শেষ হলো দুদিনব্যাপী বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলন
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টেকসই অর্থায়নসহ জলবায়ুকে প্রাধান্য দেয়ার পরামর্শ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়াসহ নানা কারণে বিপর্যয়ের মুখে পুরো পৃথিবীর পরিবেশ। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেই এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে উত্তরণে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে, প্রভাব মোকাবেলায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে বিভিন্ন সংস্থাসহ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও জলবায়ুকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা তাদের বিনিয়োগের খাত ও নীতি নির্ধারণ করছেন। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টি মাথায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের বিশেষজ্ঞরা।
রোববার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের সমাপনী দিনে বিশেষজ্ঞরা এসব পরামর্শ দেন। দুদিনব্যাপী সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন শুরু হয় ‘মবিলাইজিং ক্লাইমেট স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট ফর সাসটেইনেবিলিটি ইন দ্য ব্যাংকিং সেক্টর’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা দিয়ে। অনুষ্ঠানে বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. আখতারুজ্জামান, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পরিচালক ড. সলিমুল হক, জিআইজেড বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফিরদাউস আরা হুসাইন, জার্মান ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের ডেপুটি হেড ফ্লোরিয়ান হোয়েলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স বিভাগের পরিচালক খন্দকার মোর্শেদ মিল্লাত, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইআরডির ডেপুটি সেক্রেটারি এসএম মাহবুব আলম বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।
বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সাসটেইনেবিলিটি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বিডা, ইআরডি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠান মিলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে জলবায়ু ঝুঁকিকে প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনের মাধ্যমে শিক্ষাবিদ, ব্যাংকারসহ সবাই সাসটেইনেবিলিটি বা স্থায়িত্বের বিষয়ে জ্ঞান ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতসহ প্রায়োগিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে টেকসই সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটবে। পরিবেশগত ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম, তার মানে আমরা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছি। সেজন্য আমাদের ক্লাইমেট স্মার্ট ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে কাজ করতে হবে।
বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব বলেন, টেকসই অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত সব অংশীদারকে আমরা আলোচনায় ডেকে এনেছি। এজন্য পাঁচটা সেক্টরকে বাছাই করেছি, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি, প্রাইভেট সেক্টর, ডোনার হিসেবে জিআইজেড এবং গবেষকের পক্ষ থেকে ড. সলিমুল হককে আমন্ত্রণ করেছি। আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিনিয়োগ কীভাবে আসবে সেটা বের করে আনা। আলোচনার মাধ্যমে আমরা ব্যবসায়ীদের বর্তমান ব্যবসা ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন আনার মাধ্যমে স্থায়িত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আমরা বেসরকারি খাতকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, টেকসই বিনিয়োগের দিকে গেলে আদতে তারাই লাভবান হবে। আলোচনার মাধ্যমে সবাই একমত যে সরকার ও ডোনার উভয়েই টেকসই বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত জার্মান প্রতিনিধিরাও আমাদের কথা শুনেছেন, আমাদের কী প্রয়োজন তা জেনেছেন। বাংলাদেশের জন্য তারা কী ধরনের নীতি নির্ধারণ করবেন, সেখানেও এ আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তারা আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলেও জানিয়েছে।
আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে সাসটেইনেবল রেটিংয়ে সবচেয়ে ভালো করা ১০টি ব্যাংকিং এবং পাঁচটি নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কৃত করে বিআইবিএম। পুরস্কার পাওয়া ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, এনআরবি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক। নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো হলো অগ্রণী এসএমই ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, বিআইএফএফএল, আইডিএলসি ফাইন্যান্স ও আইপিডিসি ফাইন্যান্স।
ব্যাংকিং সম্মেলনের সমাপনী দিনে ‘কি অপারেশনাল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এরিয়াস অব ব্যাংকিং’ শীর্ষক চারটি প্লেনারি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে দেশ ও দেশের বাইরে থেকে আসা ব্যাংকার ও একাডেমিশিয়ানরা উপস্থিত থেকে তাদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। সন্ধ্যায় সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দুদিনব্যাপী সম্মেলন শেষ হয়।
সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল বলেন, সম্মেলনে যেসব গবেষণা উপস্থাপন করা হয়েছে, সেখানে ব্যাংক খাতের সঙ্গে জড়িত গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে এনেছেন। এটি ব্যাংক খাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ভূমিকা রাখবে। নীতিনির্ধারকরা নীতি নির্ধারণ করার জন্য মূল্যবান দিকনির্দেশনা পাবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, মূল্য সাশ্রয়ী বিভিন্ন ধরনের কারখানা স্থাপনেও উদ্বুদ্ধ করছে। সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য হচ্ছে গতিশীল ও কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক খাতে স্থিতিশীলতা আনার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করা যাবে।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই//



