বিজয় দিবস উপলক্ষে বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান

রক্ত দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা করে পুলিশ বাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক:  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ বুলেটটি ছোড়া হয় পুলিশের পক্ষ থেকে, এমনকি নিজেদের রক্ত দিয়েই যুদ্ধের সূচনা করেন তারা। 

 শনিবার (১৭ ডিসেম্বর) রাজারবাগ অডিটোরিয়ামে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বীর পুলিশ মুক্তিযোদ্ধাগণের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া সাবেক পুলিশ সদস্যরা।

এসময় সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, যে পুলিশের সূচনা আপনারা করেছেন, অকাতরে জীবন দিয়ে। অহংকার ও গর্ববোধ করি। তা এই ২২ সালেও ধরে রেখেছি। ক্রান্তিলগ্নে আমরা সবার পাশে দাড়িয়েছি। ১২-১৩ সালে আগুন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছি। আগুনে পুড়ে মরেছি।

তিনি বলেন, জঙ্গিদের হামলায় ২০১৫-১৬ সালে জীবন দিয়েছে পুলিশ সদস্যরা। তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অভিযান চালিয়েছি। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোরভাবে কাজ করেছি। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া হয়নি।

তিনি আরো বলেন, যারা পাকিস্তানের সঙ্গে মিলে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় তাদের কোনো স্থান দেশে নাই। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতে পারবো না। কিন্তু যারা সমস্যা তৈরির চেষ্টা করবে কঠোর হাতে দমন করা হবে।

কমিশনার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে বলেন, রাজনীতির অবস্থা কি তা আপনারা জানেন। ১০ ডিসেম্বর আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ করেছি। আপনারা হয়তো দেশে অরাজকতা পছন্দ করবেন না। আমরাও তা করি না। তাই আমরা এসব কাজ নিয়ে চিন্তায় থাকি। কাজ করতে হয় সার্বক্ষণিক।

এর আগে মুক্তিযদ্ধে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধারা তাদের স্মৃতিচারণ করেন। এসময় অতিরিক্ত ডিআইজি সত্য রঞ্জন বারৈ বলেন, ৭ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ বহু মিছিল করা হয়েছে। এগুলো শহীদ মিনারে শুরু হতো শেষ হতো ৩২ নম্বরে। আবার ৩২ নম্বর থেকে শুরু হয়ে শেষ হতো শহীদ মিনারে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাউথ হলের ৩১৮ নম্বর রুমে থাকতাম। ইকবাল হল এট্যাক হয়েছে ২৫ মার্চ রাতে। জগন্নাথ হলে তখনো এ্যটাক হয়নি। মর্টালশেল দিয়ে প্রাচীর ভাঙা হলো। সবাই ভিতরে ঢুকে পৈশাচিক কার্যক্রম শুরু করলো। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু করে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত গোলাগুলি চললো।

তিনি বলেন, আশপাশে যত মানুষ মারা হয়েছে সবাইকে বুলডোজার দিয়ে কবর দেয়া হোলো। এই লাশের মধ্যে অনেক নাম করা মানুষ ছিলো। অনেক কিছু করেছি দেশকে স্বাধীন করতে।

সাবেক ডিআইজি বীর প্রতিক কাজী জয়নাল আবেদীন সরকার বলেন, মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ওয়েভ শুরু হয়। বাঙ্গালীর বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধের। শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাঙ্গালীর মুসলিম আন্দোলন শুরু করলেন। এটা শুরু করার কারনে এখনো দেশে কিছুটা ঝামেলা রয়ে গেছে। বাঙ্গালী চেতনা জাগ্রত হওয়ার পর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা করার চেষ্টা শুরু হয় দেশে। কিছু মানুষ আমাদেরকে পাকিস্তানের পক্ষ হয়ে কাফির বলতে শুরু করলো। মাওয়াবাদীরাই বাংলাদেশের প্রধান শত্রু। এখনো তারা দেশের সবচেয়ে বড় শত্রু।

তিনি আরো বলেন, রাত ১১টা থেকো ১২ টার মধ্যে জানতে পারলাম কুমিল্লা থেকে একটা কনভয় যাবে চট্টগ্রামে। আমরা ফেনিতে এক ধরনের বাঁধা সৃষ্টি করি। কিন্তু আটকাতে পারলাম না। মেজর জিয়ার সঙ্গে দেখা হলো ভারতের সীমান্তে। সে আমাকে অফিসিয়াল কাজ দিলো। এরপর কর্নেল তাহের আসলো। তার সঙ্গে যুদ্ধ করলাম। ইন্ডিয়ান স্টেনগান ছিলো আমার কাছে। সেটা বেশি ভালো ছিলো না। চাইনিজ স্টেনগান ছিলো আর্মির কাছে। এসএলআর ছিলো মুক্তি বাহিনীর কাছে।

