ঘুরে আসুন কোম্পানীগঞ্জ
ঈদের লম্বা ছুটি মানেই নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ানো-খুুঁজে বেড়ানো নতুন কোন লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পুরো পরিবার কিংবা দল বেধে ঘুরে বেড়ানোর মত সৌন্দর্যের লীলাভুমি ভারতের চেরাপুঞ্চি লাগোয়া এমনি একটি জায়গা থেকে ঘুরে এসে লিখেছেন মো.জাভেদ হাকিম।
পরিকল্পনা ছিল প্রকৃতি কন্যা সিলেট বিভাগ চষে বেড়ানো। ছুটি শুরুর আগের রাতেই মাইক্রোতে চড়ে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের নয় ভ্রমণ পাগলা ছুটি। বৃষ্টিভেজা গভীর রাতে সুনশান নিরিবিলি রাজ পথে গাড়ী চলছে শাঁ শাঁ করে। ঢাকা ছাড়ার পর বাতি হীন অন্ধকার পথের শুরু। তবে ঘুট ঘুটে অন্ধকারেরও আলো আছে। সেই আলোর অনুভূতি ভিন্ন শিহরণের। এক অন্য রকম অনুভূতি সাঙ্গী করে সারারাত নানান গল্প-সল্প করতে করতে সকাল ৯টার মধ্যেই সিলেটের বাদাঘাট পৌছাই। আগে থেকেই আমাদের জন্য নোঙ্গর করা ছিল বিশাল এক বালুর কার্গো। নয় জনের জন্য কমপক্ষে তিনশ জন ধারণ ক্ষমতার কার্গো। এ যেন মশা মারতে কামানের গোলা। কি আর করা হেসে-খেলে – গেয়ে-নেচে উল্লাস করি।

বাদাঘাট হতে কার্গো ছেড়ে যখন ডাকাতি হাওড়ে পড়ে তখন প্রকৃতির কি যে আনিন্দ রুপ তা বুঝানো যাবে না। একটা জায়গায় তো মনেই হবে আপনি সিলেট নয় সুন্দরবনের কোন সরু খাল দিয়ে যাচ্ছেন। এক কথায় ওয়াও ! হাওড় শেষে ধলাই নদী। সে আরেক নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের ছড়া কবিতা। সব যদি ঘরে বসেই জেনে যান তাহলে ঘুরতে গিয়ে দেখবেন কি? তাই আপনার অনুভূতি জানার জন্য আজ ধলাই নিয়ে না লিখি। প্রায় আড়াই ঘন্টা পর কোম্পানীগঞ্জের দয়ার বাজার পৌছি। সিলেট টুরিস্ট ক্লাবের সদস্য সজ্বন ব্যক্তি জামান ভাই খেয়াঘাটে এসে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুদের রিসিভ করেন। তিনি আমাদের জায়গা দিলেন তাঁর বাড়িতে। উনার সেবা-যতেœর ফিরিস্তি দিয়ে শেষ করা যাবে না।
জুম্মার নামাজ পড়ে খেয়ে দেয়ে বিকালটা কাটাই মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ- ভোলাগঞ্জের জিরো পয়েন্টের সাদা পাথরের রাজ্যে। সঙ্গী সাথীরা উজান থেকে নেমে আসা হিম শীতল পাথুরে ধলাই নদীতে জলকেলিতে মেতে উঠে। আমি না ভিজে এদিক সেদিক হাঁটি। গত তিন বছর আগে যখন এসেছিলাম তখন খুঁজে পাইনি একটিও চিপ্সের প্যাকেট অথচ এবার যেমন বেড়েছে পর্যটক তার চাইতে বেশী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চিপ্সের প্যাকেট আর প্লাস্টিকের খালি বোতল। সে এক বিদঘুটে অবস্থা। অবশেষে স্থানীয় সামাজ সেবক