পুঁজিবাজারে ক্যারিয়ার গঠনে আত্নপ্রত্যয় ও ধৈর্য্য থাকা জরুরী: রাজেশ সাহা

 যেকোনো প্রতিষ্ঠানেরই সফলতা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা টিমের উপর।  কর্মচঞ্চল ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্বল্প সময়েই একটি প্রতিষ্ঠান কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারে। আর এই সফলতার কৃতিত্ব পান সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরা। এমনি একজন কর্মঠ ও তরুন নির্বাহীর নাম ‘রাজেশ সাহা’।  কাজ করছেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সহযোগি প্রতিষ্ঠান ইউসিবি ক্যাপিটাল মেনেজমেন্ট লিমিটেডে’।  প্রতিষ্ঠানটির ফার্স্ট এ্যাসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ও  হেড অব কর্পোরেট সেলস এন্ড এইচএনআই হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।  সম্প্রতি বিনিয়োগবার্তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজ পেশা ও আনুসঙ্গিক নানা বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেন তিনি।   ‘কর্পোরেট ক্যারিয়ার’ নিয়ে তার বক্তব্যেও চুম্বক অংশ পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।

বিনিয়োগবার্তা: আপনার জন্ম, শৈশব-কৈশোর ও শিক্ষাজীবন সম্পর্কে বলুন।

ওাজেশ সাহা: আমার দাদার বাড়ি কুমিল্লায়। কিন্তু কুমিল্লা থেকে প্রায় তিন যুগ আগে স্বপরিবারে তিনি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে স্থানান্তরিত হন।  তবে আমার জন্ম ঢাকায়। আমার বাবা ঢাকায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিতে জব করতেন। সেই সুবাদে তখন আমার বাবা-মা ঢাকায় থাকতেন। আমার প্রাথিমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল ধানমন্ডির সানফ্লাওয়ার স্কুল থেকে। পরবর্তীতে বাবা  ইস্পাহানি কোম্পানিতে চাকুরি নিয়ে খুলনা চলে যান।  বাবার চাকরির সুবাদে আমরা খুলনা চলে যাই।  খুলনা জেলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হই। সেখান থেকে এসএসসি  ও এইচএসসি সম্পূর্ণ করি। তারপর রাজধানীর নর্দার্ন বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিবিএ এবং এমবিএ সম্পূর্ন করি। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে  স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পূর্ণ করি।

