সানেমের জরিপ
খাদ্য নিরাপত্তায় ভুগছে নিম্ন আয়ের মানুষ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার প্রভাবে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯-১০ পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এমন পরিস্থিতিতে নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি উপলদ্ধি করতে পেরেছে এই মূল্যস্ফীতি। ফলে দেশের নিম্ন আয়ের মানুষগুলো খাদ্য নিরাপত্তায় ভুগছে এমন তথ্য উঠে এসেছে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) জরিপে।
বুধবার (২৯ মার্চ) মহাখালী ব্রাক সেন্টারের হল রুমে আয়োজিত “কেমন আছেন নিম্ন আয়ের মানুষ” শিরোনামে সানেমের জরিপ প্রকাশ অনুষ্ঠানে ড. সেলিম রায়হান এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, বেড়ে যাওয়া খরচের প্রভাবে নিম্ন আয়ের মানুষদের বিভিন্নভাবে সামঞ্জস্য করতে হচ্ছে। এ সময় খাদ্যে জাতীয়ভাবে খরচ বেড়েছে ১৭.২ শতাংশ। এছাড়া শহর অঞ্চলে এ খরচ বেড়েছে ১৯ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ।
সানেম জানায়, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের মানুষ কীভাবে মোকাবিলা করছেন এবং সামনের দিনগুলোর বিষয়ে তাদের ভাবনা কী, তা বিশদভাবে বোঝার জন্য সানেম একটি জরপি পরিচালনা করেছে। ২০২৩ সালরে ৯ থেকে ১৮ মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত এ জরিপে ১৬০০ থানার নিকট থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। বাংলাদেশের আটটি বিভাগীয় জেলা ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামে জরিপটি পরিচালনা করা হয়।
জরিপে ফলাফল উপস্থাপন করে সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ব্যয় বাড়ার বিষয়টি কীভাবে মোকাবিলা করছেন এমন প্রশ্ন রাখা হয় সাধারণ মানুষদের কাছে। জবাবে ৯০.২ শতাংশ বলেছে, তারা তাদরে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনেছে। ধার করে চলছে ৭৩.৮ শতাংশ এবং ৫৫.৯ শতাংশ মানুষ বলছে তারা নন-ফুড আইটেমের খরচ কমিয়ে এনেছে। সঞ্চয় করার সুযোগ কমিয়ে এনেছে ৫৫.৫ শতাংশ, ওভার টাইম কাজ করছে ৩৯.৩ শতাংশ, ৩৫.৩ শতাংশ মানুষ তাদরে সঞ্চয় যা ছিল তা থেকে অতিরিক্ত খরচ করছে।
তিনি আরও বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের সঞ্চয়ের সুযোগ এমনিতেই কম। তার ওপর তাদের এ টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতিতে। অন্যদিকে শহর ও গ্রামের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্য পরিবর্তন করেছে ৯৪.৪ শতাংশ মানুষ। গ্রামে সেটা ৮৬ শতাংশ। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধার করে চলছে শহরের ৭৩.৮ শতাংশ এবং গ্রামের ৭৩.৮ শতাংশ মানুষ।
