সৌদি আরবে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত আমির হোসেনের বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম

মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী: সৌদি আরবে সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত আমির হোসেনের গ্রামের বাড়ীতে চলছে শোকের মাতম। সপ্তাহখানেক আগে বাবা কাছে মোবাইল ফোনে গলার চেইন ও কানের দুল আনার বায়না করেছিল চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী সাবিনা। বুক চাপড়াতে চাপড়াতে কান্না জড়িত কণ্ঠে আর্তনাৎ করে মেয়ের এই বায়নার কথা বার বার বলে যাচ্ছে আমির হোসেনের সদ্য বিধাব স্ত্রী ও ৩ সন্তানের জননী শাহেদা বেগম।

গত শনিবার সৌদি আরবের জিজান প্রদেশে এক সড়ক দূর্ঘটনায় ১০ জন বাংলাদেশী। তারা সকলে সৌদি আরবের আল ফাহাদ নামে একটি কোম্পানীতে কর্মরত ছিল। নিহতদের মধ্যে দু’জনের বাড়ী নরসিংদী জেলায় জানা গেলেও  শুধু মাত্র আমির হোসেনের নাম পরিচয় জানা গেছে। অপর জনের এখনও কোন পরিচয় মেলেনি।

আমির হোসেন (৪৫) নরসিংদী সদর উপজেলার প্রত্যন্ত চরাঞ্চল করিমপুর ইউনিয়নের বাউশিয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছোট ছেলে। জীবিকার তাগিদে এবং সংসারের সুখের জন্য পাড়ি জমায় মধ্য প্রাচ্যের সৌদি আরবে। সেই সুখই তার পরিবারে শোকে পরিণত হয়েছে।

রবিবার বিকেলে সরেজমিনে নরসিংদী সদর উপজেলার বাউশিয়া গ্রামে নিহত আমির হোসেনের বাড়ীতে গেলে

দেখা যায়, পরিবারের সদস্যদের কান্নায় আকাশ-বাতাশ ভারি হয়ে উঠেছে। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরা তাদেরকে শান্তনা দিয়েও শান্ত করতে পারছেনা। আমির হোসেনের স্ত্রী শাহেদা বেগম এই প্রতিবেদককে কাছে আর্তনাৎ ও ফরিয়াদ করে বলেন, ‘ আমার অহন কি অইব। আমি অহন তিন তিনড্ডা পোলা-মাইয়্যারে লইয়ার কি খামু? কি পড়ামু? আমার সাবিনার গলার চেইন ও কানের দুল কে আইন্যা দিবরে? আমির আমার স্বামীরে শেষবারের মতন একবার দেখতাম চাই। আপনারা আমার উনারে দেশে আনার ব্যবস্থা কইরা দেন।

আমির হোসেনের ছেলে স্থানীয় রসূলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র রবিউল্লাহ জানান, গত ২ বছর পূর্বে তার বাবা ছুটিতে বাড়ী আসে এবং ৩ মাস ছুটি কাটিয়ে আবার কর্মস্থল সৌদিতে ফিরে যান। যাবার সময় তার বাবা ঠিকঠাক মত পড়ালেখা করার কথা বলে গিয়েছিল। আগামী রমজানে ছুটিতে দেশে আাসার সময় তার জন্য একটি মোবাইল ফোন নিয়ে আসবে। সে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এখন আমার পড়ালেখার খবর কে লইব? কে আমারে মোবাইল ফোন আইন্যা দিব।

আমির হোসেনের বড় মেয়ে একই উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী সামসুনাহার বিলাপের সুরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা শুধু ফোন কইরা পড়ালেখার কথা জিজ্ঞাস করতো এবং মনোযোগ দিয়া পড়ালেখা করার কথা বলতো। তিনি বলেছেন, এইবার বাড়ীতে আসার সময় আমার জন্য একটি স্বর্ণের চেইন নিয়া আসব।’

আমির হোসেনের বৃদ্ধা মা সোনাবান বেগম ছোট ছেলে আমিরের মৃত খবর শুনে বিষ্মিত হয়ে ঘরের মধ্যে একটি চকিতে শুয়ে ফেল ফেল নয়নে চেয়ে থাকে এবং আহাজারি করে উঠেন।

আমির হোসেনের বড় ভাই দিনমজুর মনির হোসেন জানান , ‘সংসারের অভাব দূর করে সুখের মুখ দেখার জন্য অনেক কষ্টে ধার-দেনা করে ৮ বছর পূর্বে আমিরকে সৌদিতে পাঠাই। এতোদিনে ধার-দেনা শোধ করতে পারলেও সুখের মুখ দেখা আর হইলনা আমগো। একসিডেন্টে সব কিছু লন্ড-বন্ড কইয়া দিয়া গেল। আপনাগো মাধ্যমে সরকারের কাছে আবেদন জানাই সরকার যেন অতি দ্রুত আমার ভাইয়ের লাশ দেশে ফিরাইয়্যা আনার ব্যবস্থা করে।’

(এসএইচআর/এসএএম/ ০৮ জানুয়ারি ২০১৮)


Comment As:

Comment (0)