প্রকৃতির নিসর্গ হাজারীখীল

মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম: গেলো ঈদের ছুটিতে দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র বন্ধুরা ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম যে কোন দিকটায় যাবো। কারণ, মৌসুম অনুযায়ী হাওরে নেই তেমন পানি। পাহাড়ি ঝর্ণা গুলোও প্রায় শুকনো। কিন্তু সংগঠনের অপক্ষাকৃত নবীনরা বেশ তাগিদ দিতে থাকলো। চীফ অর্গানাইজার হিসেবে আমার হয়েছে যত জ্বালা। যদি ভ্রমণ স্বার্থক হয়-তাহলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বখিলতা। আর যদি নিরাশ হয়, তাহলে আগেপিছে ফুচুরফাচুর করতে থাকে না কোন দ্বিধা। যদিও দে-ছুট কোন কমার্শিয়াল গ্রুপ নয়; তবুও কথা থেকে যায়।

এসব কিছু বিবেচনা করেই ঈদের রাতে ছুটলাম বন মানুষের গুহা দেখতে। সঙ্গীরা তখনো কেউ জানে না, কোথায় যাচ্ছি। স্থান নির্ধারণে আমি পুরোই স্বাধীন। যার ফলে উপভোগ্য একটা ভ্রমণ উপহার দেয়ার জন্য বাড়তি একটা মানসিক চাপ থেকেই যায়। আমি আর চালক শুধু দুজনেই জানি, মাইক্রো যাচ্ছে ফটিকছড়ি। ঈদের রাত, তাই সড়কে নেই কোন যানজট। নানান গল্পে সবাই মেতে রয়েছে। কিন্তু কেউ তেমন সাহস পাচ্ছে না জিজ্ঞাসা করতে। আসলে যাচ্ছিটা কোথায়। রাত প্রায় সাড়ে তিনটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে। আমার ফোন পেয়ে হাজারীখীল ইকো ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিষ দাদার কানখাড়া। এত রাতে কেমনে আসলেন দাদা। আরে দাদা দে-ছুট বলে কথা। তিনি আর দেরী না করে, সিকিউরিটি গার্ডকে যা বলার বলে দিলেন।

শেষ রাতে তাঁবু টানানোর সুযোগ নেই। তাই আমাদের ঠাই হল অফিস রুমে। যে যার মত বেডিং বিছিয়ে চিৎপটাং। চোখটা লাগতে না লাগতেই ভিন্নরকমের স্বরের অনবরত মোড়গের ডাক। ঘুম ঘুম চিত্তে ভাবলাম- হবে হয়তো কোন পাহাড়ি মোরগের ডাক। কিন্তু নাহ! ভালো লাগবেতো দূরে থাক, একটা সময় বিরক্ত হয়ে উঠে পড়লাম। দেখলাম কমবেশী সবাই বিরক্ত। বড় গলায় পরিচয় দেয়া, চৌধুরী বংশের রাকিবও বিরক্ত। কিন্তু কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। সবাই যখন বিরক্ত হয়ে ডাকের উৎস খোঁজায় ব্যস্ত, তখন সারাদিন ভালো-মন্দ মানুষের ভিড়ে থাকা মেহেদি উকিল আবিষ্কার করল, আওয়াজটা রাকিবের ব্যাগ হতেই আসা। অথচ সেই জানে না। তখন ওর সঙ্গে হাসবো-নাকি রাগ করবো-বুঝে উঠার আগেই বলল, তার মেয়ে বাপের টাইম মত ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য এই অর্গানিক এ্যালার্মটা দিয়েছে। ওর কথায় সবার রাগের পারদ নীচে নেমে, হাসির ঢেউ খেলালো। আবারো ঘুমানোর চেষ্টা। কিন্তু ঘুম আসার আগেই গাইড মান্নানের হাকডাক। তড়িৎ গতিতে ফ্রেস হয়ে ছুটলাম নাশতা খেতে। ভরপুর নাশতা করলো সবাই। কারণ, সারাদিন আর তেমন দানাপানি পড়বে না পেটে।

