মাস্টার্স কোর্স, লাইসেন্সিং ও গবেষণার জন্য প্রস্তুত বিআইসিএম: মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জোয়ার্দ্দার (পর্ব-০১)

‘দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়নে তথা এ বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পেশাদারদের প্রশিক্ষিত ও দক্ষ করে তুলতে বেশ কয়েক বছর ধরেই নিরলসভাবে কাজ করে আসছে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম)। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাচের সমন্বয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ক্যাপিটাল মার্কেট (পিজিডিসিএম) কোর্সসহ বিভিন্ন স্বল্প ও মধ্যমেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক ক্যারিয়ার গঠনে দেশের শিক্ষিত তরুণ-তরুনীদের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এখন পুঁজিবাজার বিষয়ক মাস্টার্স কোর্স চালু, লাইসেন্সিং পরীক্ষা ও গবেষণার জন্য সকল প্রস্ততি সম্পন্ন করেছে বিআইসিএম। এলক্ষ্যে শিক্ষক নিয়োগ, ক্লাস রুম তৈরি, ডিজিটাল লাইব্রেরী স্থাপনসহ আনুসঙ্গিক সকল কাজই শেষ করা হয়েছে। ফলে বিআইসিএমকে এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার অনুমোদন দেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

বিনিয়োগবার্তা’র সঙ্গে একান্ত আলোচনায় এসব কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেটের (বিআইসিএম) সদ্য সাবেক নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জোয়ার্দ্দার। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিনিয়োগবার্তা’র স্টাফ রিপোর্টার মো: কামরুল হুদা কায়েস। ছবি তুলেছেন বিআইসিএমের জনসংযোগ কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল ওয়ারিশ। সংকুলান করেছেন ইসমাইল হোসেন সোহান। আর সহযোগিতা করেছেন শামীম আল মাসুদ

নিম্নে সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব পাঠকদের উদ্দেশে তুলে ধরা হলো।

বিনিয়োগবার্তা: বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) প্রতিষ্ঠার গল্পটি বলুন।

মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জোয়ার্দ্দার:

আমি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) যোগদান করি ১৯৯৮ সালে। তখন পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিয়ম-কানুন অনেকেই মানতে চাইতো না। আমি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে নোট ইনিসিয়েট করেছি- অধিকাংশ প্রোপ্রাইটার বা ডিলারদের নিবন্ধন আমার কাছে। তখন কেউ নিবন্ধন নিতে চাইতো না। এছাড়া অধিকাংশ নিবন্ধন নবায়ণ করতে চাইতো না; এজন্য সময় চেয়ে চিঠি দিতো। আমি যখন কমিশনে যোগদান করি তখন সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন এম এ সাঈদ সাহেব।

