সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী
‘কাতারে বাংলাদেশের অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেছি’
নিজস্ব প্রতিবেদক: কাতারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সম্মেলনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সাম্প্রতিক এ সফর নিয়ে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সম্মেলনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আমি বাংলাদেশের অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরি। একইসঙ্গে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে আমাদের বিভিন্ন দাবি ও প্রত্যাশার কথা উত্থাপন করেছি।
এরআগে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি ৫: সম্ভাবনা থেকে সমৃদ্ধি) পঞ্চম জাতিসংঘ সম্মেলনে যোগ দিতে গত ৪ মার্চ কাতার সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আমন্ত্রণে দেশটি সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিভিন্ন ইভেন্টে তিনি অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানি এবং জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আমন্ত্রণে স্বল্পোন্নত দেশসমূহ সংক্রান্ত ৫ম জাতিসংঘ সম্মেলনের দ্বিতীয় পর্বে যোগ দিতে আমি ৪ থেকে ৮ই মার্চ দোহা সফর করি। এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্রম পোটেনশিয়াল টু প্রোসপারিটি’। এর আগে ২০০১ সালে আমি ব্রাসেলসে তৃতীয় এলডিসি সম্মেলন এবং ২০১১ সালে ইস্তাম্বুলে চতুর্থ এলডিসি সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলাম। জাতিসংঘ এলডিসি সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের শেষ অংশগ্রহণ। কারণ, ২০২৬ সালে আমরা এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাব।
৫ই মার্চ আমি কাতার ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের ওপেনিং প্ল্যানারি মিটিংয়ে বিশেষ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করি। এই অনুষ্ঠানে আমি ছাড়াও কাতারের আমির, জাতিসংঘের মহাসচিব, ৭৭তম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি এবং এলডিসি গ্রুপের বর্তমান চেয়ার মালাউই-এর রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখেন।
তিনি আরো বলেন, আমি আমার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেছি যে স্বল্পোন্নত দেশগুলো করুণা বা দাক্ষিণ্য চায় না, বরং আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের ন্যায্য পাওনা চায়। আমি কভিড অভিমারি ও চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী খাদ্য, জ্বালানি ও আর্থিক সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য গৃহীত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের দাবি জানাই। এক্ষেত্রে আমি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, নিরাপদ অভিবাসন, জলবায়ু অর্থায়ন প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের বিশেষ প্রয়োজনের কথা তুলে ধরি। এছাড়া, বাংলাদেশসহ উত্তরণের পথে থাকা দেশগুলোর উন্নয়ন অর্জনকে গতিশীল রাখতে বর্ধিত সময়ের জন্য এলডিসিদের জন্য প্রযোজ্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধাসহ অন্যান্য সুবিধা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানাই।
শেখ হাসিনা লিখিত বক্তব্যে বলেন, ৫ মার্চ দুপুরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা হতে উত্তরণের পথে থাকা তিন এশীয় দেশ বাংলাদেশ, নেপাল ও লাও পিডিআর- কর্তৃক আয়োজিত ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড স্মুথ ট্রানজিশন ফর দ্যা গ্রাজুয়েটিং কোহর্ট অব ২০২১’ শীর্ষক সাইড ইভেন্টের উচ্চ পর্যায়ের অধিবেশনে আমি অংশ নেই। আমি বাংলাদেশের উত্তরণযাত্রা ত্বরান্বিত করতে আমাদের সরকারের উদ্যোগের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি উত্তরণমুখী দেশগুলোর পক্ষে পাঁচ-দফা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করি। এ অনুষ্ঠানের শেষে তিন দেশের সমন্বিত দাবি সম্বলিত একটি যৌথ বিবৃতি গৃহীত হয়। ৬ মার্চ সকালে আমি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘দ্যা রাইজ অফ বেঙ্গল টাইগার: পোটেনশিয়াল অফ ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক বিজনেস সামিটে অংশগ্রহণ করি। এই অনুষ্ঠানে কাভারের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনসমূহের নেতৃবৃন্দসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য অংশগ্রহণ করেন।
তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ ও কাতারের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানাই। এ প্রসঙ্গে আমি দুদেশের সরকারের মধ্যে একটি যৌথ ব্যবসা ও বিনিয়োগ কমিটি এবং দু'দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি যৌথ বিজনেস ফোরাম গঠনের প্রস্তাব করি। এছাড়া, আমি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি সঞ্চালন ব্যবস্থা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, পর্যটন, স্টার্ট আপসহ বিভিন্ন খাতে কাতারের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাই।
এছাড়া লিখিত বক্তব্যে মূলত সফরে অংশ নেয়া বিভিন্ন ইভেন্টের তথ্য তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, জাতিসংঘ এলডিসি-৫ সম্মেলনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি আমি কয়েকটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করি। ৫ মার্চ কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানির সঙ্গে আমার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটাতে কাতার বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে বৈঠককালে কাতারের মহামানা আমির আমাকে আশ্বাস প্রদান নেন। ৬ই মার্চ কাতার ফাউন্ডেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন আমিরের মাতা শেখা মোজা বিনতে নাসেরের সঙ্গে আমার বৈঠক হয়। বৈঠকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন খাতে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়। ৪ মার্চ বিকেলে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে আমার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আমি ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে তার চলমান আলোচনা অব্যাহত রাখার আহবান জানাই। আমি মিয়ানমারে দ্রুত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এবং কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে আরও রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়ে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাই।
বিনিয়োগবার্তা/এসএএম//



