শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আইপি ক্যামেরা স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক: শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা ইটিপি স্থাপনের নির্দেশনা থাকলেও তা মানছে না অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনেও সব অনিয়ম উঠে আসছে না। তাছাড়া সক্ষমতা স্বল্পতায় যথার্থ অভিযানও করতে ব্যর্থ সংস্থাটি। তাই যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক, ওই সব প্রতিষ্ঠানে আইপি ক্যামেরা স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু আইপি ক্যামেরা দিয়ে শতভাগ ইটিপি নজরদারি সম্ভব নয়। ক্রমান্বয়ে আরো কঠোর পদক্ষেপের দিকে যেতে হবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে।
দেশে প্রতিনিয়ত গড়ে উঠছে নিত্যনতুন শিল্প-কারখানা। নির্দিষ্ট শিল্প-কারাখানার ছাড়পত্র পেতে ইটিপি স্থাপনের শর্তারোপ রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের। সে শর্ত মেনেই ছাড়পত্রের আবেদন করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। কিন্তু ছাড়পত্র পাওয়ার পর ইটিপি সচল রাখছে না অধিকাংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, এত বিপুল পরিমাণ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নজরদারি করাও সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সত্যিকার অর্থেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তদারকি করার সক্ষমতা আমাদের নেই। একে তো জনবল সংকট, তার ওপর দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। একটি জেলা কার্যালয়ের আওতায় সহস্রাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানও থাকে। বিশেষ করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে ইন্ডাস্ট্রির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এসব জেলা পরিদর্শনের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই। এমন অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে যেখানে গত পাঁচ বছরেও পরিবেশ অধিপ্তরের লোক যায়নি।
তিনি বলেন, যে গুটিকয়েক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকরা অভিযানে যান, সেখানে দেখা যায় আমরা যাওয়ার আগে ইটিপি সচল করে, আমরা বেরিয়ে এলে ইটিপি বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনও হয়েছে, দিনে ইটিপি সচল রাখে, রাতে ইটিপি বন্ধ করে ময়লা পানি নদী ও খালে ছেড়ে দেয়া হয়। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরিবেশ অধিদপ্তর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আইপি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এতে করে জেলা অফিস থেকে সংশ্লিষ্ট কারখানার ইটিপি তদারকি করা সহজ হবে।
ইটিপি প্লান্টের নজরদারির বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন নগরবিদ ইকবাল হাবিব। তিনি বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের এ উদ্যোগ সফল হলে কল-কারখানার তরল বর্জ্যে নদী-খাল দূষণ অনেক কমবে। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সচেতন থাকতে হবে কারখানা মালিকরা যেন কোনো চোরাপথ খুলে না বসে। দেখা গেল তারা ইটিপি প্লান্ট সচল করল আবার তরল বর্জ্যের একাংশ মাটি চাপা দিল, তখন পরিবেশ আরো মারাত্মকভাবে দূষণ হবে।
ইটিপি মনিটরিংয়ে আইপি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি প্রশংসনীয় উদ্যোগ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) অতিরিক্ত পরিচালক ও সিইও (ইনচার্জ) মনসুর আহমেদ। তিনি বলেন, আমরা শিল্প মালিকরা আইপি ক্যামেরা স্থাপন করতে আগ্রহী। বিষয়টি প্রশংসনীয়ও বটে। আইপি ক্যামেরার উদ্যোগটি ভালো হলেও এটি যেন অপব্যবহার না হয়। কারণ, মনিটরিংটা কিন্তু মানুষই করছে। দেখা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবৈধ লেনদেন করে ক্যামেরাটি বন্ধ রাখল। অথবা নির্দিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্যামেরাটি নজরদারি করল না। তাহলে কিন্তু কোনো লাভ নেই।
তবে ইটিপি সচল রাখতে আইপি ক্যামেরার পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরের তত্পরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেন, শুধু ইটিপি মেশিন সচল এবং পানির পরিমাণ নজরদারি করলেই হবে না, পাশাপাশি ইটিপির বিদ্যুৎ মিটার এবং কারখানার বিদ্যুৎ মিটার আলাদা করতে হবে এবং নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এতে করে তরল বর্জ্য শোধনের বিষয়টি সঠিকভাবে নজরদারি করা যাবে। নয়তো দেখা যাবে, ইটিপি প্লান্ট সচল রাখা হয়েছে কিন্তু তাতে সঠিক পরিমাণের কেমিক্যাল দেয়া হয়নি। ফলে ময়লা পানিই নদীতে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা এপ্রিলে জেলা কার্যালয়গুলোকে চিঠি ইস্যু করেছি। কী পরিমাণ সাড়া পড়েছে সেটা বুঝতে পারব শিগগিরই। এখন পর্যন্ত যেটা জানতে পেরেছি শিল্প মালিকরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তবে অনেক শিল্প মালিক আইপি ক্যামেরা স্থাপনে সময় চাচ্ছেন বলেও জানিয়েছেন জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
বিনিয়োগবার্তা/এসএল//