প্রথম থেকেই আমি যেটা সঠিক মনে করেছি, সেটাতেই থাকার চেষ্ঠা করেছি। আমি যোগদান করে দেখলাম একদিকে আমার লজিস্টিক সাপোর্ট নাই, অন্যদিকে একচেটিয়া শুধু সময় বাড়ানোর তাগিদ আসছে। তখন কমিশনের সদস্য ছিলেন মনির উদ্দিন নামে একজন। আমি উনাকে বললাম, স্যার এভাবেতো চলতে পারে না। আমাদের বিষয়গুলো রিস্টার্ট করতে হবে। তখন উনি বললেন কোম্পানিগুলো কি মানবে? আমরা এভাবে সময় বাড়িয়ে শেষ করতে পারবো না; তাদের একটি ডেটলাইন দিয়ে দিতে হবে। তখন উনি বললেন এটা কি মানবে তারা? আমি তখন বললাম ডেটলাইন দেই; যাদের রেজিস্ট্রেশন থাকবে না তারা ট্রেড করতে পারবে না। তারপর আমি চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে কথা বললাম। তিনি আমার সাথে একমত হলেন। তারপর আমরা একটি নোটিশ দিলাম- দুই থেকে তিন মাস পর থেকে কেউ রেজিস্ট্রেশন ছাড়া ট্রেড করতে পারবে না। আমি আমার সিদ্ধান্তে অনর ছিলাম এবং সকল ব্রোকার ডিলার রেজিস্টার্ড হয়ে গেল। ঐটাই কমিশনে আমার প্রথম সফলতা ধরতে পারেন।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে- মার্চেন্ট ব্যাংকারদের লাইসেন্স চেক করলাম। তখন  জানতে পারলাম এদের লাইসেন্স দেয়া হয় সরকার থেকে। আমরা তাদের আবেদন পাঠাই সরকারকে। তখন আমি চেয়ারম্যান সাহেবকে বললাম আইনের দশ (১০) ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের; আমরা সরকারের কাছে পাঠাবো কেন ?  এক পর্যায়ে মার্চেন্ট ব্যাংকের রেজিস্ট্রেশনও আমরা দেয়া শুরু করলাম। সরকার তখন আপত্তি করলো। ঐসময় আমাদের মন্ত্রনালয়ের সচিব ছিলেন ড. আকবর আলী খান। সরকারের উধ্বর্তন মহলে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন দেওয়ার ক্ষমতা আমরা পেয়ে গেলাম। এক সময় সরকার আমাদের কথা রাখলেও বলা হলো ইন্ডিভিজ্যুয়াল ১টা ১টা কোম্পানির অনুমোদন দেয়ার চাইতে সর্বোচ্চ ৫০টা কোম্পানির অনুমোদন দিতে পারবে কমিশন। যাইহোক এখনো কমিশন এই কাজটি করছে। এরপরে আমি কমিশনের কর্পোরেট ফাইন্যান্সের দায়িত্ব পেলাম। আমি ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলাম। সে সময় কমিশন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) এর অনুমোদন দিতো না। তখন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি মনে করতেন কোম্পানির সব কাগজপত্র  ঠিক আছে তখন কমিশনার হয়ে চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হতো। আর চেয়ারম্যান আইপিও অনুমোদন দিয়ে দিতো। আমি যখন কর্পোরেট ফাইন্যান্সের দায়িত্ব পালন শুরু করলাম তখন ৩০-৩২ টা কোম্পানি আছে যারা নিয়মিতই সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করে। আমি তখন সবাইকে বললাম ফেরত নিয়ে যাও এগুলো। তোমরা নিয়ম মেনে আবেদন করো নাই; আবার আবেদন করো। আমি আমার দিক থেকে ফেলে রাখবো না; এই বলে ফেরত দিয়ে দিলাম। আগে ব্রোকাররা চলে আসতো নানা বিষয়ে ডিসকাস করার জন্য। তখন আমি তাদের বললাম স্টক এক্সচেঞ্জের লোক ছাড়া আমার টেবিলে কোন লোক আসবে না এবং তাদের আসতেও হবে না, শুধু ডকুমেন্ট পাঠাবে।  একপর্যায়ে আস্তে আস্তে এটিও একটি নিয়মের মধ্যে চলে আসলো।

তারপর তখন কোম্পানিগুলোর যে ক্যাটাগরি ছিল, তা ছিল সবার জন্য সমান। আমি চেয়ারম্যান সাহেবকে বললাম এভাবে চলতে পারে না। আমি বললাম এটলিস্ট আমরা ভাগ করে দেই যেন ইনভেস্টররা জানতে পারে কোন কোম্পানি ভালো ডিভিডেন্ড দেয়। কোম্পানিগুলোর ডিভিডেন্ডের ভিত্তিতে ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হলো। আমরা তখন এ কাজটি করলাম ইনেভস্টরদের জানানোর জন্য যে, সব শেয়ার এক রকম না ।

এরপরে আমরা  বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) ভিডিও নিতে শুরু করলাম। কারন, এজিএমগুলোতে তখন অনেক বিশৃঙ্খলা হতো। আর বললাম, কোন গিফট দেয়া যাবে না। ১৯৯৮ সালে আইপিওর নিয়ম ছিল যখন ফ্রীলি ফুল ডিসক্লোজার ব্যাসিসে ছিল। তখন আমি বললাম এই নিয়মে অনেক মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়, যা আমাদের চেক করার ক্ষমতা নাই। তাই ফুল ডিসক্লোজার ব্যাসিস নয়; একটি মিক্সড সিস্টেম থাকা উচিত। তখন মিক্সড একটি সিস্টেম চালু কো হলো। বুকবিল্ডিং সিস্টেমটাও আমার দায়িত্বকালীন সময়ে করা। তখন আমরা একটা কাট অব প্রাইস সিস্টেমের কথা বললাম এবং ২০ শতাংশ বন্ডের কথা বললাম। একইভাবে ইনডেক্সকেও একটি নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রাখতে চেষ্ঠা করলাম আমরা।