বেলা প্রায় সাড়ে নয়টা। ছুটলাম এবার মূল অভিযান বন মানুষের গুহা’র পথে।

নয়ন জুড়ানো চা বাগান ঘেরা মেঠো পথে হেঁটে চলছি। গাছে গাছে পাকা কাঠাল ঝুঁলে আছে। কোনো কোনো গাছে কাঠাল পেকে নষ্ট হচ্ছে। তবুও খাওয়ার জন্য যেন কোন মানুষ নেই। কিন্তু শহুরে দামালরা, দেখতে দেখতে আর লোভ সামলাতে পারলো না। ছোঁচার মত অনুমতি নিয়ে কাঠাল খেয়েই ছাড়ল। ওরা কাঠাল ভাঙ্গার পর অমিও আদেখলার মত কয়েক কোয়া খেয়ে ফেললাম। আহ্ কি রসালো টেস্ট। পুরো সিজনে যা খেতাম-তা আজ এক বসাতেই সাবার। খেয়েদেয়ে চেটেপুটে আবারো হাঁটা। এরই মধ্যে রফিক ভাইর ফুচুর-ফাচুর শুরু হয়ে গেছে। ও জাভেদ ভাই, আমরা কি এই চা বাগানের ভিতর দিয়াই হাটুম। তাকে বললাম-হ ভাই। কিন্তু আমিতো জানি যাচ্ছিটা কোথায়। যাওয়ার পর তখন জোঁকের কামড় খেয়ে, থাকবে সব দৌড়ের উপরে।

হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় চা বাগান পিছনে ফেলে, ঢুকে গেলাম অবারিত বুনো সবুজের গালিচায় মোড়ানো ঝিরি পথে। মূল হাইকিং-ট্র্যাকিং এবার শুরু। সবার চোখে-মুখে এবার আনন্দের ঝিলিক। কারণ, জঙ্গলী পথের ভ্রমন অভিযানগুলো, দে-ছুট এর বন্ধুদের একটু বেশি বেশিই টানে। ছোট,বড়,পাহাড়, ঝিরি,খুম পেরিয়ে ছুটছি বন মানুষের গুহার দিকে। হাঁটছি আর দেখছি। পুরোই বণ্য পরিবেশ। কোনোকোনো গাছের ডালগুলো দূর থেকে দেখে মনে হয়, যেনো সাপ পেচিঁয়ে রয়েছে। অদ্ভুত সব ব্যাপার-স্যাপার। মাঝেমধ্যে ঘনজঙ্গলে সূর্যের আলো মুখ লুকায়। আমরা ছাড়া আর কোন পর্যটকের দেখা নেই। কিছু কিছু পাথরের আকৃতি এমন, যেন বন মানুষের পা’য়ের ছাপ পাথরে বসেছে। এরকম রোমাঞ্চকর পথে, সুইট বয় শাকিলের জীবনের প্রথম অ্যাডভেঞ্জার ট্যুর। কিন্তু তাকে দেখে বুঝা মুশকিল। পুরো টিমের খাবারের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ছুটছে একাই। ভাবখানা এমন মনে হয়, সে যেনো কিলিমানজারো পর্বত ফেরৎ। যাক বাবা, প্যানপ্যানানো রোগীদের চাইতে – তাও ভালো। এই বনটি হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যর আওতাধীন। এখানে রয়েছে ২৫০ প্রজাতির গাছ ও ১৫০ প্রজাতির পাখি। এই বনে দেশের বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত, বিরল প্রজাতির বইলাম গাছও রয়েছে। প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বনকুকুর,বনমোরগ,তক্ষক,গিরগিটি,মুখপোড়া হনুমান,বানর,গুই সাপ,বড় অজগর,হরিণ,মেছো বাঘ,বন্য শুকর ইত্যাদি। ২০১০ সালে ২ হাজার ৯০৮ হেক্টর পাহাড়ী অঞ্চল ঘিরে সরকারিভাবে গড়ে তোলা হয় এই অভয়ারণ্য।