বিনিয়োগবার্তা: আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে বলুন।

রাজেশ সাহা: আমার কর্মজীবন শুরু হয় একটি মজার অভিজ্ঞতা দিয়ে।  এমবিএ কমপ্লিট করার পর ইন্টার্নি করার সুযোগ দেওয়ার জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি পরিচিত একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। পরে তিনি আমাকে ইউনি রয়েল সিকিউরিটিজে পাঠান। ওখন ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন অনির্বান দাস গুপ্ত। আর চেয়ারম্যান ছিলেন অশোক দাসগুপ্তা। তিনি  আমাকে বললেন, আমাদের এখানেও  ইন্টানির সুযোগ নাই; তবে শিক্ষানবিশ হিসাবে চাকুরিতে যোগদানের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। আমি ভাবলাম ইন্টার্নিতে কাজ করার চেয়ে চাকুরির সুযোগ শ্রেয়। তখন আমি রাজি হয়ে যাই। ২০০৭ সালে নভেম্বরে ৮০০০/= (আট হাজার টাকা) বেতনে ইউনি রয়েল সিকিউরিটিজে চাকরি শুরু করি। ইউনি রয়েলের চেয়ারম্যান ও এমডি আমাকে পুঁজিবাজার সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছেন।  তাদের কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।  এক বছর দু’মাস ওখানে কাজ করার পর আমি র্মাকেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজে যোগদান করি। ওই সিকিউরিটিজ হাউজ তখন একেবারেই নতুন। ওখানে আমরা তিনজন ছিলাম। ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসাবে তখন দায়িত্বরত ছিলেন সোহেল রহমান। তিনিও আমাকে ক্যারিয়ার গঠনের অনেক জ্ঞান দিয়েছেন। বলা চলে, র্মাকেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ আমাদের হাত ধরেই চলা শুরু করে।  ২০১০ সালে আমি ওখানে বেস্ট পারর্ফমেন্স করেছিলাম। ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত আমি ওখানেই ছিলাম। তারপর আমি আইডিএলসি সিকিউরিটিজে যাগদান করি।  প্রতিষ্ঠানটির গুলশান ব্র্যাঞ্চে দু’বছর চাকরি করেছি। ওখান থেকে প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজে যোগদান করি। ওই প্রতিষ্ঠানে তখন সিইও হিসাবে ছিলেন আবুল কালাম ইয়াজদানি।  তিনি মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজে কাজ করেছেন। সেখান থেকেই তার সঙ্গে সম্পর্ক। তার কাছ থেকেও ক্যারিয়ার গড়ার অনেক কিছু শিখেছি।  তিনি আমার এই ক্যারিয়ারের গুরু হিসাবে বিবেচিত।  এ সময় আমার দারুন অভিজ্ঞতা হয়েছে। কারণ, মার্কেটের অবস্থা তখন খুবই খারাপ ছিল। মাঝে মাঝে খুবই বিরক্ত লাগতো। তাও হাল ছাড়িনি।  প্রাইম ইসলামি সিকিউরিটিজে প্রায় তিন বছর কাজ করেছি। তারপর ব্র্যাক ব্যাংকের সহযোগি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজে কাজ করার সুযোগ পাই। তখন ওখানকার সিইও ছিলেন রহমত পাশা স্যার। তার কাছে আমি ইন্টারভিউ দেই।  ২০১৫ সালে করর্পোরেট রিলেশনশিপ অফিসার হিসাবে হিসেবে ব্র্যাক ইপিএলে যোগদান করি। কিছুদিন যাবার পর তিনি আমাকে গুলশানের করর্পোরেট অফিসের ব্র্যাঞ্চ ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব দেন। ওখানে এক বছর কাজ করার সুযোগ পাই। এরপর রহমত স্যার ব্র্যাক ইপিএল ছেড়ে ইউসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সিইও হিসাবে যোগদান করেন। যেহেতু স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস ছিল, তাই স্যার যখন এখানে জয়েন করলেন, তখন আমরাও সুযোগের অপেক্ষায় থাকি। একসময় এ সুযোগ তৈরী হয় এবং  তিনি আমাদেরকে ইউসিবিতে চাকরির জন্য প্রস্তাব করেন। তখন আমরা একটা টিম ব্র্যাক ইপিএল থেকে চলে আসি। সেই থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই আছি। শুরুতে এ্যাসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে ছিলাম। এখন ফার্স্ট এ্যাসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং হেড অব কর্পোরেট এ্যাফেয়ার্স পদে কাজ করছি। কর্মজীবনের শুরু থেকেই পুঁজিবাজার নিয়েই আছি।

বিনিয়োগবার্তা: ক্যারিয়ার গড়ার জন্য ক্যাপিটাল মার্কেটকে বেছে নিলেন কেন?

রাজেশ সাহা:  ক্যাপিটাল মার্কেট একটি বড় জায়গা। ছাত্র থাকাকালীনই আমার কাছে মনে হয়েছে এই বাজারে কাজের অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। এখানে প্রতিদিনই একটি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন হয়। প্রতিদিন একটা বৈচিত্রতা থাকে। প্রতিমূহুর্তে শেয়ারদর বাড়ে আবার কমে। এটি একটি মজার অভিজ্ঞতা। এছাড়া এখান থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এই বাজার একটি বৈশ্বিক বাজার। পুঁজিবাজার নিয়ে দেশের বাইরেও কাজের অনেক সুযোগ রয়েছে। এসব বিবেচনায়ই আমি ক্যারিয়ার গড়ার জন্য পুঁজিবাজারকে বেছে নিয়েছি।

বিনিয়োগবার্তা: আপনার দৃষ্টিতে পুঁজিবাজারে ক্যারিয়ার গড়ার চ্যালেঞ্জগুলো কি কি ?

