পানিতে তলিয়ে হাওরঞ্চলের ৬ হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি
প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা, ঢাকা: গত কয়েক দিনের অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও বিবাড়িয়া জেলায় গড়ে প্রায় ৭৫ ভাগ হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে। এ জেলায় ৯০ ভাগ ফসল পানিতে তলিয়েছে। গত বছরের বন্যায় ৬০ ভাগ ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এবার বেশির ভাগ কৃষক ঋণ করে ফসল ফলিয়েছে।
বুধবার (১২ এপ্রিল) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির গোলটেবিল মিলনায়তনে ‘আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাওরের ফসল ও জনজীবন : সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
এএলআরডি (অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) এ গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে অংশ নিয়ে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) সাবেক মহাপরিচালক প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, প্রকৃতির সঙ্গে জুয়া খেলায় হেরে সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে আহাজারি করছে।
তিনি বলেন, ‘বোরো ধানের মাধ্যমে আউশ ফসলকে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা সারা দেশে বোরো ধানের মৌসুমকে আউশ ধানের মৌসুমে নিয়ে গেছি। এখন শুধু বোরো আর আমন-এর মধ্যেই চাষিরা ঘুরপাক খাচ্ছে। কৃষি বিভাগ বিআর নিয়ে এসে সব শেষ করেছে। এখন বিআর ১৪, ১৫, ১৬, ২৯ ইত্যাদি জাতের ধানের আবাদ হচ্ছে। এই জাতের ধানের আবাদের জন্য ১৫০ দিন থেকে ১৬০ দিন সময় লাগে। এই আবাদ শেষ না হতেই অনেক বছর বন্যা শুরু হয়।’
তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছরের হিসাবে দেখা গেছে হাওরাঞ্চলে এপ্রিল ও মে মাসের আগে বন্যা হয়ে থাকে। এটা জেনে বা না জেনে অতি লোভে অতিরিক্ত ফলনের আশায় এখানকার চাষিরা প্রকৃতির সঙ্গে জুয়া খেলায় পৌষ মাসে বোরো ধান চাষ করে। যে বছর ভাগ্য ভালো হয় সে বছর তারা অতিরিক্ত ধান ঘরে তোলে। আর যদি বন্যা এসে পড়ে তবে তারা জুয়া খেলায় হেরে সর্বস্বান্ত হয়। এর জন্য দায়ী কারা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। সমুদ্র লেবেল থেকে সুনামগঞ্জের গড় উচ্চতা মাত্র ৩ মিটার। উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে সবার আগে বৃষ্টি হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে ঝড়-বৃষ্টি হতে পারে এটাই স্বাভাবিক।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবাই বলছে বন্যা হয়েছে। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেকর্ড অনুযায়ী সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে এখনো বন্যা হয়নি। এপ্রিল বন্যা এসেছে তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডেঞ্জার লেভেল অতিক্রম করেনি।’
গোলটেবিল আলোচনায় অন্যান্য প্যানেল আলোচকদের মধ্যে বক্তব্য দেন-বেলার নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা। স্বাগত বক্তব্য দেন রওশন জাহান মনি। সভাপতিত্ব করেন মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে কাসমির রেজা বলেন, গত কয়েক দিনের অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও বিবাড়িয়া জেলায় গড়ে প্রায় ৭৫ ভাগ হাওরের ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে। এ জেলায় ৯০ ভাগ ফসল পানিতে তলিয়েছে। গত বছরের বন্যায় ৬০ ভাগ ফসল তলিয়ে যাওয়ায় এবার বেশির ভাগ কৃষক ঋণ করে ফসল ফলিয়েছে। অকাল বন্যায় এখানে ইতোমধ্যে গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। বন্যায় হাওরাঞ্চলে চালের দাম বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, সময়মতো বাঁধ নির্মাণ না হওয়া, নদী ভরাট হওয়া, অসময়ে বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসলহানি হয়েছে। প্রশাসন এখানে অসহায়। সীমাহীন দুর্নীতি সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। গত ২৮ মার্চ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অর্ধেকের বেশি বাঁধ নির্মাণকাজ এখনো শুরু হয়নি। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ঠিকাদারি প্রথা বিলুপ্ত করতে হবে।
(এসএএম/ ১২ এপ্রিল ২০১৭)



