোটে বসি। ফিরতি পথে আবারো বরকল ক্যাম্পে করতে হয় রিপোর্ট। সেই সুযোগে কিছুটা সময় ঘোরাঘুরি। দেখা হয় পাকিস্তান টিলা। যেটাকে এখন বাংলাদেশ টিলা বলা হয়। মূলত এটা একটি উঁচু পাহাড়। সেদিন ছিল সাপ্তাহিক হাটবার। প্রায় আড়াই কেজি ওজনের দেশী মোরগ দেখে, লোভ সামলাতে না পেরে কিনে নিই। পছন্দসই মোরগ পেয়ে, ভারাক্রান্ত মনেও সবাই হাসি। ঠিক সন্ধ্যায় রিজার্ভ বাজার পৌঁছে হোটেলে উঠি। ইতিমধ্যে মনে মনে পরের দিনের প্ল্যান করে ফরমান জারী করে দিই। ঘুমাতে হবে তাড়াতাড়ি। সকাল সকাল চলে যাব ফুরমোন পাহাড়। এই ফরমানে টাকার রক্ষক দুই নাজমুল প্রাণ ফিরে পেয়ে হিসাবে গুজামিল হবার পরেও ঘাপটি মেরে রয়। হা হা হা। কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে ঢুঁ মারি স্থানীয় মার্কেটগুলোতে। হালকা কেনাকাটার ফাঁকে এক হোটেল বাবুর্চী দিয়ে রান্না করা মোরগ ভুনা রেডি। ডিনার শেষে সোজা রুমে। একটা সময় ক্লান্ত দেহ – হরেক কিসিমের নাক ডাকা কর্কশ আওয়াজের সঙ্গে দুস্তি পেতে, ঘুমের রাজ্যে পড়ি দেয়।

