নাসিরনগরে ঝটিকা ভ্রমণ

মো. জাভেদ হাকিম: হুট হাট দে-ছুট ! যখন যেমন তখন তেমন ? আশ্চর্য কিংবা প্রশ্নের উদ্রেগ হবার কোন কারন নাই।

গত ২৮,২৯,৩০ শে এপ্রিল-এই তিন দিন ছিল সরকারী ছুটি। ভ্রমনের নেশায় আসক্ত মানুষ গুলা দলবেঁধে কেউবা নিজের মত করে ছুটছিল প্রকৃতির সান্নিধ্যে। আমরা যারা নিজ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত তাদের জন্য শুক্র – রবিবারের মাঝে শনিবার ছিল বিষঁ ফোড়ার মত। তাই দূরে যাবার কোন পরিকল্পনাপা নেই আর থাকবেই বা কেমনে আমার / আমাদের পছন্দের প্রথম তালিকায় যে, বান্দরবানের গহিনের সৌন্দর্য। সেখানেও আবার নানান কারণে প্রশাসনের সিদ্ধান্তে অনেকটাই বন্ধ, সব মিলিয়ে মাথা পুরাই নষ্ট। এদিকে ঘুরবাজ বন্ধুরাও দিচ্ছে প্যারা – কি যে করি। অবশেষে রনি মৃধার প্রবল চাপ সয্য করতে না পেরে সিন্ধান্ত নেই, যে দিকের টিকেট পাব ওই দিকেই ছুটব।

বৃহস্পতিবার রাতের এক বিয়ের পোগ্রামে এটেন্ডের পাশা পাশি খোঁজ লাগাই বাস কাউন্টারে। জয়পুর হাট, সিলেট, বড়লেখা, বান্দরবান যেকোন এক জায়গার হলেই হয়। নাহ্ কোন জায়গার টিকেটই কপালে জুটল না। অবশেষে রাত এগারটায় তানভিরকে রেখেই মোস্তাকের মটর সাইকেলে ছুটি মৌলভীবাজার জেলার দক্ষিন সমনভাগ এলাকার পুছুম ঝর্ণার পথে, ইতি মধ্যে সিলেট নিবাসি প্রকৃতির রং অনুসন্ধানি অরণ্যকে আসার খবর জানিয়ে দেই, সেও প্রস্তুত। সকালেই মিট করবে। আহারে আমাদের আর পায় কে ? কাচঁপুর ব্রীজে কিছুটা মন্থরগতি এর পরের ইতিহাস অন্যরকম। ব্রীজ থেকে নেমেই দেখি সিলেটের মহাসড়ক পুরাই ফাঁকা। হেসে খেলে গান গেয়ে একটানে নরসিংদীর ইটাখোলা।

চায়ের তৃষ্ণা – পথের পাশে চায়ের স্টলে ব্রেক। তখনও বুঝে উঠতে পারি নাই কি করছি আমরা- কারন বাইক নিয়ে লং ড্রাইভে আমি নিজেই অন্যদের বারণ করি আর সেই আমিই কি না যাচ্ছি ! কথা ছিল পলাক্রমে তিন জনই ড্রাইভ করব কিন্তু এখন উল্টো। চা পানে দেহ চাঙ্গা, ভট ভটি স্টার্ট। বকরি মটর সাইকেল হওয়ায় (সাধারন মানের) রনিকে প্রায় টাংকির উপরে বসেই চালাতে হচ্ছে। গভীর রাতে সুন সান নিরিবিলী পথে হঠাৎ হঠাৎ বহু চাকার লড়ি গুলো যেন, সাক্ষাৎ জমদূতের মত ভোঁ করে এসে শাঁ করে পাশ দিয়ে চলে যায়। ব্যপারটা পুরাই ভিন্ন আঙ্গিকের- লাইভ ফ্লীংসে ভরপুর। ভৈরব পৌছার ঠিক ১০/১২ মিনিট আগে ঘুট ঘুটে অন্ধকার – আশে পাশে জন মানবের বসতি নেই,এমন ভূতুড়ে পরিবেশে  পিছনের চাকা পাংচার,আহ্ কি মজা। টর্চের আলোতে চাকা নিয়ে গবেষনার নিষ্ফল চেষ্টা অতঃপর বাইক চড়ল পিকআপের উপর – ওয়াও ! ভৈরব গিয়ে দেখি ভলকানাইজিংয়ের দোকান সব বন্ধ। দূর্যয়ের মোড়ে এক চা দোকানির কাছে বাইক বুঝিয়ে দিয়ে, পাশেই আবাসিক হোটেলের কেয়ার টেকারকে কেচি গেটে প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে জাগিয়ে তুলি, ম্যানেজার বিরক্ত হওয়ার আগেই ফাপর দেই। ব্যাস এবার মুচকি হেসে বয়কে রুম বুঝিয়ে দিতে বলেন। ভোর হতে মাত্র তিন ঘন্টা বাকি। ঘুমের বদলে চুল চেরা বিশ্লেষণ। বাইকের যে হাল, পুছুম পর্যন্ত কি যাওয়া যাবে / যাওয়া ঠিক হবে কি? অবশেষে পাগলামির পারত কমিয়ে বি-বাড়ীয়া পর্যন্ত যাওয়ার সিন্ধান্ত নেই।

