IMF

কর-জিডিপি হার ১৫ শতাংশে উন্নীতের তাগিদ আইএমএফের

বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক: বাংলাদেশে বর্তমানে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় করহার মাত্র ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ হার প্রতিবেশী দেশ নেপালের অর্ধেকের চেয়েও কম। এমনকি পাকিস্তান, ভুটানের অবস্থাও এক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো। দক্ষিণ এশিয়ায় তো বটেই, গোটা বিশ্বেই বাংলাদেশের কর-জিডিপি হার নিম্নতম পর্যায়ের। দেশের এ করহার বাড়িয়ে কমপক্ষে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।

গতকাল অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা বৈঠকে এ তাগিদ দেয় সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দল। সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। প্রতিনিধি দলের সদস্যরা বলেন, বাংলাদেশে ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় নিরাপদ ও সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির চলমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে গত বৃহস্পতিবার এশিয়াপ্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের আইএমএফের প্রধান রাহুল আনন্দের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসেছে। রোববার থেকে শুরু হয়েছে সরকারের সঙ্গে সিরিজ মিটিং যা, আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চলবে। স্টাফ মিশনের মূল্যায়নের ওপর ভিত্তি করে আগামীতে আইএমএফের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ মিলবে।

জানা গিয়েছে, আইএমএফ প্রতিনিধি দল গতকাল তিনটি বৈঠক করেছে। এর মধ্যে দুটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সঙ্গে। আরেকটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআরের সঙ্গে।

এনবিআরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ভবিষ্যৎ অ্যাকশন প্ল্যান বা কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চেয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে অব্যাহতি সুবিধা আরো কমাতে বলেছে সংস্থাটি। বর্তমানে বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় কর অনুপাত মাত্র ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে কম।

আইএমএফ এটাকে কমপক্ষে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার তাগিদ দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত এনবিআরের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি হার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আইএমএফ। সংস্থার সদস্যরা বলেছেন, বর্তমান অবস্থা থেকে এ হার অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে না পারলে নির্ধারিত সময়ে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন বাধাগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে ২০২৬ সালে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বাংলাদেশ। তাই রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, সদ্যবিদায়ী ২০২১-২২ অর্থবছরে আমদানি শুল্ক, মূল্যসংযোজন কর-ভ্যাট ও আয়কর মিলে ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ১৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধির এ হার আগের বছরের চেয়ে কম। আগের ২০২০-২১ অর্থবছর রাজস্বে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০ শতাংশ। আদায় হয়েছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী বছরে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্বের মোট লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা।

সে হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতি হতে পারে। অবশ্য গত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রায় কোনো কাটছাঁট করা হয়নি। মূল লক্ষ্যমাত্রা যা প্রাক্কলন করা হয়েছিল, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রায় সেটিই বহাল রাখা হয়েছে। ফলে ঘাটতি বেশি হয়েছে বলে জানান রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা। উল্লেখ্য, মোট বাজেটের ৮৫ শতাংশ অর্থ জোগান দেয়া হয়েছে এনবিআরের সংগৃহীত রাজস্বের মাধ্যমে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম বলেন, লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সবসময় চ্যালেঞ্জিং। কারণ এটি সবসময় বেশি ধরা হয়। আমরা চেষ্টা করছি, লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছানোর। শিগগিরই ভালো ফল দেখা যাবে। নতুন অর্থবছরে এনবিআরকে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে হবে। বিশাল এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে জানালেও সে বিষয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেননি চেয়ারম্যান। 

গতকালের বৈঠকে বাংলাদেশে ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় নিরাপদ ও সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছে আইএমএফ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আইএমএফ প্রতিনিধি দল আমাদের কাছে বিভিন্ন তথ্য জানতে চেয়েছে। আমরা তা সরবরাহ করেছি। আইএমএফ বলেছে, পাশের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ জিডিপির চেয়ে অনেক কম। ফলে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে নিরাপদেই রয়েছে। রিজার্ভও মোটামুটি ভালো অবস্থানে। সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রশংসাও করেছেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ঋণের পরিমাণ (দেশী-বিদেশী মিলে) এখন জিডিপির ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে বিদেশী ঋণের অংশ ১৭ শতাংশ। বাকি অংশ দেশী ঋণ। ২০২০-২১ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৩ লাখ কোটি টাকা। এ ঋণের ৫৮ শতাংশ অভ্যন্তরীণ। বাকি অংশ বিদেশী উৎস থেকে নেয়া।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে শ্রীলংকার ঋণ-জিডিপির অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শূন্যের কোটায়। পাকিস্তানের ঋণ জিডিপি অনুপাত ৮৮ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। আর রিজার্ভ কমে দাঁড়িয়েছে ৮ বিলিয়ন ডলারে। মালদ্বীপে ঋণের পরিমাণ জিডিপির ১০০ শতাংশ। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের ঋণও তাদের জিডিপির চেয়ে বেশি। অবশ্য তাদের এ ঋণসংকট মোকাবেলা করার মতো সামর্থ্য আছে। আফ্রিকার অনেক দেশের ঋণ-জিডিপির ৭০ শতাংশের ওপর। কাজেই অনেক দেশের তুলনায় এখনো বাংলাদেশের অবস্থান অনেক বেশি দৃঢ় ও স্থিতিশীল।

আইএমএফের সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকারের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো বেশি নয়। জিডিপির আকার বিবেচনায় নিলে সরকারের ঋণ নেয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো রাজস্ব আহরণ খুবই কম। রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে ঋণ পরিশোধ ক্ষমতা কমে যাবে।-বণিক বার্তা।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//


Comment As:

Comment (0)