দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে নরসিংদীর লটকন

মো: শাহাদৎ হোসেন রাজু, বিনিয়োগবার্তা, নরসিংদী:  টক আর মিষ্টিতে ভরপুর নরসিংদীতে উৎপাদিত  লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।  এতে চাষিদের ভাগ্য বদলে দিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে এই ফল।  অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ লটকন বাগানের আবাদ।   এমন এক সময় ছিল জেলার বাহিরে কোথাও তেমন একটা পরিচিত ছিলনা ফলটি। বিগত কয়েক বছরে তা দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশেও সুস্বাদু ফল হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। বর্তমানে চাষিদের মধ্যে লটকন চাষে উৎসাহের পাশাপাশি প্রতি বছরই বাড়ছে বাগানের সংখ্যা। বর্তমানে নরসিংদীর পাহাড়ি লালমাটি এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত মণ লটকন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে।

নরসিংদী জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নরসিংদীর শিবপুর, বেলাব, পলাশ ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটির পাহাড়ি টিলা উচু মাটিতে খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকায় এই এলাকার মাটি লটকন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। ফুল হয়না পাপড়িও ঝরে না। সরাসরি গাছের কা- থেকে বের হয় লটকল, যার স্থানীয় নাম বুগি। বিগত বছরে জেলার ১ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছিল। চলতি বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭৮ হেক্টরে। বাণিজ্যিক চাষাবাদের আওতার বাইরেও বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন বাড়ির আঙ্গিনা ও পতিত জমিতে লটকন গাছ রয়েছে যা কৃষি বিভাগের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করা নেই।

নরসিংদীর বিভিন্ন অঞ্চলের উচ্চু লাল রঙের মাটিতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকায় এ মাটিতে লটকনের উৎপাদন ভালো হওয়ায় রায়পুরা, শিবপুর, বেলাব, পলাশ ও মনোহরদী উপজেলার শত শত চাষি বর্তমানে লটকন বিক্রি করে অর্থনৈতিক ভাগে সাফল্য পেয়েছে।

এখানকার লটকন চাষিরা জানায়, লটকন উচ্চু সমতল সব ধরনের জমিতেই জন্মে। আগে গ্রামের কোনো কোনো বাড়িতে কদাচিৎ লটকন গাছ দেখা যেত। তেমন কোনো চাহিদা ছিল না বলে কেউ এটিকে বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদনের কথা চিন্তা করত না। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে প্রচুর ক্যালোরি, খাদ্য ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এ ফলের চাহিদা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে লটকন চাষেরও আগ্রহ বাড়ছে একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়েছে এফলের মূল্য। মাটি ও জাতগুণে ফলে লটকনের টক ও মিষ্টি ভেদাভেদ ঘটে। তবে অধিক মিষ্টি ও সামান্য টক স্বাদের লটকনের চাহিদা বেশি।

 

সরেজমিনে দেখা গেছে, শিবপুর উপজেলায় সবচে বেশি লটকনের বাগান রয়েছে। ১৫/২০ বছর আগেও লটকনের বাগান করা ছিল না, তখন অন্যান্য ফলগাছের সঙ্গে দু’একটি গাছ লাগানো হতো। বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে লটকন বাগানের চাষ। শুধু লটকনের বাগান নয় দিন দিন চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় নরসিংদীর শিবপুরে শুধু মাত্র লটকনের চারা উৎপন্ন করে বিক্রি করছে এই নার্সারীর সংখ্যাও কম নয়। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নার্সাসী বানিজ্যিক ভাবে সফলতাও পেয়েছে।