ফজরের আজানের ধ্বনি শুনে ঘুম ভাঙ্গে। চটজলদি সবাই রেডি। সারাদিন কিনা কি খাই, তাই পেট পুরে নাশতা খেয়ে সিএনজি’তে চাপি। ভোরের হাওয়ায় সর্পিল আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে সিএনজি চলে। প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই মানিকছড়ি যৌথখামার। দৃষ্টির সীমায় ফুরমোন চূড়া। সিএনজি ছেড়ে ট্রেইল শুরু। আমরা চূড়ায় চড়ব অফরুট দিয়ে। সাধারণত পর্যটকরা এ পাশটা দিয়ে ট্র্যাকিং করে না।  কিছুদূর ট্রেইল শেষে সুন্দর একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পাড়ায় চোখ আটকায়। তাদের ঘর গুলো বাগান বিলাস ফুলের গাছ দিয়ে ঘেরা। তার ওপর ফুটন্ত ফুলের হাতছানি। এরকম অসাধারণ একটা পাহাড়ি পরিবেশে,কিছুটা সময় চলল ফটোস্যুট। এর পর ধীরে ধীরে বুনো পথে হাইকিং। যতই এগিয়ে যাই,ততোই যেন মুগ্ধতা ভর করে। যেতে যেতে শুরু হল বন্ধুর পথ। ততোক্ষণে  কুয়াশা কেটে অগ্নিগর্ভা সূর্যের আলোক ঝটা। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর, ফুরমোন চূড়ায় উঠার মূল্য ট্র্যাকিং শুরু। ততোক্ষণে রোদ উঠল চেতিয়ে। মাঝেমধ্যে জিরানোর সুযোগে পিছু ফিরে দেখি। আসলে আমরা দাঁড়াতে চাইনি। আমাদেরকে দাড়াঁতে বাধ্য করেছে উম্মাদ প্রকৃতি। যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজে ঘেরা ছোটবড় নানান পাহাড়ের চূড়া। দূরের চূড়া গুলো দেখতে পারাটাই যেন, ফুরমোন চূড়ায় উঠার শক্তিমত্তা। উঠতে উঠতে পেলাম আর্মি ক্যাম্প। খানিকটা সময় সেনা সদস্যদের সঙ্গে আলাপ জুরিয়ে আবারো উঁচু নীচু পাহাড়ি পথে ছুটে চলা। কিছু কিছু জায়গা আছে, পা পিছলে পড়লেই হাজার ফুট গিরি খাদে। আসলে পাহাড় ভ্রমণের মজাটা ঠিক এরকম জায়গাগুলোতেই। যে মুহুর্ত গুলো অভিযানের মত হয় রোমাঞ্চকর। শেষ সময়ে ফুরমোন ট্র্যকিংয়ের এ্যাডভেঞ্চার ফিলিংস কাটতে না কাটতেই চূঁড়ায় পৌঁছে যাই। সোবহানাল্লাহ! এ যে আরেক দুনিয়া। যে দুনিয়ায় শুধুই প্রকৃতির বসবাস। চূড়ার পরিধি খুব বেশী নয়। কিন্তু ফুরমোনের উপর দাঁড়িয়ে দূরের ঢেউ খেলানো পাহাড়, ভেসে বেড়ানো শুভ্র মেঘ আর নীল আসমানের সৌন্দর্য আপনাকে বারবার ফুরমোন চূড়ায় টানবেই। ফুরমোন শব্দের অর্থ ফুরফুরে মন। এটি চাকমা ভাষা। সত্যিই নামের সঙ্গে এর মিল রয়েছে। ভূপৃষ্ঠ হতে ১৫১৮ ফিট উচ্চতার ফুরমোন চূড়ার উপর রয়েছে, বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের উপসানালয়। তাই ধর্ম যারযার কিন্তু প্রত্যেক ধর্মের উপাসনালয় গুলোর প্রতি, সম্মান জানানো সবারই দরকার। সেই নীতি-নৈতিকতা হতেই আমরা যথাসম্ভব নিরবতা অবলম্বন করি। পরম করুণাময়ের নিকট অশেষ শুকুর। তিনি আমাকে তার সৃষ্টির রুপ দেখার দৈহিক শক্তি ও মন-মানসিকতা দান করেছেন। উপাসনালয় হতে কিছুটা দূরে দাড়িঁয়ে নীচে তাকিয়ে দেখি শাল, গর্জন, সেগুন ও মূলি বাঁশসহ সারি সারি নানান গাছ দিয়ে ঘেরা বনায়ন। নেমে যাবার সিঁড়িটাও বেশ চমৎকার ডিজাইনের। ধীর পায়ে নামতে শুরু করি। শত শত সিঁড়ির ধাপ। পরে জানা যায় মোট ধাপ ৭০৭ টি। নেমে দেখি ফুরমোনের পাদদেশ আরেক ভিন্ন জগত। প্রাকৃতিক ও সৃজিত মেলবন্ধনে দৃষ্টিনন্দন বন। ট্রেইল ধরে আগাতে থাকি। যতই আগাই ততোই আগাতে ইচ্ছে করে। অচেনা পাখির সুরেলা ডাক, শুকনো পাতার মরমর শব্দ। যা আপনাকে নিয়ে যাবে ভাবের জগতে। বনের ভেতর কোথাও কোথাও এতটাই ঘন যে,সূর্যের আলোও হার মেনেছে। বেশ একটা রোমাঞ্চকর অনুভূতি। ঘড়ির কাটা তিনটা ছুঁইছুঁই। পেটেও পড়েছে খানিকটা টান। তাই আর দেরী না করে লোকালয়ের দিকে এগুতে থাকি। এগুতে এগুতে দেখি সে আরেক পৃথিবী! যেখানে রয়েছে শুধু, পাহাড়ের খাদে প্রাচীন প্রাচীন সব বৃক্ষরাজি। সেই গল্প আজ আর নয়। কারণ ফিরতি পথের সৌন্দর্য লিখতে গেলে,হবে বিরাট কাহিনী। শুধু এতটুকুন না বললেই নয়, ঠেগা যেতে না পারার মানসিক মলিনতা মিলিয়ে গিয়েছিলো ফুরমোন ভ্রমণে।

যাবেন কিভাবেঃ

ঢাকা হতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস দিনে-রাতে ছেড়ে যায় রাঙ্গামাটি। ভাড়া জনপ্রতি পরিবহন ভেদে ৬০০/= টাকা হতে ১৪০০/= টাকা।  থাকা-খাওয়াঃ রিজার্ভবাজার ও বনরুপা এলাকায় বিভিন্ন মানভেদে আবাসিক হোটেল রয়েছে। ভাড়া বড় রুমে ৬ জনের বেড মাত্র ৬০০/=টাকা। আবার ডাবল বেড মাত্র ৫০০/= টাকা পর্যন্ত রয়েছে। এছাড়া খাবারেরও প্রচুর রেস্টুরেন্ট রয়েছে। শহর হতে মানিকছড়ি যৌথখামার / সাপছড়ি শালবাগান পুলিশ ফাঁড়ী সিএনজি ভাড়া মাত্র ২৫০/=টাকা।

ভ্রমণ তথ্যঃ

ঠেগা/ ছোট হরিণা যেতে চাইলে রিজার্ভবাজার হতে সকাল ০৭টা ও দুপুর ০২টায় লঞ্চ ছেড়ে যায়। এছাড়া স্পিড বোটেও যাওয়া যাবে। বর্তমানে ঠেগামুখ সাধারণ বাঙ্গালী প্রবেশ নিষেধ। তবে ইদানীং পর্যটকরা ছোট হরিণা রাত যাপনে সুযোগ পাবের। ইতিমধ্যে সেখানে সাধারণমানের বোর্ডিং ব্যবসা চালু হয়েছে।

লেখক: চীফ অর্গানাইজার, দে ছ্যুট ভ্রমণ সংঘ।


Comment As:

Comment (0)