মায়াবী চাদরে ঘেরা খড়ারচর কাংশা ফড়িঙ্গা
মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: দেখার চোখ থাকলে সবই সুন্দর। প্রকৃতির রুপ-লাবণ্যের নির্যাস পেতে হলে চাই অন্তরদৃষ্টি। কবি গুরু এই জন্যই লিখেছিলেন দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে দু’পা ফেলিয়া একটি ধানের শীষের উপরে একটি শিশির বিন্দু। কবিতার কথা গুলো আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুদের জীবনে পুরোটাই যেন সত্যি হল এবার।
বহুবার গিয়েছি নিছক আড্ডা জমাতে সাভার নামাবাজার নতুন ব্রীজ পার হয়ে ফোর্ড নগরে। অথচ খড়ারচর, ফরিঙ্গা আরেকটু এগিয়ে কাংশা যাওয়া হয়নি। সংগঠনের উদ্যোগে সদকায়ে জারিয়া কার্যক্রমের জন্য খড়ারচর যাওয়ার সুযোগ আসে।

দে-ছুটের এডমিন লেভেলের বন্ধুরা বেশ কয়েকটা মটরবাইকে সাতসকালেই ছুটে যাই খড়ারচর গ্রামে। সাভারের পাশে হলেও এলাকাটা ধামরাই উপজেলার মধ্যে পরেছে। স্থানীয় এক মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আমাদের কার্যক্রম শেষে, ঘুরতে বেড়িয়ে যাই আশপাশে। মায়াবী পথে ঘুরতে ঘুরতে চলে যাই মানিকগঞ্জ উপজেলার অন্তর্গত, ধলেশ্বরী নদীর তীরের গ্রাম কাংশা। আশ্চর্য হই ঢাকার এত পাশে অথচ এখনো রয়েছে খাঁটি গ্রাম বাংলার রুপ। কাংশার প্রকৃতি দেখলে বিশ্বাসই হবে না যে, এখানকার দূরত্ব কোলাহলের শহর ঢাকার জিরো পয়েন্ট হতে আনুমানিক প্রায় ৩৭ কিলোমিটার মাত্র। চারপাশটা নয়নাভিরাম প্রকৃতি দিয়ে ঘেরা। নেই কোন কোলাহল।