সকাল সকাল চাকা মেরামত, ডিম পরোটা দিয়ে ভরপুর নাশতা অত:পর ডাবের পানি পানে দেহে ফুয়েল নিয়ে ছুটছি বি-বাড়ীয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার চর সোনারামপুর। সৈয়দ নজরুল ইসলাম নামক দৃষ্টি নন্দন সেতুতে কিছুক্ষণ ফটো স্যুট। প্রমত্তা মেঘনা নদীর উপর রেল ও সড়ক সেতু দুটো পাশাপাশি।এরকম চরম ভিউতে কিছু চরম ছবি তুলেই আবার ছুটছি। ব্রীজ থেকে নেমেই বামে মোড় নিয়ে ঢুকে যাই আশুগঞ্জ বাজারের দিকে। সুবিধামত স্থানে বাইক রেখে খেয়ায় নদী পার হয়ে, উঠি চর সোনারামপুর ঘাটে। সামনে ঝুপড়ি ঘরের ঘিঞ্জী বসতি -পেছনে বিশাল বিশাল অট্টালিকা। প্রথম দেখায় ভাল লাগেনি, কিছু দূর হেটে চরের মাঝামাঝি গিয়ে আকিষ্কার করি এক ভিন্ন আবেশ, স্থানিয় বাসিন্দা কিশোরী অন্তরার সাথে সখ্য গড়ি। তপ্ত রোদে চিক চিক সাদা বালিতে হেটে বেড়াই। একপাশে সাদাবালি- আরেক পাশে সবুজ ঘাসের গালিচা, উত্তর পূর্ব কোনে রয়েছে বিদ্যুতের বিশাল টাওয়ার আর টাইটানিকের আদলে চরের শেষাংশ সব মিলিয়ে অসাধারন সময় কাটবে শ্রম জিবী ও জেলে পরিবারদের সাথে। যাই এবার গুদারা পার হয়ে নাসির নগর। পথে এক গ্যাস স্টেশনে বাইক রেখে সি. এন. জিতে চেপে বসি।বিস্তৃর্ণ  হাওড়ের মাঝে পিচ ঠালা পথ- ওসম !  কাচা – পাকা ধানের মৌ মৌ ঘ্রান, যত দূর চোখ যায় শুধু ফসলের মাঠ। প্রথমে ঢুঁ মারি গৌকর্ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদার বাড়ী।

অযত্ন-অবহেলায় জীর্ন শির্ন, দায়িত্বশীল কাউকে না পাওয়াতে বাড়ীটি সম্পর্কে বিস্তর ধারনা নেয়া গেল না। ওদিকে জুম্মা নামাজের তাড়া তাই এগিয়ে যাই তিতাস নদীর পারে হরিপুরের দিকে। নামাজ আদায় করে জমিদার কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরীর বাড়ীতে ঠুকি। নয়নাভিরাম তিতাস নদীর তীর ঘেঁষে তৈরী করা হয়েছিল বাড়ীর স্থাপনা। দৃষ্টি নন্দন নির্মান শৈলীই বলে দেয়- জমিদার বাবু খুব সৌখিনদার ছিলেন। ত্রিশ শতকের বিশ একর নিয়ে গড়া দুই তলা বাড়টি মোট ২০০ কক্ষ্য বিশিষ্ট। এখনো বাড়িটি হরিপুর গ্রামে শীর উচুঁ করে দাড়িয়ে জানান দেয় জমিদার কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরীর আভিজাত্য। জমিদারের বংশ- ধরদের কেউ আর এখানে থাকেন না। এখন বেশ কিছু হিন্দু পরিবারের আবাসস্থাল। বাড়িটি সংস্কারের অভাবে দেয়াল থেকে পলেস্তার খসে পড়েছে। প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহম্মেদ স্যারের শেষ ছবি ঘেটু পুত্র কমলা ছায়া ছবির চিত্রায়ন হয়েছিল। সেবারই স্যুটের প্রয়োজনে কিছুটা চুনকাম করানো হয়েছিল। দৈনন্দীন জীবনে শেখার অন্যতম মাধ্যম হল ভ্রমণ, বিশেষ করে রাজা, নবাব, জমিদারদের মহলে গিয়ে একটু চোখ বন্ধ করে চিন্তা করলেই নিজের ভিতরের পশুত্বকে নির্মুল করা যাবে। কিসের এত বাহাদুরি, হিংসা, বিদ্ধেষ,প্রতিপত্তি কিছুইত রবে না, যা থাকে তা শুধু যুগ-যুগান্তর সৎ ও অপকর্মের আলোচনা-সমালোচনা। ইতিহাস হতে মানুষ শিক্ষা নিলে সমাজ হবে আরো সুন্দর আরো বেশি গতিময়। বেশ কিছুটা সময় বাড়িটির ভিতরে বাহিরে ঘুরে ঘাটলা বাঁধা তিতাসের পানিতে ঝাঁপা ঝাঁপি করে শরীরের দাবদাহ কমিয়ে নেই।

