বোনাস শেয়ার বিক্রি করে তিন মাসে ২ হাজার কোটি তুলে নিয়েছেন ১২ কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালক
নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: দেশের পুঁজিবাজারের সাম্প্রতিক মন্দাবস্থার মধ্যেও তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও স্পন্সরদের শেয়ার বিক্রির হিড়িক পড়েছে। গত তিন মাসে ১২টি কোম্পানির উদ্যোক্তা, স্পন্সর ও পরিচালকরা শেয়ার বিক্রি করে পুঁজিবাজার থেকে কমপক্ষে দুই হাজার কোটি টাকা তুলে নিযেছেন। কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে- মুন্নু সিরামিকস, মুন্নু স্টাফলারস, হাক্কানী পাল্প, ইউনাইটেড ইনস্যুরেন্স, নুরানী ডায়িং, ড্রাগন সোয়েটার, ডরিন পাওয়ার, স্টাইল ক্রাফট, আর্গন ডেনিমস, সিভিও প্যাট্রোকেমিক্যাল ও বিডি অটোকারস লিমিটেড।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ডিএসইর তথ্যানুযায়ী, বিগত জানুয়ারি মাসজুড়ে বাজারে শেয়ার কেনার চাপ থাকায় কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দামে বড় উল্লম্ফন ঘটে। আর ফেব্রুয়ারিতে কিছুটা কমলেও ঊর্ধ্বমুখী ধারবাহিকতা বজায় থাকে। কিন্তু পুরো মার্চ মাসজুড়ে পুঁজিবাজারে মন্দাবস্থার সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় বিপুল পরিমানে শেয়ার বিক্রি করেছেন তালিকাভূক্ত কোম্পানিগুলোর উদ্যোক্তা ও পরিচালকরা। ফলে বাজারে শেয়ারের জোগান বাড়লেও চাহিদা না থাকায় কমেছে শেয়ারের দাম। আর সর্বোপরি শেয়ার কেনার পরিমাণ কমায় বাজারে নিম্নমুখী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুদ্রানীতিতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি কমানো, ব্যাংকের ঋণ আমানত সমন্বয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ ও সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বৃদ্ধি এবং ব্যাংক খাতের কোম্পানির ডিভিডেন্ড ঘোষণা না করায় পুঁজিবাজারে ঢিমেতাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমনি অবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
পুঁজিবাজারের অব্যাহত মন্দাবস্থা দেখা দেয়ায় ডিএসই কর্তৃপক্ষসহ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকদের অবাধে শেয়ার বিক্রির বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনও (বিএসইসি) পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতে নজরদারি আনে। ফলে উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার বিক্রিতে কিছুটা হলেও ছন্দপতন ঘটে।
ডিএসইর হিসাব অনুযায়ী, শেয়ার বিক্রিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বস্ত্র খাতের কোম্পানি নুরানী ডায়িং লিমিটেড। গত ১১ মার্চ এই কোম্পানির করপোরেট ডিরেক্টর দাউপুর রাইস মিলস ২৮ লাখ ৭৩ হাজার, স্পন্সর ডিরেক্টর রেহানা আলম ১৬ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ ও নুরুল আলম ১৮ লাখ ৮৭ হাজার ৩৪০ শেয়ার বিক্রি করেছেন। এ ছাড়া স্পন্সর ডিরেক্টর এস কে নুর মুহাম্মদ আজগর পাঁচ লাখ ১০ হাজার ৫১০টি শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছেন।
এদিকে মুন্নু সিরামিকের করপোরেট্ উদ্যোক্তা মুন্ন ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন গত ১১ মার্চ ২৮ লাখ শেয়ার বিক্রি করার ঘোষণা দিয়েছেন। কোম্পানিটির করপোরেট উদ্যোক্তা যদিও ব্লক মার্কেটে শেয়ার বিক্রির কৌশল অবলম্বন করেছেন। এর আগেও এ উদ্যোক্তা কয়েক দফায় ১৫ লাখের বেশি শেয়ার বিক্রি করেছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল ব্লক মার্কেটে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্লক মার্কেটে শেয়ার বিক্রি করার ঘোষণা দিয়ে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের সাথে নতুন প্রতারণায় নেমেছেন। কারণ ব্লক মার্কেটের শেয়ার অন্য হাত ঘুরে পাবলিক মার্কেটেই ফিরে আসে।
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, বাজারে আস্থাহীনতা ও তারল্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রাইভেট প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে বিপুল পরিমান টাকা মধ্যসত্তাভোগীরা নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নানা কৌশল অবলম্বন করে স্পন্সর ও পরিচালকরা যেন শেয়ার বিক্রির প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। এরফলে বাজারে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ বিষয়ে বিএসইসির আরও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো: সাইফুর রহমান বলেন, উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির বিষয়টিতে সার্বক্ষনিক নজর রাখছে বিএসইসি। ঘোষণা ছাড়া শেয়ার বিক্রি করলে পরিচালকদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এসব বিষয়ে বাজারসংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।
(এমআইআর/এসএএম/ ৩০ মার্চ ২০১৯)



