‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৮’ এর মোড়ক উন্মোচন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা:  ‘ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৮’ এর মোড়ক উম্মোচন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ মে ২০১৯) বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে কেন্দ্রিয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির রিপোর্টটির মোড়ক উম্মোচন করেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রধান নির্বাহীগণ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথরিটি ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি’র প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির অন্যতম হিসেবে পূর্বের যেকোন সময়ের তুলনায় বাংলাদেশ বিশ্ব অর্থনীতির সাথে অনেক বেশী সম্পৃক্ত। ফলে বিশ্বব্যাপী অর্থ, বাণিজ্য ও রাজনীতিতে সংঘটিত নানা পরিবর্তন আমাদের জন্য বিভিন্ন আশংকার পাশাপাশি সম্ভাবনার সুযোগও তৈরী করছে। তিনি আর্থিক সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিশ্ব অর্থনীতির বিভিন্ন পরিবর্তনের গতি-প্রকৃতির প্রতি গভীর মনযোগী থাকার পরামর্শ প্রদান করেন।

ফজলে কবির বলেন, বৈশ্বিক শ্লথ প্রবৃদ্ধির হার ও নানামুখী ঝুঁকি সত্ত্বেও নি¤œমুখী মুদ্রাস্ফীতি, রেমিটেন্স ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং আর্থিক খাত নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রবৃদ্ধি সহায়ক নীতিমালার পাশাপাশি শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ফলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালে সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা ও তারল্য ন্যূনতম আবশ্যকীয় হারের চেয়ে বেশী ছিল। তিনি ব্যাংকিং খাতে পুঞ্জীভূত মন্দঋণ কমাতে ব্যাংকারদের সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের অনুরোধ জানান। এ ব্যাপারে সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহীত পদক্ষেপসমূহের উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

গভর্ণর বলেন, দেশের প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে ঋণ ও আমানতের সুদের হার এক অংকে নামিয়ে আনার জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের প্রতি আহ্বান জানান। এছাড়া ইলেকট্রনিক পেমেন্ট ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির ফলে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত ঝুঁকি বিষয়ে সকলকে সচেতন থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানান।

ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০১৮ এর গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলো নি¤েœ দেয়া হলো। পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটের https://www.bb.org.bd/pub/index.php লিঙ্কে পাওয়া যাবে।

সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রগতিসমূহঃ

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি সার্বিকভাবে স্থিতিশীল ছিল। প্রকৃত (জবধষ) জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে যা পূর্ববর্তী অর্থবছরে ৭.৩ শতাংশ ছিল। ২০১৮ সাল সমাপনান্তে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫.৫ শতাংশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের স্থিতি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কিছুটা কমে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আলোচ্য অর্থবছরে রপ্তানি বাণিজ্য এবং ওয়েজ আর্নার’স রেমিটেন্স যথাক্রমে ৬.৪ ও ১৭.৩ শতাংশ বাড়লেও আমদানি বানিজ্য ২৫.২ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় চলতি হিসেবের ঘাটতি ৯.৮ বিলিয়ন ডলারে (যা জিডিপি’র ৩.৬ শতাংশ) দাঁড়িয়েছে। চলতি হিসেবের ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় সামগ্রিক ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঋনাত্নক প্রবণতা দেখা দেয়।

ব্যাংকিং খাতের কর্মদক্ষতাঃ

২০১৮ সালের সমাপনান্তে ব্যাংকিং খাতের সম্পদ ১১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণ ও আগাম ১৪.১ শতাংশ এবং আমানত ১০.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট আমানতের মধ্যে মেয়াদী আমানতের পরিমাণ অর্ধেকেরও বেশী যা ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক অর্থায়নে স্থিতিশীল উৎস হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। ২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতে মূলধন ও ঝুঁকি-ভিত্তিক সম্পদের অনুপাত কিছুটা কমে ১০.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা আবশ্যকীয় ন্যূনতম হার (১০ শতাংশ) অপেক্ষা বেশী। ব্যাসেল-৩ মূলধন কাঠামোর আওতায় Capital Conservation Buffer (CCB) এর নির্ধারিত মাত্রা শতকরা ১.৮৭৫ এর বিপরীতে ব্যাংকিং খাত ০.৫০ শতাংশ সংরক্ষণ করেছে। এছাড়া, ব্যাংকিং খাতে Leverage ratio ৪.১ শতাংশ ছিল, যা আবশ্যকীয় মাত্রা ৩ শতাংশের তুলনায় বেশী।