মার্কেট যেন ফুলেফেপে না উঠে, তা মনিটরিংয়ের চেষ্ঠা করলাম। পরবর্তীতে আমি ক্যাপিটাল মার্কেট রেগুলেটরি ফরমেট ডিপার্টমেন্টের প্র্রধান ছিলাম,‌‍‍ ‘ল’ ডিপার্টমেন্টের প্রধান ছিলাম এবং কিছু সময় আমি সুপারভিশন অব মার্কেট এর প্রধান ছিলাম। তখন অমনিবাস ডিপার্টমেন্ট ছিল, তখন আমি ব্রোকারদের বললাম বিনিয়োগকারিদের কোথায় কোথায় অমনিবাস একাউন্ট আছে; সেটা ট্রান্সফার করতে হবে। দেখাতে হবে-কে কে আছে অপটিবাস একাউন্টে এবং কে নিয়ন্ত্রন করছে। তখন আমাকে বলা হলো- এটি বন্ধ করে দিতে। এর পর ডিলারদের বলা হলো অমনিবাস একাউন্টের জন্যই মার্কেট ফল করেছে। তখন মার্কেট স্টাডি করে সেটা স্টপ করা হলো। তখন কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ফারুক সিদ্দিকী। ওই সময় অমনিবাস একাউন্টের আড়ালেই লেনদেন করে মার্কেট ফুলে ফেপে উঠলো। তখন ২০০৪-০৫ এর দিকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ডাচ-বাংলা ব্যাংকের অর্থায়নে চিটাগং স্টক এক্সচেঞ্জে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করা হলো। একইসঙ্গে বাংলাদেশে পুঁজিবাজার বিষয়ে জ্ঞানদানের জন্য একটি ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট এর প্রয়োজন আছে কিনা- এ বিষয়ে মার্কেট স্টাডি করার জন্য তারা আমাদেরকে একটি চিঠি দিল। তারা বললো- চিটাগাংয়ে এমন একটি ইন্সটিটিউট করতে চায় তারা। এও বললো যে, এ ধরনের একটি ইন্সটিটিউটের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে এবং চিটাগংয়েই এটি স্থাপন করা হবে। তখন আমার কাছে মনে হলো, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট রাজধানী ঢাকাতেই হওয়া উচিৎ- যাতে করে সারা দেশের সাথেই যোগাযোগ থাকে। তখন কমিশনের চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে আলাপ আলোচনা করে আমি বললাম, একটি ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট করা অবশ্যই দরকার এবং এটি রাজধানীতেই করতে হবে। এরপর এডিবি এর উপর একটি স্টাডি করলো। এডিবি বললো- বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের লিডারশিপে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হোক। তারাই নির্ধারন করবে এই প্রতিষ্ঠানের স্টাকচার কেমন হবে, কিভাবে এটির কাজ পরিচালনা করা হবে। এমন সময় এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আসলেন। উনাকে এই কমিটির কনভেনার করা হলো এবং আমাকে মেম্বার সেক্রেটারি বানানো হলো। ঐ সময়ে এ কমিটির মেম্বার ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, বিএমইর ডিজি, মার্চেন্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ডিপার্টম্যান্ট, মিনিস্ট্রি অফ ফিন্যান্স এবং তিনটি প্রফেশনাল ইন্সটিটিউট।

কমিটিতে থাকাকালে আমি বললাম, এটি যদি সম্পূর্ন সরকারি করা হয় তবে এর ফ্ল্যাক্সিবিলিটি কম হবে।  সুতরাং এটাতে যখন সবার ডিমান্ড আছে তাহলে এটিকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশীপ করা হলে ভালো হয় এবং এটিকে কোম্পানি ফরম্যাটে করা যায়। পাশাপাশি এও বলা হলো- এটিকে গ্যারান্টি কোম্পানি করা হোক। যার টাকা কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। এভাবে করলে এর ফ্ল্যাক্সিবিলিটি পাওয়া যাবে।