জরিপে উঠে এসেছে, নিম্ন আয়ের মানুষ খাদ্যাভাসে এনেছে বড় পরিবর্তন। আয়ের টাকা ব্যয়ের ক্ষেত্রে করতে হচ্ছে সংকোচন। সানেম শহর এবং গ্রামের প্রায় ১৬০০ পরিবারের উপর করা জরিপে উঠে এসেছে এমন তথ্য। বিগত ৬ মাসের অর্থাৎ গত বছর সেপ্টেম্বর-২০২২ থেকে ফেব্রুয়ারি-২০২৩ এ জরিপে দেখা গেছে সাধারণ মানুষ খাদ্যর পরিমান কমিয়েছে ৯০.০২ শতাংশ মানুষ। অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে ধার করছে ৭৩.০৮ শতাংশ মানুষ। নন ফুড কমিয়েছে ৫৫.০৯ শতাংশ মানুষ। আয়ের একটা অংশ সঞ্চয় করা হতো সেটা কমিয়েছে ৫৫.০৫ শতাংশ মানুষ। ব্যয় মেটাতে নির্দিষ্ট কাজের বাহিরেও ওভারটাইম বা অতিরিক্ত পরিশ্রম করছে ৩৯.০৩ শতাংশ।
এখানে লক্ষ্য করা গেছে, আয়ের সাথে ব্যয়ের সমন্বয় করতে গিয়ে গ্রাম অঞ্চলের মানুষ থেকে শহরের মানুষ খাদ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে খরচ পরিবর্তন এনেছে বেশি। যেমন, চাল ক্রয় কমিয়েছে ৩৭.০৮ শতাংশ, আটা ৫৬.৫৫ শতাংশ, ডাল ৪৫.৫৩ শতাংশ, গোস্ত ৯৬.০৪ শতাংশ, মাছ ৮৮.২২ শতাংশ, ডিম ৭৭.০৬ শতাংশ, তেল ৮১.৪৩ শতাংশ এছাড়াও অন্যান্য ৫৯.৫৩ শতাংশ মানুষ।
যে সমস্ত পরিবার মাসে ৪ বার মুরগি খেত তারা এখন খাচ্ছে ২ বার। মাসে ডিম খেত ৮.১ বার তারা খাচ্ছে ৫.৮ বার। ইলিশ মাছ খেত ৩ বার তারা এখন খাচ্ছে ১ বার, এছাড়াও রুই/কাতলা মাছ খেত ৬.৩ বার তারা এখন খাচ্ছে ৪.৩ বার। গরুর গোস্ত ৬ মাস পূর্বে খেত ১ শতাংশ মানুষ এখন খাচ্ছে ০.৩ শতাংশ। গাসির গোস্ত ৬ মাস আগে ছিল ০.২ শতাংশ এখন ০.১ শতাংশ। মুরগি আগে খেত ৪ শতাংশ এখন খাচ্ছে ২ শতাংশ। ডিম ৬ মাস আগে খেত ৮.১ শতাংশ আর বর্তমানে খাচ্ছে ৫.৮ শতাংশ। ইলিশ মাছ ৬ মাস আগে খেত ০.৩ শতাংশ এখন ০.১ শতাংশ। রুই বা কাতলা মাছ ৬ মাস আগে খেত ৬.৩ শতাংশ এখন ৪.৩ শতাংশ।
উল্লেখ, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং-এর (সানেম) সবশেষ ৬ মাসের নিম্ম আয়ের মানুষদের নিয়ে করা জরিপটি হয়েছে মুলত শহরের সিটি করপোরেশন এরিয়ার বাসিন্দাদের মধ্যে এবং গ্রামে উপজেলা পর্যায়ের মানুষের নিয়ে। ৮ টি অঞ্চলে এই জরিপ করা হয়। অঞ্চলগুলো হলো, বরিশাল সিটি করপোরেশনের বাকের গঞ্জে, চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে, ঢাকার সাভারে, খুলনার বাটিয়াঘাটা, ময়মনসিংহের গৌরিপুরে, রাজশাহীর গোধাগারি, রংপুরের মিঠাপুকুর, সিলেটের বিশ্বনাথ এরিয়ার মানুষের মধ্যে। এই ৮টি অঞ্চলে মোট ২০০ করে ১৬০০ পরিবারের মধ্যে সার্ভে করা হয়। এদের মধ্যে পাকা বাড়ির পরিমান ১২.৮১ শতাংশ, আধা পাকা ৩৪.০৬ শতাংশ এবং কাচা বাড়ির সংখ্যা ৫৩.১৩ শতাংশ।
গত ৬ মাসের তুলনায় বর্তমানে জরিপ করা মানুষের গড়ে ব্যয়ে বেড়েছে গ্রাম পর্যায়ে ১৩.০৯ শতাংশ, শহরে ১২.০৪ শতাংশ, জাতীয় পর্যায়ে ১৩.০১ শতাংশ।
বিনিয়োগবার্তা/এএইচএস/এমআর//