রাজেশ সাহা:  মূলত এখানে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য র্ধৈয্যশীল হওয়া দরকার। ক্যারিয়ার গড়ার জন্য তাকে স্থির হতে হবে। এখানে কাজের ক্ষেত্রগুলো ভালভাবে বুঝতে এবং জানতে হবে। আমার ক্ষেত্রে বলতে পারি যে, আমি একদিনেই হুট করে অভিজ্ঞ হতে পারিনি।  কাজ করতে করতেই আমার অভিজ্ঞতা বেড়েছে। এই কয়েক বছরে র্মাকেটের অনেক উত্থান-পতন দেখেছি। ২০০৯ এর উত্থান দেখেছি। ২০১০ এর পতন থেকে শিক্ষা নিয়েছি।  পুঁজিবাজারের ভালো সময় এবং খারাপ সময়গুলো দেখেছি।  বাজারের মন্দাবস্থায় এই ট্র্যাকের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার অনেক অফার এসেছে।  একবার যেতে চেয়েও যাওয়া হয়নি। মনে হচ্ছিল এখান থেকে চলে গেলে অতীতের সব অভিজ্ঞতা বিফলে যাবে। শেষ পর্যন্ত এই বাজারের সঙ্গেই থাকলাম। খারাপ সময়গুলোতে টিকে থাকার এবং র্ধৈয্যধারণ করার যে মানষিকতা এটাই আমার কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে হয়।

বিনিয়োগবার্তা: শিক্ষাজীবন শেষে একজন তরুণ কি কি আকর্ষণের কারনে ক্যাপিটাল মার্কেট কেন্দ্রিক ক্যারিয়ার গড়বে?

রাজেশ সাহা: অর্থনীতির একটা বড় কেন্দ্র হচ্ছে ক্যাপিটাল র্মাকেট।  গতানুগতিক কাজের চেয়ে এখানে কাজের ভিন্নতা রয়েছে। এছাড়া এই বাজারে চাকুরিতে অনান্য খাতের তুলনায় সুযোগ সুবিধাও অনেক।  এখান থেকে বড় মাপের মানুষ হিসাবে গড়ে উঠার সুযোগ রয়েছে। তাই তরুণদের এই র্মাকেটে আসা প্রয়োজন। আগ্রহী-কর্মঠ ও আত্নপ্রত্যয়ী তরুনদের জন্য ক্যাপিটাল র্মাকেট একটা ‘বেস্ট প্লেজ’ বলে আমি মনে করি।

বিনিয়োগবার্তা: শিক্ষিত তরুণদের প্রতি আহ্বান কি?

রাজেশ সাহা: এদেশের শিক্ষিত তরুনদের প্রতি আমার একটাই আহবান আপনারা পুঁজিবাজার কেন্দ্রিক ক্যারিয়ার গড়ে তুলুন।  এখানে দুইভাবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন। একটি হচ্ছে- এই বাজারের বিনিয়োগকারী হিসাবে। আরেকটি হচ্ছে- এখানকার সার্ভিসহোল্ডার হিসাবে।  তবে যেভাবেই এখানে আসেন না কেনো- এই র্মাকেট সর্ম্পকে কিছু না কিছু নলেজ নিয়ে আসবেন।  সততা, জ্ঞান, আত্নবিশ্বাস, ক্যারিয়ার গঠনের মানষিকতা প্রভৃতি বিষয়ে সচেতনতা জরুরী। এসব গুনাগুনই আপনাকে এই বাজারে প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়তা করবে।

(জেভি/এসএম/এসএএম/ ১৫ এপ্রিল ২০১৮)


Comment As:

Comment (0)