এখানকার নানান গাছগাছালির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-গর্জন,চাপালিশ,তেলসুর, টালি,বাশঁপাতা, সিভিট, জারুল, লোহাকাঠ ,ছাতিয়ান, গুটগুটিয়ান, লটকন ইত্যাদি। হাঁটতে হাঁটতে প্রায় তিন ঘন্টা পর,বন মানুষের গুহার ভাব দেখতে পেলাম। চরম উদ্দীপনায় এগুতে থাকলাম। এখনকার পথটা যেনো আসলেই বন মানুষের চলাচল উপযোগী। দুপাশের পাহাড় সরু হয়ে এসেছে। কখনো কোমর, কখনো বা আবার প্রায় বুক সমান পানি কেটে এগিয়ে গেলাম। আরেকটু এগিয়ে যেতেই চোখে ধরা দিল অজস্র পাথরের বোল্ডার। খুবই পিচ্ছিল পাথুরে পথ। কতবছর কে জানে, এ পথ মাড়ায় না কোন মানবের দল। পা’পিছলালেই নিশ্চিত ভাঙ্গবে কোমর। একে একে সবাই খুব সাবধানে এগিয়ে যাই। টগবগে তারুণ্যের প্রতীক হাসিবের কল্যাণে, আমার মাত্রাতিরিক্ত ওজনের দেহটাও এগিয়ে যায়। একটা সময় পৌঁছে যাই সেই কাঙ্খিত বন মানুষের গুহায়। ওয়াও–পুরোই গা ছমছম করা বন্য পরিবেশ। রয়েছে নানান আকৃতির পাথরের ছড়াছড়ি। পাহাড়ের গায়ে ছোট-বড় গর্ত। বিষাক্ত চেলার অবাধ বিচরণ। রিমঝিম ছন্দতোলা ঝর্ণা। মাথার উপর দিগন্ত ছোয়া গাছের সাড়ি। দু’পাশের পাহাড় চেপে আসায়, মধ্য দুপুরেও ভর সন্ধ্যা পরিবেশ। সব মিলিয়ে অসাধারণ মূহুর্তের্, ভালো লাগার মতো জায়গা – বন মানুষের গুহা। কেন, কী কারণে, এর নাম এরকম হয়েছে, তা এই জনমানব শুন্য স্থানে কারো কাছে জিজ্ঞাসা করে জানার সুযোগ ছিল না। তবে জায়গাটা ‘বন মানুষের গুহা’ নামকরণের যথেষ্ট সার্থকতা রয়েছে।

যাই চলে যাই এবার ভান্ডারিয়া ঝর্ণা। জানতাম তেমন পানি পাব না। তবুও এগুলাম মায়াবী বুনো পথের জঙ্গলি ফুলের সুবাস নিতে। এই অভয়ারণ্যে দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির পাখ-পাখালী সহ মথুরা, দোয়েল, শালিক, টিয়া, ঘুঘু, বক, চড়ুই, ময়না ইত্যাদি পাখির দেখা মিলে। ঝিড়ি ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর যেতেই চোখ চড়কগাছ। বড়সড় কোন এক প্রাণীর পা’য়ের ছাপ। গাইড জানালো-এটা বড় কোন ভাল্লুকের। উত্তেজনার মাত্রা আরো বেড়ে গেলো। তারপরেও আরো শিওর হতে , বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা অপু নজরুলকে পা’য়ের ছাপ দেখানোর পর, উনি নিশ্চিত করলেন-এটা বিপন্ন প্রজাতির বিরল প্রাণী এশিয়ান ব্লাক বেয়ার। অথচ, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের গাইড লিস্টে এর উল্লেখ নাই। যাক সেসব তাত্বিক কথাবার্তা।

