রমজানের শুরুতেই নরসিংদীর সবজির বাজার চড়া; ক্রেতাদের নাভিশ্বাস
মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, নরসিংদী: সবজি চাষে সারাদেশে নরসিংদী জেলার ব্যাপক সুখ্যাতি রয়েছে। কিন্তু রমজানের শুরুতেই নরসিংদীর সবজির বাজার গুলোতে যেন আগুন। মাত্র ৩/৪ দিনের ব্যবধানে প্রায় সকল সবজির বেড়ে দাড়িয়েছে দ্বিগুনে। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে সাধারণ ক্রেতাদের। প্রতি বছরই রমজানের আগেই বেড়ে যায় প্রতিটি পণ্যের দাম। এবছর রমজানের আগে প্রায় সকল পণ্যে দাম নিয়ন্ত্রনে থাকলেও রমজান শুরুর সাথে সাথে সবজির বাজার উত্তাপ ছড়াছে। দু’একটি ছাড়া অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে বাজার স্থিতি থাকলেও সবজির বাজার বেশ চড়া। ফলে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সবজি কিনে খাওয়াও যেন সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অথচ রমজান শুরুর আগে সবজি বাজার সাধারণের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল। হঠাৎ করে দাম বৃদ্ধি পাওয়াকে কৃত্রিম সংকট আবার অনেকে টানা বৃষ্টি পাতের ফলে সবজি ক্ষেত তলিয়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন।
জেলার বিভিন্ন বাজার গুলোতে ভোজ্য তেল ছাড়া প্রায় সকল নিত্য পণ্যের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য ঢাকা- চট্টগ্রাম মহাসড়কের তীব্র যানজটকেই দায়ী করছে জেলার মজুদদারগণ।
নরসিংদীর বিভিন্ন কাঁচাবাজারে বেশিরভাগ সবজির দাম বেড়েই চলেছে। শসা, গাজরের পাশাপাশি সেঞ্চুরি করেছে বেগুন। রোজা শুরুর আগে থেকেই ধাপে ধাপে বাড়ছে বেগুনের দাম। বৃহস্পতিবার বেগুনের দাম ছিল ৬০-৮০ টাকা। আরও বেশ কিছু সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। অন্যদিকে ৭০-৮০ টাকায় দওে বিক্রি হচ্ছে শসা ও গাজর। পাশাপাশি কিছুটা বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। সেই সঙ্গে সব সবজিই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। ৫০ টাকার নিচে মিলছে না কোনো সবজি ।
শুক্রবার প্রথম রমজানের দিন জেলার নরসিংদী বড় বাজার, নতুন বাজার (বাঁশবাজার) , হোসেন বাজার, ইউএমসি মিল গেইট বাজার, ভেলানগর, বটতলা এবং শাপলা চত্বর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
শসা ও গাজরের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সবজি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ইফতারিতে শসা ও গাজরের চাহিদা থাকে অনেক বেশি। বিশেষ করে মুড়ি মাখাতে শসার বিকল্প নেই। চাহিদার কথা চিন্তা করে চিকন অর্থাৎ হাই ব্রিট জাতের শশা ( সালাদের শশা) মজুদ থাকা সত্যেও আড়দাররা বাড়িয়ে দিয়েছেন আর আর মোটা অর্থাৎ দেশীয় জাতের শশা টানা বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজি ক্ষেতগুলোতে তলিয়ে গেছে এতে শশাসহ অন্যান্য সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
নরসিংদীর খুচরা বাজার গুলোতে প্রতি কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে কাঁচামরিচ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। টমেটোর দামও একই হারে বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি। তা ছাড়া পোটল, কচুর লতি, চিচিঙ্গা, ঝিঙা, কাঁকরোল, করলাসহ অন্যান্য সবজি ৫০ থেকে ৭০ টাকা গুনতে হচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত সপ্তাহে ৪০-৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হওয়া চিচিঙ্গার দাম একই রয়েছে। ঢেরশের দাম গত সপ্তাহের মত অপরিবর্তিত রয়েছে। গত সপ্তাহে ৩০-৪০ টাকা কেজি বিক্রি হওয়া পটলের দাম কিছুটা বেড়ে ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪০ টাকা দরে বিক্রি হওয়া বরবটি এখন বিক্রি ৬০ টাকা দরে। ১৮-২০ কেজি দওে বিক্রি হওয়া গোল আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকা দরে।
