1864

এক ভোরেই শহিদ ২৭ বীর মুক্তিযোদ্ধা

নিজস্ব প্রতিবেদক: সেদিন আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছিল বিষাদের ঘনঘটা। এ যেন বেদনা বিধুর দিন! ১৯৭১ সালের ২৬ নভেম্বর ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কামান্না গ্রামে পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংস হামলায় এক ভোরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মাগুরা জেলার বিভিন্ন গ্রামের ২৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

একাত্তরে মাগুরা সদর থানা সম্মিলিত মাজেদ বাহিনী গড়ে উঠেছিল। এরই একটি দল কামান্নায় শহিদ হন। এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন শমসের আলী এবং ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন আবু বক্কার। সেদিনের সেই আত্মত্যাগ এবং বুকের রক্ত দেওয়ার কথা ইতিহাস সাক্ষী আছে।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কামান্না গ্রামের একাধিক প্রবীণ জানান, ৪২ জন মুক্তিযোদ্ধা গ্রামের দুইটি টিনের ঘরে ক্যাম্প তৈরি করেন। এ ক্যাম্প থেকেই অপারেশন চালাতেন তারা। হামলার রাতে ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অন্য জায়গায় ছিলেন। দিনভর বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা অপারেশন চালিয়ে রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। ভোর ৪টার দিকে পাক হানাদার বাহিনী অভিযান চালিয়ে ঘুমন্ত অবস্থাতেই হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধাদের। পরদিন সকালে গ্রামবাসী ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা, এক নারীসহ দুইজন গ্রামবাসীর মৃতদেহ দেখতে পান। পরে গ্রামবাসী এসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের মৃতদেহ পাঁচটি গণকবর খুঁড়ে কলা পাতা দিয়ে মুড়িয়ে কামান্নাতেই গণকবর দিয়েছিলেন।

কামান্না ট্র্যাজেডিতে শহিদ খোন্দকার রাশেদ আলীর ভাই খোন্দকার মহাম্মদ আলী জানান, কামান্নায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অপারেশন চালিয়ে ২৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ঘুমন্ত অবস্থাতেই হত্যা করে। ঐ ঘটনায় শহিদ ২৭ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তিনজনই আমাদের পরিবারের। আমার বড় ভাই খোন্দকার রাশেদ আলী, চাচা সেলিম বিশ্বাস এবং আমার ভগ্নিপতি শহিদুল ইসলাম কামান্নায় শহিদ হন।

কামান্নায় শহিদ ২৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা হলেন-  শহিদুল ইসলাম, খোন্দকার রাশেদ আলী, আলমগীর মৃধা লালু, অধীর কুমার বিশ্বাস, গৌর চন্দ্র রায়, মুন্সি আলিমুজ্জামান আরিফ, হোসেন আলী, শরিফুল ইসলাম, রিয়াত আলী মন্ডল, সেলিম বিশ্বাস, আব্দুল কাদের বিশ্বাস, মমিন উদ্দিন শেখ, ওহিদুজ্জামান বিশ্বাস, আব্দুল মোতালেব মুন্সী, গোলজার খাঁ, মাছিম মুন্সী, গোলাম কাওছার মোল্লা, আব্দুল সালেক মোল্লা, মনিরুজ্জামান মনি খাঁ, আলী হোসেন মিয়া, তাইজুল ইসলাম বিশ্বাস, আব্দুল রাজ্জাক মিয়া, ছলেমান শিকদার, আনিসুর রহমান, নির্মল কুমার বিশ্বাস, মুন্সী আব্দুর রাজ্জাক এবং গোলাম আকবর। তাদের সঙ্গে প্রাণ হারানো কামান্নার দুই গ্রামবাসী হলেন- ফণী ভূষণ কুণ্ডু ও রাঙ্গা বিবি।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কামান্না গ্রামের ৭০ বছর বয়সী মধুসূদন কুণ্ডু জানান, মাগুরার বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা কামান্নার মাধব চন্দ্রের পুরোনো দুইটি বাড়িতে অবস্থান করছেন বলে জানতেন গ্রামবাসী। মাধব চন্দ্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ভারতে চলে যান। ঐ সময় শৈলকুপা উপজেলা থানা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখলে ছিল। স্থানীয় রাজাকারদের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে শৈলকুপা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা ক্যাম্প থেকে পাকিস্তানি সেনারা একটি দল গঠন করে কামান্না গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় মাগুরার ২৭ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন।

কামান্নায় শহিদদের স্মরণে মাগুরার হাজীপুর গ্রামে ও ঝিনাইদহের শৈলকুপার কামান্না নামক স্থানে কামান্না হাই স্কুল বধ্যভূমি ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। রণাঙ্গনের এই বীর শহীদদের স্মরণে প্রতিবছর ২৬ নভেম্বর কামান্না স্মৃতিসৌধ এবং মাগুরার হাজীপুরে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করা হয়।

বিনিয়োগবার্তা/এসএল// 


Comment As:

Comment (0)