বেলা প্রায় তিনটা, পেটে এবার টান পড়েছে, যাই হরিপুর বাজারে। খাই এমন এক হোটেলে, সেখানে কুলি মজুররাই খেয়ে থাকে অথচ খাবারের স্বাদ এখনো লেগে আছে জিবে। খাবার শেষে খাটি দুধের দই চেখে যাই এবার সরাইলের দক্ষিণ আরিফাইল গ্রামে। এইখানে মোঘল আমলে নির্মীত একটি দর্শনীয় মসজিদ রয়েছে। যার স্থাপত্যকাল ১৬৬২ খিঃ ।মসজিদটির আয়তন ৭র্০-২র্০র্  দেয়ালের পুরুত্ব র্৫ – র্৬র্ । ৩৫০ বছর পূর্বে নির্মিত মসজিদটি দেখতে অনেকটাই তাজমহলের মত। স্থানীয়রা আঞ্চলিক ভাষায় আইড়ল মসজিদ নামে ডেকে থাকে। আসরের কসর নামাজ আদায় করে কিছুক্ষনের জন্য দাড়াই মসজিদ লাগোয়া দীঘির সামনে। বিশাল আয়তনের দীঘি। সব মিলিয়ে মনে রাখার মত ভ্রমণের বেশ কিছু অসাধারণ সুখ স্মৃতি নিয়ে আপন নীড়ে ফেরার পথ ধরি।

যোগাযোগঃ- বিভিন্ন কোম্পানির বাস ও ট্রেন দুই ভাবেই যাওয়া যাবে, কমলাপুর হতে ট্রেনে / বাসে এছাড়া মহাখালি ও সায়েদাবাদ হতেও বাসে যাওয়া যাবে, ভাড়া সরাইলের বিশ্ব রোড  চত্বর পর্যন্ত বাসে ২০০ – ৩০০টাকা পর্যন্ত। নাসিরনগর ও সরাইল ভ্রমণে চত্বরে নেমে সি.এন.জি’তে যেতে হবে,ভাড়া নিবে ৫-৬ ঘন্টার জন্য ৬০০ টাকা হতে ৯০০ টাকা। সবচাইতে সুবিধা হবে নিজস্ব গাড়ী / রিজার্ভ মাইক্রো নিয়ে গেলে। আর গণপরিবহনে গেলে নামতে হবে বিশ্ব রোড  [ মাখন ] চত্বরে।

থাকা-খাওয়াঃ- দিনে দিনেই ঘুরে আসা সম্ভব তবে রাতে থাকতে চাইলে শহরের কুমারশীল মোড়,সড়কবাজার ও নিউ সিনেমা রোডে বেশ কিছু মানসম্পন্ন সহ কিছু সাধারন মানের আবাসিক হোটেলও রয়েছে এবং  খাবারের জন্য ভাল মানের রেষ্টুরেন্টও পাবেন। তবে আর যাই খান না কেন – ব্রাম্মণবাড়ীয়ার বিখ্যাত স্বাদে ভরা ছানা মুখী খেতে কিন্তু ভুল যেন না হয়।

পুরানো জেলা ব্রাম্মণবাড়ীয়া সম্পর্কে আরো বেশি তথ্য জানতে ক্লীক করুন বিশ্বসেরা গুগল ইঞ্জিন সার্চে।

(জাভেদ/শামীম/ ২৪ জানুয়ারি ২০১৮)


Comment As:

Comment (0)