936

গরমে বেড়েছে ডাবের কদর

ঝালকাঠি প্রতিনিধি: গ্রীষ্মকালে সব প্রাণিকূলই অস্থির হয়ে পড়ে তীব্র গরমে। শরীর ঘেমে দুর্বল এবং তৃষ্ণার্ত হওয়ায় দেখা দেয় পানিশূন্যতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ। তাই বিভিন্ন রোগ থেকে বাঁচার জন্য কেমিকেলমুক্ত চিকিৎসার জন্য সবারই প্রিয় ডাবের পানি। 

রমজান মাসে মুসলমানদের সারাদিন সিয়াম সাধনার পরে ইফতারিতে ১ গ্লাস ডাবের পানি তীব্র গরমের অবসাদ-ক্লান্তি দূর করে শরীরে যোগায় শীতল শান্তির পরশ। এ সময় ১ গ্লাস ডাবের পানি পানিশূন্যতা এবং কোষ্ঠকাঠিন্য রোগ দূর করে শরীরকে শীতল করে। 

নারিকেল ১২ মাসই ফলন হয়। তবে গ্রীষ্মকালে এর ফলনের পরিমাণ বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহও বেশি দেখা যায়। ঝালকাঠিতে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ মৌসুমে ডাবের উৎপাদন বেশি হয়। এবার ডাব উৎপাদন বেশি হওয়ায় জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। 

নারিকেল গাছ লাগানোর পরে প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারিতে গাছের গোড়ায় সামান্য কাদা মাটি ও সার দিলে ভালো ফলন হয়। এছাড়া তেমন কোনো যত্ন নেয়ার প্রয়োজন হয় না।

খুচরা ক্রেতা মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ডাবের সাইজ অনুযায়ী ৩০-৩৫ টাকা দরে প্রতিটি ডাব ক্রয় করি। গাছে ওঠা ও সরবরাহের পরিশ্রম নিয়ে ৪৫ টাকা করে পাইকারদের কাছে বিক্রি করি। পাইকাররা আমাদের কাছ থেকে ডাব কিনে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়। 

পাইকারী ক্রেতা সাইদুল ইসলাম শহিদ বলেন, খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৪৫ টাকা দরে ক্রয় করে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহরের মোকামে পৌছে দেয়া পর্যন্ত বহন খরচ, চাঁদা দিয়ে প্রতিটি ডাবে ৫০ টাকারও বেশি খরচ পড়ে। আমাদের কাছ থেকে আবার খুচরা বিক্রেতারা ৫৫ টাকা দরে কিনে নিয়ে ৬০-৭০ টাকা দরে প্রতিটি ডাব বিক্রয় করে।
 
চাষিদের অভিযোগ প্রান্তিক পর্যায়ের নারিকেল চাষিদের কাছ থেকে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত পেরিয়ে ক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছাতে দাম অনেক হলেও মূলত প্রকৃত চাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। 
    
ঝালকাঠি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহ জালাল বলেন, জেলায় ১ হাজার ১৭৭ হেক্টর জমিতে নারিকেলের বাগান রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩৯৫ হেক্টর, নলছিটি উপজেলায় ৩০০ হেক্টর, রাজাপুর উপজেলায় ২২০ হেক্টর, কাঁঠালিয়া উপজেলায় ২৬২ হেক্টর জমিতে নারিকেল গাছের আবাদ রয়েছে। এতে কয়েক লাখ গাছ রয়েছে। যা ঝালকাঠির জনগণের চাহিদা মিটিয়ে সারাদেশের চাহিদা মিটাতে ভূমিকা রাখছে।

পবিত্র রমজান মাসের আগে এবার গরমটা একটু বেশিই জানান দিচ্ছে। অতিরিক্ত গরমে নানা অসুখ-বিসুখ দেখা দেয়। তাই স্বাস্থ্য সচেতনতা জরুরি। নিত্য দিনের অফিস ও কাজকর্ম সেরে অনেক রোজাদার ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আর তৃষ্ণা মেটাতে ইফতারে অনেকে নানা ধরনের শরবত ও কোমল পানীয় পান করেন। কিন্তু কোমল পানীয় এবং এসব শরবতে থাকতে পারে ক্ষতিকর জীবাণু। এ ক্ষেত্রে নির্ভেজাল ও নিরাপদ পানীয় পান করতে চাইলে ডাবের পানির বিকল্প নেই। 

অনেক রোজাদার ইফতারে ডাবের পানি পান করে। প্রাকৃতিকভাবে বিশুদ্ধ এ পানীয় যেমন পুষ্টিগুণে অনন্য, তেমনি গরমে অত্যন্ত প্রশান্তিময়। তীব্র গরমে শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর হারায় প্রয়োজনীয় খনিজ ও তরল পদার্থ। এক গ্লাস ডাবের পানি সেই অভাব পূরণ করতে পারে নিমেষেই।