কাংশা ব্রিজের উপর থেকে শান্ত ধলেশ্বরীর রুপ দেখি। একটা সময় আর লোভ সামলাতে না পেরে, ঝাপিয়ে পরি নদীর বুকে। চলে ইচ্ছেমত জলকেলি। পানির নীচের কাদা দিয়ে সারা শরীর মেখে, হারিয়ে যাই শৈশবের স্মৃতিতে। নদীর পারে বসে থেকে মাঝ বয়সিদের এরকম ছেলেমিপনা উপভোগ করে আরেক মাঝবয়সি স্থানীয় মাজের আলী। তারে জিগাই ও ভাই কি দেহেন। তিনি উত্তর দেন, পাগলামি দেহি। হাহাহা- কন কি ভাই! আমরা কি পাগল? মাজের আলী বলেন, আমিওত আরেক পাগল। পাগল না হইলে কি আর আপনাগো গোসল করা আমি বইয়া দেখি। বাহ্ বেশ যুক্তিসঙ্গত উত্তর। ভালো লেগে গেল মানুষটারে। জুম্মার আজান হতেই পানি হতে উঠে আসি। নয়া আমদানি মাজের পাগলও হল আমাদের সঙ্গী। এবার দে-ছুটের দামালদের আর পায় কে। স্থানীয় পাগল বলে কথা। হা হা হা। নামাজ পড়ার জন্য তার সঙ্গে চলে গেলাম কাংশা ব্রিজের ওপারে। জুম্মা শেষে গ্রামটা ঘুরে দেখি। পেটে এবার চোচো। দুপুরের খাবারের জন্য আবারো চলে যাই খড়ারচর মাদ্রাসার বালাখানায়। বেশ আয়েশ করেই উদোরপূর্তী চলে।
খাওয়া দাওয়া শেষে যাই ফড়িঙ্গা গ্রামে। বিস্তৃর্ন ফসলের মাঠের মাঝে ঠাঁয় দাঁড়ীয়ে রয়েছে এক পুরানা বট বৃক্ষ। খানিকটা সময় চলে সেখানে আড্ডা। এবার চলে যাই বংশী নদীর তীরে কাজিয়ালকুন্ডু গ্রামে। যার বুক চীরে নতুন করা ইট, সুরকী বিছানো সড়ক চলে গেছে আরিচ মহাসড়কের ঢুলিভীটা’র দিকে। পথের দুপাশে সৃজন করা হয়েছে বনায়ন।
বেশ চমৎকার নিরিবিলি পরিবেশ। সড়কের পাশেই বিশাল বিল। জেলেরা আপন মনে মাছ ধরে। সেই সব মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখতে দেখতেই ছুটি চৌঠাইল গ্রামের দিকে। মাঝে রুপ নগরের রুপে মজে খনিকের জন্য ব্রেক। পড়ন্ত বিকালে গ্রামের পিচ ঢালা সরু পথে, মটর বাইকে চড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা। বাইকার আর সাইক্লিস্টদের রাইডের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় একটা জায়গা এই পথগুলো। অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাই চৌঠাইল।
এ পাশটায় ধলেশ্বরী সরুখালের রুপ ধারণ করে আছে। সম্ভবত নদী খেকোদের শকুনি দৃষ্টি পরেছে। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনো অসাধারণ। সবুজ ফসলের ক্ষেত, বাঁশবাগানে নানান পাখির কিচির মিচির, দিগন্ত জোড়া সর্ষে ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শুধু হলদে রাঙ্গা ফুল। গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর অনুসন্ধানী জিজ্ঞাসা। ঘুরে ঘুরে সব মিলিয়ে ভ্রমণের নির্যাস নিতে নিতে একসময় দেখি, তেজোদিপ্ত লাল সূর্যটা সেদিনের জন্য নানান রঙ্গের আভার ছটা ছড়িয়ে পশ্চিমাকাশে হেলে পরেছে।
দেরী না করে জসিম ও হানিফ ধলেশ্বরীর তীরে তাঁবু টানাতে ব্যস্ত হয়ে পরে। দূর্যয় বার-বি-কীউ মুরগীর খোঁজে বাজারে ছুটে। আর আমি বান্দা অলস, শুধু চেয়ে চেয়ে ওদের দৌড়ঝাপ দেখি। বাদ মাগরিব শুরু হয় ভরা জোছনার আলোতে মুরগী পোড়ার কাহিনী। হিম হিম বাতাসে তপ্ত আগুনে ঝলসানো মুরগীর গোস্তের সঙ্গে, ভরা পূর্ণীমা’র চাদটাকে মনে হয় যেন-সদ্য ভাজা নান রুটি। সব কিছু মিলিয়ে আনমনে বিড় বিড় করে গেয়ে উঠতে হবে, আমি একবার দেখি/বারবার দেখি/ দেখি বাংলার মুখ।
সত্যিই বাংলার রুপ-লাবণ্য দেখার জন্য দূরে কোথাও নয়, সাভারের পাশে নামাবাজার ব্রিজ পার হয়ে ধামরাই উপজেলার রুপনগর, খড়ারচর, ফড়িঙ্গা এবং সিঙ্গাইর উপজেলার কাংশা ব্রিজ পর্যন্ত গেলেই হবে। নামাবাজার/ফোর্ডনগর ব্রিজের উপর থেকে দেখা বংশী নদীটার সৌন্দর্যও বিমোহিত করার মতো।

যাবেন কি ভাবেঃ- গুলিস্তান, গাবতলী বা অন্যকোন বাস স্ট্যান্ড হতে আরিচা/সাভারগামী বাসে যেতে হবে সাভার বাজার বাস স্ট্যান্ড। সেখান হতে রিক্সা/অটো’তে নামাবাজার নদীর পার। ব্রিজের সামনে থেকে ভাড়ায় চালিত মটর বাইক/অটো’তে রূপনগর, চৌঠাইল, খড়ারচর, কাংশাসহ গল্পে উল্লেখিত জায়গাগুলোতে ঘুরে যাবে।
খরচপাতিঃ- সারাদিনের ঘুরাঘুরির জন্য জনপ্রতি ৫০০/৬০০ টাকা হলেই চলবে। তবে খরচের ব্যপারটা অনেকটাই নিজেদের সামর্থের উপর নির্ভর করে।
ভ্রমণ তথ্যঃ-সড়ক পথ ভালো। নিরাপত্তাও রয়েছে যথেষ্ট। চাইলে পরিবারের সব বয়সী সদস্যদের নিয়েও ঘুরে আসা যাবে। শিশুদের বিনোদনের জন্য অত্র এলাকায় আলাদিন ও বাবুল নামক দুটো পার্কও রয়েছে। ফোর্ডনগর ও নামা বাজার ব্রিজ আঞ্চলিক ভাষায় ফুটনগর নামেও পরিচিতি রয়েছে।
বিনিয়োগবার্তা/জেএইচ/ডিএফই//



