‘বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমেই বিকশিত হবে পুঁজিবাজার’

নিজস্ব প্রতিবেদক, বিনিয়োগবার্তা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তাঁর সরকার দেশব্যাপী প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসার এবং বিনিয়োগকারীদের সম্ভাব্য সব ধরনের নিরাপত্তা প্রদানের ব্যবস্থা নিয়েছে। নানা সংস্কার ও পদেক্ষেপের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার গঠনে কাজ করে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজার শক্তিশালী হলে দেশের অভ্যন্তরে শিল্পায়ণ ও বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ-মেয়াদি অর্থের যোগান দেয়া সম্ভব হবে। দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসার ও বিনিয়োগ সুরক্ষার কলাকৌশল সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার মাধ্যমে পুঁজিবাজার বিকশিত হবে। আর এসবের মাধ্যমে অচিরেই দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের উৎস হিসেবে আভির্ভূত হবে পুঁজিবাজার।’

সোমবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘রিজওনাল সেমিনার অন ফিন্যান্সিয়াল লিটারেসি এন্ড ইনভেস্টমেন্ট প্রোটেকশন’ শীর্ষক ৪ দিনের এক আন্তর্জাতিক সেমিনারের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘ আমাদের সরকার একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ে তোলার জন্য ধারাবাহিকভাবে পলিসি সাপোর্ট, আইনগত সংস্কার, অবকাঠামো র্নিমাণসহ নানাবিধ সহযোগিতা দিয়ে আসছে।’

তিনি বলেন,‘পুঁজিবাজারের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম দূর করে জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করা হয়েছে।’

পুঁজিবাজারে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের পুঁজিবাজার এখনও ব্যক্তি শ্রেণির বিনিয়োগকারীর উপর নির্ভরশীল। তিনি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গঠনে দৈনন্দিন লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘একটি দক্ষ বিনিয়োগ গোষ্ঠী গড়ে তুলতে দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ একাডেমি ফর সিকিউরিটিজ মার্কেট (বিএএসএম) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ঝুঁকি হ্রাস করতে বিএসইসি দেশব্যাপী বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর আওতায় বিভাগীয় শহরগুলোতে বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে তা সকল জেলা সদরে অনুষ্ঠিত হবে।’

পুঁজিবাজারে খেয়াল খুশি মত বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে তিনি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, ‘মূলত, বিনিয়োগকারীরাই হল বাজারের মূল চালিকাশক্তি। তাই তাদের সচেতনার বিষয়টি শক্তিশালী পুঁজিবাজার গড়ার অন্যতম পূর্বশর্ত।’

তিনি বলেন,‘ জেনে-বুঝে বিনিয়োগ করলে একদিকে যেমন প্রত্যেকের বিনিয়োগ ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ে, অন্যদিকে নিশ্চিত হয় বাজারের স্থিতিশীলতা। এসময় তিনি লাভের সব টাকা পূনরায় বিনিয়োগ করতে বারন করেন।

তিনি বলেন, আপনারা (বিনিয়োগকারীরা) লাভের সব টাকা পূন:বিনিয়োগ করবেন না। কিছু টাকা সঞ্চয় করে রাখবেন। এতে ঝুঁকির মাত্রা কিছুটা হ্রাস পাবে। বিপদে আপদে খরচ করতে পারবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীসহ, পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের বিনিয়োগ দক্ষতা ও কলা-কৌশল সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করবে। এতে অন্যান্য প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার দিকটি অধিকতর নিশ্চিত হয়ে বিকশিত একটি পুঁজিবাজার গড়ে উঠবে এবং এই পুঁজিবাজার ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিভিন্ন খাতে দীর্ঘ-মেয়াদি অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে আবির্ভূত হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সেমিনারে ভারত, জাপান, ফিলিপাইন, নেপাল, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড,দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং আইসল্যান্ডের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করেন।

বিএসইসি চেয়ারম্যান ড. মো. খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন এডিবি’র কান্ট্রি ডিরেক্টর মনমোহন প্রকাশ।

সেমিনারে দেশের উন্নয়নে পুঁজিবাজারের ভূমিকা শীর্ষক একটি ভিডিও ডকুমেন্টারী প্রদর্শন করা হয়।

পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণে তাঁর সরকারের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের করমুক্ত ডিভিডেন্ড আয়ের সীমা ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দ্বৈতকর ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে উদ্যোক্তাদেরকে স্টক ডিভিডেন্ডে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নতুন ফিক্সড ইনকাম ফিন্যানসিয়াল প্রোডাক্টসহ বিভিন্ন ধরনের বন্ড প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শর্ট সেল এবং রিস্ক বেইস ক্যাপিটাল সংক্রান্ত দুইটি বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার বিএসইসি’র (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে জনবল বৃদ্ধিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। বিএসইসির কর্মচারিদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণীত প্রণোদনা প্যাকেজের সফল বাস্তবায়ন অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিদেশী কৌশলগত বিনিয়োগকারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও ইমপ্যাক্ট ফান্ড গঠনের জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

বর্তমান সরকার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে স্মল ক্যাপিটাল প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে উল্লেখ করে সরকার প্রধান বলেন,  এর ফলে ছোট ও মাঝারি আকারের কোম্পানি পুঁজি উত্তোলন করতে পারবে এবং স্টার্ট-আপ কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এরফলে পুঁজিবাজারের গভীরতা আরও বাড়বে।

দেশের দারিদ্র বিমোচনে তাঁর সরকার নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ স্বল্প-উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের সকল শর্ত পূরণ করেছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার সাড়ে ৬ শতাংশের উপরে এবং গত তিন অর্থ-বছরে তা ৭ শতাংশের অধিক হয়েছে। আগামীতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ১ শতাংশ।

তিনি বলেন, ‘২০২৩-২৪ সালের মধ্যে আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছি। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ও উল্লেখযোগ্য চিত্র ভাষণে উপস্থাপন করেন।

তিনি বলেন, দারিদ্র্যের হার কমে এখন ২১ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৯০৯ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশে রাখা সম্ভব হয়েছে।

গত দশ বছরে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে এবং ৫ কোটির বেশি মানুষ নিম্ন আয় থেকে মধ্যম আয়ের স্তরে উন্নীত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি মহাকাশে নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ উৎক্ষেপণসহ যোগাযোগ ও টেলিযোগাযোগ খাতে দেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন।

সরকারের বেসরকারী খাতকে উৎসাহিত করায় দেশে দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন,  একইসঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে- নারী-পুরুষ, গ্রাম-শহর ও অঞ্চল ভিত্তিক বৈষম্য কমে আসছে।

সরকার প্রধান বলেন, সম্প্রতি প্রকাশিত আইএমএফ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী জিডিপি’র ভিত্তিতে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৩তম এবং ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩২তম দেশ। বাংলাদেশ ২০১৭ সালে দ্রুততম প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় ছিল।

তিনি বলেন, প্রাইসওয়াটার হাউজ কুপারস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে ২৮তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ২য় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল নীতি-২০১৪ প্রণয়ন করেছি। যার আওতায় আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হবে। এর ফলে, এ সময়ের মধ্যে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে অতিরিক্ত ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং কর্মস্থান সৃষ্টি হবে আরও ১ কোটিরও বেশি মানুষের।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন,‘আমরা বিশ্বাস করি পুঁজি বাজারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ও বিনিয়োগে অংশীদার করা সম্ভব। কারণ, যত বেশি মানুষ পুঁজি বাজারে সম্পৃক্ত হবে, আমাদের শিল্পায়ন তত বেশি ত্বরান্বিত হবে।’

তিনি বলেন, আমি আশা করছি, এশিয়া প্যাসিফিক ইকনোমিক কো-অপারেশনের ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরস ট্রেনিং ইনিশিয়েটিভ (এপিইসি-এফআরটিআই) এর আওতায় বিএসইসি ও এডিবি কর্তৃক আয়োজিত এই সেমনিারের আলোচনা থেকে দেশ-বিদেশের অংশগ্রহণকারীরা উপকৃত হবেন। একে অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে সমৃদ্ধ হয়ে নিজ নিজ দেশের পুঁজিবাজারের ভীতকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়াস পাবেন।

বর্তমান সরকার ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালেকে ‘মুজিব বর্ষ’ হিসবে ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করার মাধ্যমে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন বলেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

(এমআইআর/এসএএম/ ০৮ জুলাই ২০১৯)


Comment As:

Comment (0)