এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণের নিয়মকানুন সহজ করার আহবান
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের নিয়েম-কানুন আরো সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর ২০২১) কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে প্রান্তিক অঞ্চলের প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত এসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পৌঁছে দিতে সিলেটে উদ্যোক্তা-ব্যাংকার-ম্যাচমেকিং অনুষ্ঠানের আয়োজন করে এসএমই ফাউন্ডেশন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সিলেট কার্যালয়ের সহায়তায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. মোঃ মাসুদুর রহমান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোঃ মফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম এহসান এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের মহাব্যবস্থাপক ফারজানা খান।
করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিতরণের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকার ঋণ ছাড় করেছে এসএমই ফাউন্ডেশন। ইতোমধ্যে ৩১৬জন উদ্যোক্তার জন্য ৪২ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। ২৩০জন উদ্যোক্তার জন্য ৪২ কোটি টাকা অনুমোদন দেয়া হয়েছে এবং আরো ২৬৮জন উদ্যোক্তার জন্য ৫৪ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. মোঃ মাসুদুর রহমান বলেন, এসএমই উদ্যোক্তাদের সাথে ব্যাংকারদের দূরত্ব কমাতে উদ্যোক্তা সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বড় উদ্যোক্তাদের তুলনায় ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়া ব্যয়সাপেক্ষ হলেও সরকারের প্রণোদনার ঋণ বিতরণে এগিয়ে আসায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধন্যবাদ তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ সুষ্ঠভাবে বিতরণ নিশ্চিত করতে একটি হটলাইন চালু করা যেতে পারে।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোঃ মফিজুর রহমান বলেন, ছোট উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ঋণের অর্থ ফেরত না পাওয়ার কোন নজীর নেই। এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়মকানুন সহজ করতে ব্যাংকার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। সেই সাথে উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেন তিনি। এছাড়া চলতি অর্থবছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ২০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ শেষ করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন ড. মোঃ মফিজুর রহমান।
করোনাভাইরাসের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের দ্বিতীয় দফা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় চলতি অর্থবছরে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ২০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের সেপ্টেম্বর ২০২১-এ ১৯টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সই করে ফাউন্ডেশন। ঋণের সুদের হার হবে মাত্র ৪%। একজন উদ্যোক্তা সর্বনি¤œ ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ পাবেন।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, ব্র্যাংক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, বেসিক ব্যাংক, দ্যা সিটি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, আইপিডিসি ফাইন্যান্স, আইডিএলসি ফাইন্যান্স ও লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্স। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সারাদেশের প্রায় ১০০টি এসএমই ক্লাস্টার, চেম্বার, অ্যাসোসিয়েশন-এর সদস্য উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সারাদেশের নারী-উদ্যোক্তা এবং এসএমই ফাউন্ডেশন, বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি সংগঠন ও অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সুপারিশকৃত এসএমই উপখাত, ট্রেডবডি এবং গ্রুপের তালিকাভুক্ত উদ্যোক্তা এবং সিএমএসএমই খাতের জন্য সরকার ঘোষিত প্রথম দফার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ না পাওয়া পল্লী ও প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাগণকে ঋণ প্রদান করবে। মোট ঋণের ৩০% নারী-উদ্যোক্তাদের মাঝে বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
করোনাভাইরাস (কোাভিড-১৯) পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা এবং পল্লী এলাকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের দ্বিতীয় দফার প্রণোদনার আওতায় মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোক্তাদের মাঝে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করে এসএমই ফাউন্ডেশন। চলতি অর্থবছরে আরো ২০০ কোটি টাকা এসএমই ফাউন্ডেশনের অনুকূলে বরাদ্দ দেয় অর্থ বিভাগ।
এসএমই ফাউন্ডেশনের ঋণ কর্মসূচি বিতরণ বিষয়ক নীতিমালা ও নির্দেশিকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, করোনা মহামারীর কারণে গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের ক্ষতিগ্রস্ত অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিম্নবর্ণিত ক্যাটাগরির উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য দেয়া হবে:
১. যারা সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণপ্রাপ্ত হননি;
২. অগ্রাধিকারভূক্ত এসএমই সাব-সেক্টর এবং ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা;
৩. নারী-উদ্যোক্তা;
৪. নতুন উদ্যোক্তা অর্থাৎ যারা এখনো ব্যাংক ঋণ পাননি;
৫. পশ্চাদপদ ও উপজাতীয় অঞ্চল, শারীরিকভাবে অক্ষম এবং তৃতীয় লিঙ্গের উদ্যোক্তাগণ।
প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় উদ্যোক্তাগণ ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২৪টি সমান মাসিক কিস্তিতে ঋণ পরিশোধ করা যাবে। ব্যাংকের চাহিদাকৃত ডকুমেন্টসহ ‘সম্পূর্ণ/পরিপূর্ণ ঋণ আবেদনপত্র’ ব্যাংকের নিকট দাখিলের দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঋণ মঞ্জুর করে গ্রাহকের অনুকূলে বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। সাধারণভাবে একক ও যৌথ মালিকানাধীন উদ্যোগের অনুকূলে ঋণ বিতরণ করা হবে। তবে প্রান্তিক ক্ষুদ্র, বিশেষ করে নারী-উদ্যোক্তাদের ঋণের আওতায় আনার লক্ষ্যে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক ও ঐক্যমতের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ৫জন উদ্যোক্তার অনুকূলে গ্রুপভিত্তিক ঋণ বিতরণ করা যাবে। গত অর্থবছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এসএমই ফাউন্ডেশন অংশীদার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাথে আলোচনা করে উদ্যোক্তাদের জন্য সুবিধাজনক এক/একাধিক শাখায় ফোকাল কর্মকর্তা নির্ধারণ করবে। উদ্যোক্তারা ফোকাল কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করবেন। ফোকাল কর্মকর্তা এসএমই ফাউন্ডেশন, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও শাখা এবং উদ্যোক্তাদের সাথে সমন্বয় করবেন।
বিনিয়োগবার্তা/এসএএম//