ব্যাংকিং খাতের নিট মুনাফা ৫৭.৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সম্পদের বিপরীতে আয় হার (ROA)  ৪০ বেসিস পয়েন্ট কমে ০.৩ শতাংশে এবং মূলধনের বিপরীতে আয়-হার (ROE) ৬০০ বেসিস পয়েন্ট কমে ৪.৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতের তারল্য পরিস্থিতি ২০১৮ সালে তুলনামূলক চাপের মুখে ছিল। বছর শেষে আগাম-আমানত অনুপাত (Advance-to-Deposit Ratio, ADR)  বেড়ে ৭৭.৬ শতাংশে উন্নীত হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটরি পলিসিতে নির্ধারিত সীমার মধ্যেই ছিল। এই সময়ে কলমানি হারে মিশ্র প্রবণতা পরিলক্ষিত হয় যা ডিসেম্বর ২০১৮ তে দাঁড়ায় ৪.১ শতাংশ। ব্যাংকিং খাতে ব্যাসেল-৩ তারল্য নির্দেশক Liquidity Coverage Ratio (LCR) এবং Net Stable Funding Ratio (NSFR) এর আবশ্যকীয় হার ১০০ শতাংশ অপেক্ষা বেশী ছিল। আলোচ্য বছরে আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল (Deposit Insurance Trust Fund, DITF) ৭৪.৩ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট বীমাযোগ্য আমানতের ২৩ শতাংশ এবং এর দ্বারা ৯২.১ শতাংশ আমানতকারীর আমানত দায় (সর্বোচ্চ ১,০০,০০০ টাকা) পরিশোধ করা সম্ভব।

ব্যাংকিং খাতে ২০১৮ সালে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের (Gross Non-Performing Loan) হার ছিল ১০.৩ শতাংশ এবং নীট শ্রেণীকৃত ঋণের (রক্ষিত প্রভিশন সমন্বয়ের পর) হার ২.২ শতাংশ ছিল। বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট শ্রেণীকৃত ঋণের হার ৬০ বেসিস পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি:

২০১৮ সালে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি সহনীয় মাত্রায় ছিল। সার্বিক ঝুঁকি পরিমাপক নির্দেশক, Risk-Weighted Asset Density Ratio, সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মোট ঝুঁকি ভিত্তিক সম্পদের মধ্যে ঋণ ঝুঁকির পরিমাণ ছিল ৮৮ শতাংশ। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানসমূহের credit rating অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্থিতিশীল ছিল এবং ব্যাংকিং খাতে সুদের হার, মুদ্রা বিনিময় হার, ইকুইটি মূল্য এবং তারল্যের উপর stress test এর অভিঘাত সহনক্ষম ছিল।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহঃ

২০১৮ সালে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ১৩.৯ শতাংশ যা ন্যূনতম আবশ্যিক হারের (১০ শতাংশ) তুলনায় বেশী। আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শ্রেণীকৃত ঋণ ও লীজের হার ৭.৯ শতাংশ ছিল। Cash Reserve Ratio (CRR) Ges Statutory Liquidity Ratio (SLR) যথাক্রমে ২.৪ এবং ২১.১ শতাংশ ছিল।

বৈদেশিক মুদ্রা বাজারঃ

২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা সহনীয় পর্যায়ে ছিল। মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান হ্রাস পেয়েছে। মূল্যমানের হিসেবে আমদানি ঋণপত্র খোলা ২০১৭ সাল অপেক্ষা কমলেও নিষ্পত্তি ৭.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৮ সালে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

আর্থিক অবকাঠামোঃ

২০১৮ সালে National Payment Switch Bangladesh (NPSB) এর মাধ্যমে ১৫৫ বিলিয়ন টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। Bangladesh Automated Cheque Processing System (BACPS) -এ উচ্চমূল্য এবং নিয়মিত মূল্যমানের ইন্সট্রুমেন্ট ২০১৭ সালের তুলনায় যথাক্রমে ১৩.৬ এবং ১০.১ শতাংশ বেশী নিষ্পত্তি হয়েছে। Bangladesh Electronic Fund Transfer Network (BEFTN) এর মাধ্যমে ২০১৭ সালের তুলনায় ৩৩.৩ শতাংশ বেশি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া, Real Time Gross Settlement (RTGS) এর মাধ্যমে ৬,৬৭৪.৭৫ বিলিয়ন টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আহমেদ জামাল এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস এম মনিরুজ্জামান, চেইঞ্জ ম্যানেজমেন্ট এ্যাডভাইজর আল্লাহ মালিক কাজেমি, ব্যাংকিং রিফর্ম এডভাইজর এস. কে. সুর চৌধুরী, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এর কমিশনার অধ্যাপক স্বপন কুমার বালা, ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট এন্ড রেগুলেটরি অথরিটির নির্বাহী পরিচালক ড. শেখ মো. রেজাউল ইসলাম, এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর সহ-সভাপতি শফিকুল আলম, বাংলাদেশ লিজিং এন্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ এসোসিয়েশন এর প্রতিনিধি আরিফ খান।

প্রতিবেদনটির ওপর একটি পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন প্রদান করেন ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্ট এর মহাব্যবস্থাপক ড. মোঃ কবির আহাম্মদ।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন একই বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন।

(এসএএম/ ২৮ মে ২০১৯)


Comment As:

Comment (0)