কালাম ভাই ও অন্যদের সহযোগিতায় কিছুটা পরিস্কার করি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। মাগরিবের নামাজ শেষে দয়ার বাজারের উদ্যেশে পানি পথ ধরি। দয়ার বাজার এসে চাল – ডাল Ñ মুরগী – তেল – মসলা কিনে আশ্রয় পাওয়া বাড়ির বিশাল উঠানেই চলে বার-বি-কিউর প্রস্তুতি। সঙ্গে খিচুড়ী। ঘন্টা দুয়েকের জন্য আমরা সবাই তখন ছিলাম জগৎ সেরা বাবুর্চি। খেয়ে দেয়ে যাই এবার ঘুমোতে। ভ্রমন পিপাসুদের রসালো আলাপের কারণে ঘুম কি আর আসে। তবুও চোখ বুজে ঘুমানো চেষ্টা।
পরদিন সকালে ছুটি হালের ক্রেজ হতে যাওয়া উৎমা ছড়ার পথে। কিছুটা পথ চলার পরেই চোখ আটকাবে অধরা পাহাড়ের সবুজ গালিচায় মোড়ানো ক্যানভাসে। আরো কিছুটা পথ এগুলে – পাহাড়ের গা বেয়ে অবিরাম ধারায় নেমে আসা ঝর্ণার অট্ট হাসি সঙ্গী করে পৌছে যাবেন নৈসর্গিক সৌন্দর্যের উৎমা ছড়ার বাহুতে। মটর বাইক থেকে নেমেই হই আশ্চর্য! একি মানুষ যতদূর খোঁজ পেয়েছে – তার চাইতেও ছড়িয়ে আছে অনেক অনেক বেশী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এর পর নেমে যাই এক্কেবারে মেঘালয়ের সীমান্ত ঘেষা পাহাড়ি ছড়ায়। মেতে উঠি আনন্দে। অনেকটা সময় কাটিয়ে যাই এবার তুরং ছড়ার পানে। ভোলাগঞ্জের ফারুক ভাই জায়গাটার খোঁজ দিয়েছেন। হাফিজ ভাইয়ের বাইকে চড়ে ছুটি। যতই এগিয়ে যাই ততই যেন মুগ্ধতা ভর করে। সে এক অপার্থিব অনুভূতি। নৈঃশব্দের মায়াবী পথের দৃশ্য – আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা দিগন্ত ছোঁয়া পাহাড়, সেই পাহাড়ে ঘুমিয়ে থাকা শুভ্র মেঘের ভেলা-নীল আসমানের আলোক রশ্নী- বাঁশ বাগানের ছায়া,বিস্তৃত ফসলের মাঠ সব মিলিয়ে যেন স্বাদের কাচা গোল্লা খাওয়ার মত মনে সুখ সুখ ভাব।
বাইক ছেড়ে এবার গ্রামের মেঠো পথ ধরে সামান্য কিছু পথ মাড়িয়ে হাজির হই প্রকৃতি কন্যা তুড়ং ছড়ার জমিনে। চার পাশ সুনসান নিরিবিলী। নিঝুম নিস্তব্দতার তুড়ং ছড়ার একমাত্র সঙ্গী পাথরের গা ভিজিয়ে অবিরাম ধারায় ধেয়ে আসা স্বচ্ছ পানির কলকল শব্ধ। এমন নয়ন জুড়ানো প্রকৃতির কাছে হার মেনে আবারো নিজেদের সমর্পন করি হীমহীম স্ফটিক শীতল স্বচ্ছ পানিতে। তুড়ং ছড়াকে অনেকে কূলী ছড়া নামেও ডেকে থাকে। এখানে এখনো নির্মল প্রকৃতি বিনষ্টকারী হায়েনাদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে নাই, মাড়ায়নি কোন গাইরা (নোংড়া) পর্যটকের দল। দু-চারজন বাসিন্দা যাও দেখলামÑতাঁরাও যেন প্রকৃতির সাথে মিশে শান্ত কোমল। এরকম দৃষ্টিনন্দন আকর্ষনীয় নৈসর্গিক পরিবেশের সাক্ষাৎ পেয়ে বেশ উৎফুল্ল অনুভুব করি। অপার সৌন্দর্যের তুরং ছড়ার ধবধবে সাদা