তিনি বলেন, মেজরদের কোনো ব্যাটালিয়ান চালানোর ক্ষমতা ছিলো না। তারা পুরো মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে সামলাবেন। তারা যুদ্ধ করেছেন। তারা সেক্টর কমান্ডার ছিলো এটা সত্যি। রশদ যুগিয়েছে প্রবাস সরকার। মেজররা এসব করেনি। তবে তারা যুদ্ধ করেছে। তারা সেক্টর কমান্ডার ছিলো। ৪ ডিসেম্বর আমরা যুদ্ধ করি। এসময় ৬৭ জন পাকিস্তানি আমাদের কাছ স্যারেন্ডার করলো। ২০০ মুক্তি বাহিনী নিয়ে আমি জামালপুর যাই। জামালপুর ৯ ডিসেম্বর রাতে যুদ্ধ করলাম। সেখানে দেড় হাজার পাকিস্তানি আর্মি ছিলো। তাদের অর্ধেক মারা যায়। বাকিরা স্যারেন্ডার করে।

ভোট নিয়ে তিনি বলেন, অনেকে বলে ভোট নাকি রাতে পুলিশ দিয়ে দিয়েছিলো। কিভাবে দেয়। একটা কেন্দ্রে পুলিশ থাকে তিন চার জন। এই কথা বললেই হবে না। পুলিশ সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে ২০১৩-১৪ সালে। এখন যারা পুলিশে কাজ করেন তারা সাবধানে থাকবেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মাবুদ পিপিএম বলেন, গন্ডগোল কখনো ছিলো না, ছিলো মুক্তির সংগ্রাম। আমি বিশ্বের অনেক দেশ ঘুরেছি। সেখানে দেশকে তুলে ধরেছি। পাসপোর্টের ডিজি থাকা কালীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জানিয়েছি কিভাবে আমাদের পাসপোর্ট সবুজ হয়েছে। আমি ছাত্র থাকা কালীন যুদ্ধ করেছি। দেশ গঠন করতে আমাদের দেশের কিছু শত্রু তৈরি হয়ে গেছে। আমরা চেষ্টা করবো এদের প্রতিরোধ করে দেশকে সেনার বাংলায় রুপান্তর করতে হবে।

মুক্তিযোদ্ধা অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান বলেন,  আমাদের মনের ভেতর অনেক কথা আছে। যা আমরা আবেগে বলতে থাকি। আমরা যাদের নিয়ে গর্ব করি, যাদের বিপদে ফেলে আমরা আনন্দিত হই। যাদের সাহায্য বিপদে আমরা পাই।

তিনি বলেন, ৭ মার্চের ভাষণের কারনে আমরা গিয়েছি তা সত্যি। এর পাশাপাশি আমরা ভাইয়ের ও বোনের রক্তের শোধ নিতে যুদ্ধে যেতে হয়েছে। আমরা যাদি প্রয়োজন পরে আবার যুদ্ধে যাব। বার্ধক্য এসেছে কিন্তু মনের জোর এখনো কমেনি। যারা এখন দেশের বিরুদ্ধে কাজ করছে তাদের বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল বলেন, অনেকে বলেছেন বেশি সময় নিয়েছে। মোটেও না, আমি বিরক্ত হইনি। আপনারা যারা বক্তব্য দিয়েছেন তারা দয়া করে প্লিজ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি লিখে রেখে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের খোদা নিজ হাতে তৈরি করে দিয়েছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য। যদি আমরা দেশকে সঠিকভাবে গড়তে না পারি তাহলে রক্তের ঋণ শোধ হবে না। এত রক্ত দিয়ে দেশ কিনেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের কোনো দেশ এটা করতে পারেনি।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা অপরাধী ছিলেন তাদের বিচার হয়েছে। বিচার করে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এটা প্রধানমন্ত্রী করেছেন। নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা এখন বলতে পারি রাজাকারদের বিচার হয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশ এটা পারনি। কম্বডিয়া চেষ্টা করেও পারেনি।

মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম সাবেক এসপি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, যুদ্ধে পুলিশের যে গৌরব গাঁথা তা স্বীকার করতে হবে। তার আগে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করতে হবে। যেসব কুলাঙ্গাররা বঙ্গবন্ধুকে স্বীকার করে না, যারা এই দেশকে বাঙ্গালীদের দেশ ভাবে না তাদেরকে এই দেশ থেকে বিদায় করতে হবে। এই দেশের আকাশ, বাতাসে তারা থাকতে পারবে না। ৩০ লাখ মা বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের সম্মান করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধারা মাথা দিয়ে দিয়েছে অস্ত্রের সামনে। বুকের রক্ত দিয়েছে দেশের স্বাধীনতার জন্য। 

তিনি বলেন, তিন মাসের মধ্যে পাকিস্তান আর্মিকে আবদ্ধ করে ফেলেছিলাম। তারা ক্যাম্প ও ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হতে কনভয় লাগতো। আমাদের কাছে ছিলো থ্রিনটথ্রি। এটা দিয়েই আমরা যুদ্ধ করেছি। মুক্তি যুদ্ধে প্রথম রক্ত দিয়েছে পুলিশ। যুদ্ধ শুরু করেছে পুলিশ তাদের অজস্র রক্ত দিয়ে।

বিনিয়োগবার্তা/এমআর//


Comment As:

Comment (0)