শিবপুর উপজেলার জয়নগর এলাকার শাহীন সরকার নামে একজন লটকন চাষি জানান, লটকন গাছে নারী-পুরুষ রয়েছে। ফল আসার আগ পর্যন্ত নারী-পুরুষ চিহ্নিত করা দুষ্কর। চারা লাগানোর কমপক্ষে ৫/৬ বছর পর ফল আসে। ততদিন চাষীদেরকে অপেক্ষার প্রহর গুণতে হয়। পুরুষ গাছ হলে তা কেটে আবার চারা লাগিয়ে ৫/৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে প্রথমদিকে চাষিরা লটকন চাষে উৎসাহিত হয়নি। প্রথমদিকে চাষিরা চারার জন্য নার্সারিগুলোর উপর নির্ভর করলেও এখন তারা তা করছে না। এখন নিজেরাই চারা তৈরি করছে। বহু অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা গেছে এবং এক বিচি বিশিষ্ট লটকন থেকে অধিক নারী গাছের জন্ম নেয়। তা ছাড়া চারা অবস্থায় গাছের বিভিন্ন লক্ষণ দেখে অভিজ্ঞরা নারী চারা শনাক্ত করতে পারেন। বাছাইয়ের এ পদ্ধতি বিজ্ঞান সম্মত না হলেও চাষিরা বেশ সাফল্য পাচ্ছেন। দেখা গেছে বাগানগুলোতে নির্দিষ্ট দূরত্বে ৩টি করে চারা রোপণ করা হচ্ছে। ৪/৫ বছর পর প্রথম ফল এলে নারী গাছ রেখে বাকীগুলো কেটে ফেলা হচ্ছে। একটি পূর্ণবয়ষ্ক লটকন গাছে ৫ থেকে ১০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।

একই উপজেলার ছোটাবন এলাকার লটকন চাষি দেলোয়ার হোসেন জানান, লটকন ফলের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাছের  ফলে। গাছের পুষ্টির সুষমতা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে গাছের গোড়া থেকে প্রধান কা-  গুলোতে ঝোপায় ঝোপায় এত বেশি ফল আসে যে তখন গাছের ডাল পর্যন্ত দেখা যায় না। আর একটি বিষয় হচ্ছে লটকন পাকার ৫০-৬০ দিন আগে গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সঙ্গে মিশিয়ে গাছের গোড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা বেড়ে যায়।

চাষিরা জানান, প্রকার ভেদে লটকন ৩ হাজার থেকে সাড়ে হাজার টাকা মণ দরে পাইকারি বিক্রি করছেন। খুচরা দাম ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি। ফল বিক্রির ভাবনা তাদেরকে ভাবতে হচ্ছে না। পাইকাররা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তবে কিছু কিছু চাষি অধিক লাভের আশায় ভ্যান গাড়ী বোঝাই করে তা বাজারে নিয়ে আসে। মৌসুমী এ ফলের বেচাকেনাকে ঘিরে জেলার মরজাল ও শিবপুর বাজারে গড়ে উঠেছে লটকনের বৃহৎ বাজার। এছাড়াও জেলায় লটকনের পাইকারী বাজারের মধ্যে কামারটেক, বাড়ৈচা, রাবান ও যোশর বাজার উল্লেখযোগ্য। প্রতিদিন ভোরে দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা এসে এসব বাজার থেকে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন লটকন। পর্যায়ক্রমে হাত বদল হয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে এসব লটকন রপ্তানি হচ্ছে বিদেশের বাজারেও। অনেকে সরাসরি জমি থেকে লটকন কিনে সরবরাহ করছেন দেশ-বিদেশের বাজারে।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক লতাফত হোসেন বলেন, ’নরসিংদীর পাহাড়ি টিলা এলাকার মাটি লটকল চাষে উপযোগি বিদায় এ অঞ্চলে লটকনের বেশ কয়েকটি বড় বড় বাগান গড়ে উঠেছে। তাছাড়াও এ অঞ্চলের মানুষ বাড়ীর আঙ্গিনায়ও গড়ে তুলছে লটকন বাগান। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস থেকে আমরা চাষিদের লটকন চাষে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি।’

(এসএইচআর/এসএএম/ ২৫ জুন ২০১৮)


Comment As:

Comment (0)