জালি (নরসিংদীর ভাষায় চাল কুমড়োকে জালি বলায়) এর উত্তাপটা যেন একটু বেশী। যে জালি ( মাঝারি সাইজ) গত সপ্তাহে ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে তার ৬০-৭০ টাকা।
দামের এ উত্তাপ শাকেও লেগেছে। লাল শাক গত সপ্তাহে ৪০ টাকা কেজি দওে বিক্রি হয়েছিল এখন তা ৬০-৭০ টাকা, ১০-১৫ কেজি দওে বিক্রি হওয়া পুঁই শাক এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা ধরে, সবুজ ডাটা শাক, পাট শাক, মুলা শাক বিক্রি হচ্ছে ১০-১৫ টাকা আটি, যা গেল সপ্তাহে ছিল ৫-১০ টাকা আটি। আর ১০-২৫ টাকা আটি বিক্রি হওয়া লাউ শাক বেড়ে হয়েছে ৩০-৩৫ টাকা।
নরসিংদীর বটতলা বাজারে বাজার করতে আসা ইসমাইল হোসেন নামে এক সরকারী কর্মকর্তা, ‘ দাম বাড়বে ভেবে রোজার আগের শুধু তরি-তরকারি সব কিছু কিনে রেখে ছিলাম। আজ তরকারি কিনতে এসে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রায় তরকারির দামই দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
এসময় কথা হয় খাঁচার করে দেশিয় শশা বিক্রি করা হাসান আলী নামে এক সবজি বিক্রেতা সাথে, তিনি জানা বিক্রি করতে আনা শশা তার নিজের ক্ষেতের। কত টাকা করে বিক্রি করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘ সোজা গুলা ৬০ টাকা আর বেয়াকোয়া গুলান ৫০ টাকা কেজি।’ হঠাৎ শশার দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কতদিন ধইর্যা একটানা বৃষ্টি অইতাছে দেহেনন্যা। বৃষ্টিতে সব ক্ষেত ডুইব্বা গেছে, হিয়ার লাইগ্যাইতো সব কিছুর দাম বাড়ছে। কিছু বলতে কি বুঝাচ্ছে জানতে চাইলে, তিনি বলেন‘ আইজক্যা আমি খালি শশা আনি নাই লগে পুই শাকও আনছিলাম শেষ অইয়া গেছে। গেল শুক্কুরবার পুই শাকের মুডা বেইচ্ছ্যা গেছি ১০ টাকা কইর্যা আর আইজকা বেচলাম ৩০ টাকা কইরা।’
ভেলানগর সবজির বাজারের সবজি বিক্রেতা কামাল মিয়া জানান, শ্যামপুর ও কাওরান বাজার সবজির এই পাইকারি বাজারগুরোতে প্রচুর পরিমান সবজির আমদানি থাকলেও দাম বেশী বলে আড়ৎদাররা আমাদের কে বলছেন আমরা বেশী দামে কিনে আনতে হচ্ছে। আর যেসব সবজি আমাদের এইদিকে হয়, সেই সবজির অধিকাংশ ক্ষেত এখন পানির নিচে।
কথা হয় মরজাল পাইকারি সবজি বাজারে বেগুন বরবটি, শশা ও কাকরোল বিক্রি করতে আসা এক সবজি চাষির সাথে। হাতেম আলী নামে এই সবজি চাষি জানান তার বাড়ী রায়পুরা উপজেলার লোচনপুরা গ্রামে। এবছর তিনি তিন বিঘা জমিতে বেগুন, চার বিঘায় কাকরোল, শশা ও বরবটি চাষ করেন। গত ২০-২৫ দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে তার সব ক্ষেত তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় সব সবজি গাছ পানিতে মরে যায়। এবছর বেগুন চাষ করে বেশ লোকসান দিতে হয়েছে। ভেবেছি রমজান মাসে বেগুনের চাহিদা ভাল থাকে। তাই এই সময় সেই লোকসান পুসিয়ে নেবেন কিন্তু তার সেই আশা গুড়ে বালি। বৃষ্টি পানিতে পুরো বেগুন ক্ষেত তলিয়ে গিয়ে সব গাছ মরে যায়।
অনেক মনে করছেন, আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত না হয়ে টানা রোদ উঠলে সবজির ক্ষেত গুলো থেকে পানি সরে যাবে সেই সাথে সবজির ফলন বাড়তে থাকবে। এতে সবজির বাজার নিয়ন্ত্রনের চলে আসবে। নচেৎ কোন অবস্থায় এর হাল ধরে রাখা সম্ভব নয়।
(এসএইচআর/এসএএম/ ২০ মে ২০১৮)