বেশ খোশ মেজাজে এগিয়ে যাই। বুনো পথের ট্রেইল গুলোর প্রতিটাই ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে চোখে ধরা দেয়। যা কাগজে কলমে শত পৃষ্ঠা লিখেও বুঝানো দায়। প্রায় ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে যাই ভান্ডারীয়ার প্রান্তে। ঝর্ণাটির ব্যাপ্তি দেখেই বুঝা যায়, বর্ষায় এর রূপ থাকে ভয়াল। বেলা প্রায় তিনটা। সবার পেটেই কমবেশী চো-চো। তাই চটজলদি সঙ্গে নেয়া নুডলস রান্নার জন্য, গরম পানি বসিয়ে দেয়া হল। এই ফাঁকে ঝর্ণার জলাশয়ে নিজেদের পুকুর ভেবে, জলকেলিতে মেতে উঠলাম মহানন্দে। গোসল শেষে নুডলস চেটে-পুটে খেয়ে-দেয়ে ছুটলাম পাহাড় চূড়া বেয়ে, নতুন এক ট্র্যাকিং রুটের সন্ধানে। গাইডের ভাষায় গাড়ির রাস্তা। কিন্তু আমরা দেখলাম চরম এক জঙ্গলি পথ। পথ বললে ভুল হবে। হরেক কিসিমের জোঁকের রাজত্ব। অল্প সময়ের ব্যবধানেই কম-বেশী সবার দেহ রক্তে লালে লাল। ছোট্ট বেলার সেই ডায়লগটা মনে পড়ে গেলো, লালে লাল শাহজালাল। তবুও দেহের দিকে তাকানোর সুযোগ নেই। একটা জোঁক ছাড়াতে গেলে আরো কয়েকটায় জড়িয়ে ধরে। দেহে জোঁকের তেলেসমাতি নিয়েই রাত প্রায় নয়টা পর্যন্ত ট্র্যাকিং করে ফিরতে হল বাংলোতে। এবার টের পাচ্ছি কারে কয় রক্ত। বহু কষ্ট করে স্কচটেপ লাগিয়ে, রক্ত থামিয়েই শুরু হল বার-বী-কীউ। দে-ছুট ভ্রমণ সংঘ’র ভ্রমণে বার-বী-কীউ না হলে যেনো চলেই না। আজ থাক এই পর্যন্তই। আগামী কোন সংখ্যার জন্য তুলে রাখলাম, পরদিন সকালে অংশ নেয়া অ্যাডভেঞ্চা ট্রি’র গল্প।

যাবেন কিভাবেঃ ঢাকার সায়েদাবাদ হতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস যায় চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি। সেখান হতে সিএনজি’তে চড়ে হাজারীখীল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য। যাতায়াতে সবচাইতে সুবিধা হবে নিজস্ব বা রেন্টে কার বাহনে।
খাবেন-থাকবেন কোথায়ঃ হাজারীখীল ইকো ট্যুরিজমের ম্যানেজার আসিস কর্তৃক দৈনিক প্রতিজন ১০০০/=টাকার বিনিময়ে তিনবেলা খাওয়া-থাকা ও গাইড সার্ভিস মিলবে।
ভ্রমণ তথ্যঃ দলে কমপক্ষে ৭ জন সদস্য ও নিজস্ব তাঁবুতে ক্যাম্পিং করা হলে, খরচ কম হবে। যারা সারাদিনের জন্য বনের ভিতরে যাবেন, তারা তিনবেলার জন্য কন্ট্রাক্ট না করে, প্রতিবেলা মাথাপিছু ১৩০/=টাকা দিয়েও খেতে পারবেন । সঙ্গে শুকনো খাবার,পানি ও প্রয়োজনীয় ঔষধ রাখবেন। বনের গভীরে ট্রেইল/ট্র্যাকিংয়ের সময় অবশ্যই দলবদ্ধ থাকতে হবে।

লেখক: মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম, চীফ অর্গানাইজার, দে ছুট ভ্রমণ সংঘ।


Comment As:

Comment (0)