বাজারের সঙ্গে রিলেটেড প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বলা হলো- তোমরা সবাই এই কোম্পানিকে সাবসক্রাইব করো। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক বলল- আমাদের একটি ইন্সটিটিউট বা বিআইবিএম আছে আমরা এখানে থাকতে চাই না। অন্যদিকে ইন্স্যুরেন্স অথরিটি বলল, আমাদেরও একটি ইন্স্যুরেন্স ইন্সটিটিউট আছে আমরাও এখানে থাকতে চাই না। তখন এটিকে গঠন করা হলো তিনটি প্রফেশনাল ইন্সটিটিউট নিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট, এসইসি এবং লিস্টেড কোম্পানিগুলো নিয়ে শুরু হলো এটি। তখন এডিবির রিকমেন্ডেশন ছিল, এটি হবে একটি স্ব-স্বাশিত প্রতিষ্ঠান। প্রথমে এটিকে বিএসইসি প্রমোট শুরু করতে পারে, তবে পরে তারা সরে আসবে। যাতে করে এটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ক্যারেক্টার পায় এবং এটি বিভিন্ন বিষয়ে রিসার্চ করতে পারে। যদি এটি এসইসির অধীনে থাকে তবে এসইসির আইন প্রয়োগ, নীতিনির্ধারন ও নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে কথা বলতে পারবে না। এটার ম্যান্ডেট হিসেবে বলা হলো- এর আওতা হবে ব্যাপকতর। যাতে করে সর্বস্তরের মানুষ পুঁজিবাজারের সম্পর্কে জানতে পারে। যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে চায় তারা বাজার সম্পর্কে শিক্ষা নিতে পারবে। তারা আরো বললো শুধু পুঁজিবাজার নয়- ফাইন্যান্সিয়াল মার্কেট, জেনারেল এবং পার্টিক্যুলার বিসয় নিয়েও কাজ করতে হবে।

অবজেক্টিভে বলা হলো- যখন এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ইনভল্ব হবে, মার্কেট বৃদ্ধি পাবে তখন ইন্সটিটিউট একা এসব কিছু পরিচালনা করতে পারবে না; তাই স্টেপ বাই স্টেপ কাজ করতে হবে। আরো বলা হলো- কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের উপর কাজ করবে এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের আওতায় যে যে সেক্টের পরে, তার সবগুলো নিয়েই কাজ করবে এই ইন্সটিটিউট।