পানি, সবুজ বৃক্ষ,লালচেÑ বাদামি রঙা পাথর সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ। পানির স্বচ্ছতা এতটাই যে, হাটু সমান পানির নিচের পাথর গুলোও স্পষ্ট দেখা যায়। আরো দেখা যাবে উজান থেকে ভাটিতে পানি নামার অভূতপূর্ব দৃশ্য। তুরং ছড়ার ভৌগলিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অবগাহন কয়েক পাতা লিখেও শেষ হবার নয়। যা শুধু সচক্ষে দেখে অনুভব করা সম্ভব। আমাদেরত কেউ একজন ছড়া ধরে হেটে ভুল করেই সীমানা পেরিয়ে ভারতের চেরাপুঞ্জি ঢুকে গিয়েছিল। যখন সে আমাদের শোরগোলে জানল – তখন তাহার অবস্থা, ছেড়ে দে মা কাইন্দা বাঁচি। আমরাও হাফ ছেড়ে বাঁচি। বন্ধু ফিরে এসে, এগিয়ে যাওয়া ওইটুকু জায়গা সম্পর্কে যখন বর্নণা দিল Ñতখন আমরা আফসোসে মরি। এবার বিদায়ের পালা-তাহলে বন্ধুরা আর দেরি কেন ? দুই দিন সময় হাতে নিয়ে ঘুরে আসুন পানি – পাথর আর মায়াবিনী প্রকৃতির রাজ্য থেকে।

যেভাবে যাবেন ঃ- ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ হতে সিলেটে যাবার বিভিন্ন পরিবহনের দিনে রাতে বাস সার্ভিস রয়েছে। ভাড়া চারশ পঞ্চাশ হতে বারশ টাকা মাত্র। এছাড়া ট্রেন ও আকাশ পথেও যাবার সুযোগ রয়েছে। ট্রেনে তিনশ ষাট টাকা হতে বারশ টাকা পর্যন্ত। বিমানে তিন হাজার হতে পয়ত্রিশ’শ টাকা পর্যন্ত। সিলেট শহরের আম্বরখানা হতে সি.এন.জি তে কোম্পানীগঞ্জ দয়ার বাজার। ভাড়া জন প্রতি দুইশ হতে দুইশত পঞ্চাশ টাকা। এছাড়া বর্ষায় সিলেটের বাদা ঘাট হতে নৌ পথে দয়ার বাজার। ভাড়া জন প্রতি দুইশ বিশ টাকা। সেখান থেকে আবারো সি এন জি’তে চড়ে জন প্রতি চললিশ টাকার বিনিময়ে, মাত্র বারো কিলোমিটার দূরবর্তী চড়ার বাজার যেতে হবে। বাজার হতে দশ মিনিট হাঁটলেই মিলে যাবে উৎমা ছড়ার সৌন্দর্য। আর তুরং ছড়া যাবার জন্য কোন বাহন নেই, দু-পা হবেই তখন সম্বল তবে দূরত্ব উৎমা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার। যারা ঢাকা বা অন্য কোন জেলা হতে মাইক্রো বা নিজস্ব বাহন নিয়ে যাবেন তাঁরা অবশ্যই গাড়ী সিলেট শহরে রেখে সি এন জি / ট্রলারে কোম্পানী গঞ্জ যাবেন কারণ রাস্তার অবস্থা খুবই শোচনীয়।

থাকা-খাওয়া:-ঢাকা থেকে আগের দিন রাতে রওনা দিয়ে পরের দিন সারা দিন ঘুরে আবারো ফিরে আসতে হবে সিলেট শহরে। দয়ার বাজারে খাবারের হোটেল পাবেন আর চড়ার বাজার থেকে খেয়ে নিবেন পোলাও’র সাথে ছোলা বুট। এখানকার জন্য বলা যায় এটা স্পেশাল খাবার। রাতে থাকার জন্য সিলেট শহরে মিলবে নি¤œ হতে একেবারে উচ্চমানের বিভিন্ন আবাসিক হোটেল।
(জাভেদ/এসএএম/ ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭)