কয়েকজন পুষ্টিবিদ জানান, ক্লান্তি ও অবসাদ দূর করতে, পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করতে ডাবের পানি খুব কার্যকর পানীয়। একটি ডাবের পানিতে চারটি কলার সমান পটাসিয়াম আছে, আছে প্রাকৃতিক শর্করা। ফলে শরীরকে সতেজ করে এবং শক্তি দেয়। ডাবের পানি শরীরের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চমাত্রার ক্যালসিয়াম রয়েছে ডাবের পানিতে, যা হাড়কে করে মজবুত। সেই সঙ্গে জোগায় ত্বক, চুল, নখ ও দাঁতের পুষ্টি। এ ছাড়া ডাবের পানি হজমের সমস্যা দূর করে, দূর করে কোষ্ঠকাঠিন্য।

মোটামুটি সব ঋতুতে ডাবের পানির সমান কদর। তবে গরমে ডাবের কদর অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেড়ে যায়। পিপাসা মেটাতে, শরীরে তাত্ক্ষণিক শক্তির জোগান দিতে ডাবের পানি উত্তম পানীয়। সারা  দেশেই মেলে এই ফল। রাস্তার মোড়ে, ফুটপাতে প্রায়ই দেখা যায় ডাব বিক্রেতা। কচি অবস্থায় দেশের বেশির ভাগ নারকেল গাঢ় সবুজ ও হালকা হলুদ রঙের। অর্থাৎ কচি নারকেলই ডাব। পাকলে বা পরিপক্ক হলেই তা নারকেল। নারকেলের ওপর যে স্তর থাকে সেটা ছোবড়া। ছোবড়ার কঠিন খোলসের ভেতর থাকে সাদা রঙের শাঁস ও পানি। সাধারণত কচি ডাবে শাঁস থাকে না। তখন পানির পরিমাণ থাকে বেশি। পাকলে ছোবড়ার গাঢ় সবুজ রং বদলে যায়। আর শাঁস বাড়তে থাকে। কমতে থাকে পানি। হালকা শাঁসযুক্ত পানি অত্যন্ত সুমিষ্ট। অনেকে আবার পছন্দ করে কচি ডাবের পানি।

ঝালকাঠি শহরের সাধনার মোড়ে ভ্যানে করে ডাব বিক্রি করছিলেন আনোয়ার মিয়া। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি ডাব বিক্রি করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসায় জড়িত থাকার কারণে তিনি ডাব হাতে নিয়েই বুঝতে পারেন কোনটায় কতটুকু পানি আছে, কোনটায় সর বা শাঁস হয়েছে, কোনটার শাঁস শক্ত হয়েছে, কোনটায় পানি কম। 

মাঝারি আকারের প্রতিটি কচি ডাবের দাম একটু বেড়েছে। অন্য সময় যে ডাবের দাম ছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, এখন সেটার দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। একটু বড় আকারের প্রতিটি কচি ডাবের দাম ৫০ থেকে ৬০ টাকা। 

ডাবের দাম বেড়েছে কেন জানতে চাইলে আনোয়ার মিয়া বলেন, ‘গরমে ডাবের চাহিদা বেশি। চালান আগের মতো নেই। পাইকারদের কাছ থেইকা ডাব কিনি। প্রতিটি ডাব (ছোট-বড় মিলিয়ে) ৪৫ টাকা দরে কিনতে হয়। সাইজ অনুযায়ী দাম কম-বেশিতে বিক্রি করতে হয় । 

ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের ডা. ইমাম হোসেন জুয়েল বলেন, ‘ডাবের পানিতে প্রচুর পটাসিয়াম রয়েছে। ডাবের পানি খেলে পটাসিয়ামের জন্য শরীরে একটা শীতল আমেজ আসে। পটাসিয়াম হার্টের রোগীর জন্য ভালো। তবে শরীরে যদি পটাসিয়াম বেশি থাকে, তবে ডাবের পানি পান করা ঠিক নয়। এ ছাড়া যাদের কিডনি সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্যও ডাবের পানি পান করা ঠিক নয়।’ 

ডাবের পানির অন্যান্য পুষ্টিগুণের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ‘গরমের জন্য অনেকের ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা হতে পারে। ডাবের পানি আমাদের শরীরের ডিহাইড্রেশন রোধ করে। আমাদের ঘামের সঙ্গে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ফ্লোরাইডসসহ নানা খনিজ শরীর থেকে বের হয়ে যায়। ডাবের পানি তা পূরণ করতে পারে। ’
রাজাপুর উপজেলার বারবাকপুর গ্রাম থেকে ট্রাকে করে ডাব লোড করে নেয়া হচ্ছে ঢাকায় বিক্রির জন্য। 

বিনিয়োগবার্তা/এসএল//


Comment As:

Comment (0)