যাইহোক বিএসইসির চেয়ারম্যান, আমি, আইসিবি, সিডিবিএল, দুই স্টক এক্সচেঞ্জ নিয়ে এই ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠা করা হলো। এটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে গঠন করার পরে আর্থিক সমস্যা দেখা দিল। আমরা সবার কাছে টাকা চাইলাম; তখন অনেকেই টাকা দিতে রাজি হলো না। তখন তিনটি ইন্সটিটিউট থেকে ৫ লাখ করে টাকা নিলাম। এটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে মির্জ্জা আজিজুল ইসলামকে নিয়োগ দেয়ার আগেই তিনি সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে গেলেন। এরপর ফারুক সিদ্দিকী সাহেবের কথা বলা হলেও তিনি কোনো এক কারনে থাকতে পারলেন না। তখন আমাকে বলা হলো তুমি প্রেসিডেন্ট হও। আমি বললাম কোনো এজেন্ডা নেই; আমি এজেন্ডা ছাড়া কিভাবে হই? বোর্ড থেকে বলা হলো- কোনো এজেন্ডা লাগবে না। যাই হোক আমাকে সিলেক্ট করা হলো। তখন আমি একটি নতুন ডিপার্টম্যান্ট চালু করলাম। ওই সময় আমাকে অনেক সাহায্য করেছিলেন আহসানুল ইসলাম টিটু। তিনি এবারের সংসদে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। আমি তখন টিটুকে বললাম- আমার একটি ফ্লোর স্পেস লাগবে, আমাকে কি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারো? এই ফ্লোরটা তখন মালিকপক্ষ ৬০টাকা স্কয়ার ফিট করে ভাড়া দিতে চাইলো। আমি খবর নিয়ে দেখলাম উপযুক্ত দাম পেলে কর্তৃপক্ষ এটি বিক্রি করবে। আমি টিটুকে বললাম আমি তোমাকে ৪০ টাকা করে দিব এবং তিন বছরের এডভান্স দিব- তুমি চাইলে এটি কিনে নিতে পারো। আমার কথায় রাজি হয়ে আহসানুল ইসলাম টিটু এই ফ্লোরটিকে কিনে নিল। আমি টিটুকে বললাম- বসার জন্য কিছু চেয়ার টেবিল লাগবে, তুমি ব্যবস্থা করে দাও। তখন টিটু একদিনের মধ্যে ৭-৮ লাখ টাকা খরচ করে এই ফ্লোরটিতে আমাদেরকে বসার ব্যবস্থা করে দিল। একাতো তখন চালানো সম্ভব নয়; আমি তাই বিএসসিইকে বললাম আমাকে একজন আইটির লোক দিন, সিডিবিএলকে বললাম আমাকে ২জন লোক দাও- যাতে করে আমি কাজ চালিয়ে নিতে পারি। তখন তারা আমাকে লোক দিল। আর আমি একজন পিয়ন নিয়োগ দিলাম। আমিসহ এই ৪জনকে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ক্যাপিটাল মার্কেট (বিআইসিএম) এর। ইন্সটিটিউট চালানোর জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন; তাই আমি অনেকের কাছে টাকা চাইলাম। প্রত্যাশিত টাকা পেলাম না। তখন আমি একটি পরিকল্পনা করলাম- আগামী ৫ বছর এটি পরিচালনায় কত টাকা ব্যয় হতে পারে। এরপর আমি ১০ কোটি টাকার একটি বাজেট তৈরী করে ফারুক সিদ্দিকী সাহেবের কাছে গেলাম। ওইদিন উনার শেষ অফিস ছিল। আমি গিয়ে বললাম- স্যার একটা সই দেন। তখন তিনি জানতে চাইলেন- কিসে সই দিবো। আমি আমার পরিকল্পনার কথা বললাম; আর বললাম সরকারের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা বাজেট নিব। তিনি বললেন, তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি যে সরকার তোমাকে এত টাকা দিবে। আমি বললাম আপনি সই করেন দেখি সরকার দেয় কিনা। আমি সরকারের কাছে বাজেট পাঠালাম। ২০০৯-১০ সালে সরকার আমাকে টাকা দিতে রাজি হলেন।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, ১৯৯৮ সালে আমি এসইসিতে জয়েন করার পর থেকে চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি হিসেবে প্রায়ই আমি মন্ত্রনালয়ে যাতায়াত করতাম। সেই সুবাধে মন্ত্রনালয়ের উর্ধ্বতনদের সঙ্গে আমার একটি সুসম্পর্ক তৈরি হয়।

যাইহোক আমি ২০১০ সালের মার্চ মাসে বিআইসিএমে জয়েন করি। জয়েনে লেট হওয়ার কারনে মন্ত্রনালয় আমাকে ১.৫ কোটি টাকা দিতে চাইলো। আমি তাদের বললাম আমার টাকা কেটে রাইখেন না; তাহলে আমি কাজ করে যেতে পারবো না। এরপর পর্যায়ক্রমে তারা আমাকে ৮.৫ কোটি টাকা দেয়। আর দেড় কোটি টাকা কেটে রাখে। আমরা ৩-৪ জন মিলে টেন্ডার এপয়েন্টম্যান্ট বানালাম এবং ৮.৫০ কোটি টাকার প্রকিউরউটম্যান্ট করলাম। এরপর ২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে তৎকালিন অর্থমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করা হলো।

সরকার থেকে টাকা পেলাম ঠিকই কিন্তু মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা অমলেন্দু বাবু বললেন বেতন কাঠামো অনুমোদন না পেলে কোন কর্মকর্তাদের বেতন দেয়া হবে না। তখন মোটামুটি একটা ঝামেলায়ই পরে গেলাম। তখন আমরা বাহির থেকে লেকচারার আনতাম তাদেরকে প্রতিটি লেকচারের জন্য ১ হাজার টাকা করে দিতে হতো। তখন আমি নিজেই লেকচার দেওয়া শুরু করলাম। এর বিনিময়ে কোনো টাকা নিতাম না। ঐ লেকচার থেকে যে টাকা সাশ্রয় হতো সেটা দিয়ে আমার, একজন এডমিনের এবং পিয়নের বেতন দিতাম। আ বাকি যে ৩-৪ জন ছিল তাদের বেতন দিতে হতো না। কারণ তারাতো ছিল ধার করা। তাদের বেতন তাদের ডিপার্টম্যান্টই দিয়ে দিত। এভাবে ৩ বছর পার করার পরে ২০১৩ সালে এসে আমাদের বেতন কাঠামো হলো। যেহেতু, এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়, সে জন্য আমরা বিজ্ঞাপন দিয়েও লোক পেলাম না। এরপর আমরা ৪-৫ জন নিয়েই কাজ চালিয়ে গেলাম এবং সরকারের কাছ থেকে বাজেট নিলাম এবং ফ্লোর বৃদ্ধি কররাম। বাজেট পাওয়ার পরে আমি বোর্ডকে বললাম প্রতিষ্ঠান বড় করতে পারলে সবার দৃস্টি আকর্ষন করা যাবে। তখন বেতন কাঠামো ২০১৬ এর জন্য আবেদন করলাম। সরকার আমাদের বেতন বাড়ালেন এবং এও বললেন, তোমরা সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতই সকল সুবিধা পাবে আর তোমাদের ট্যাক্স হবে সরকারের মতই। আর এভাবেই আমরা সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়ে গেলাম।

তখন বিএসইসির চেয়ারম্যানের কাছেই বিআইসিএমের সব কন্ট্রোল ছিল। ওইসময় বিএসইসি আরও ২জন কমিশনার দিলেন বিআইসিএম এ। বিআইসিএমএ’র ৮জন টিচার ছিল আর নতুন ৪ জন এসেছে। মোট ১২জন টিচার দিয়ে আমরা আমাদের কাজ শুরু করে দিলাম। এখন বিআইসিএমের যে অবস্থা তা দেশের পুঁজিবাজার তথা আর্থিক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই দেখতে বা বুঝতে পারছে। এখন আমরা মাস্টার্স প্রোগ্রাম, গবেষণা এবং লাইসেন্সিংও শুরু করতে পারি। আমরা ২০১০ সালেই লাইসেন্সিং এর প্রোগ্রাম তৈরি করে রেখেছিলাম। শুরু থেকেই আমি এই প্রতিষ্ঠানের মিনিমাম মান বজায় রাখার চেষ্ঠা করেছি এবং তা আজও ধরে রেখেছি। আমার কাছে মনে হয়,  যতদ্রুত সম্ভব এই প্রতিষ্ঠানে মাস্টার্স প্রোগ্রাম শুরু করা উচিৎ। আর এ বিষয়ে বিএসইসিকেই এগিয়ে আসতে হবে। বিএসইসি যদি আন্তরিকতার সঙ্গে এগিয়ে আসে, তবে এই প্রতিষ্ঠান তথ্য-উপাত্ত পাবে এবং মানসম্পন্ন গবেষণা করতে পারবে।

তবে যাই কিছু করা হোক না কেন-এই প্রতিষ্ঠানের (বিআইসিএম) মান বজায় রাখতে হবে। আর এখানকার টিচার হতে হলে পিএইচডি ডিগ্রি লাগবে। আমি যা করতে চেয়েছিলাম মোটামুটিভাবে তা করতে পেরেছি। দেরিতে হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখন এ্যাস্টাবলিশ হয়েছে। এখন বিআইসিএম ৩০ হাজার স্কয়ার ফিট ফ্লোর স্পেসের উপর দাড়িয়ে আছে এবং একসাথে ৩০০ শিক্ষার্থীকে শিক্ষা দেওয়ার স্বক্ষমতা অর্জন করেছে।

চলবে……..

(কেএইচকে/ ইএইচএস/ এসএএম/ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)


Comment As:

Comment (0)