নরসিংদীতে ৩৫৫ পূজামন্ডপে দুর্গাপূজা; প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত মৃৎশিল্পিরা

মো: শাহাদাৎ হোসেন রাজু, বিনিয়োগবার্তা, নরসিংদী: বছর ঘুরে হিমালয়ের কৈলাশে স্বামী শিবের বাড়ী থেকেই উমা দেবী(দেবী দুর্গা) সুদূর পথ পাড়ি দিয়ে আসছেন তার বাপের বাড়ি। প্রতিবছর শরৎকালে দেবী দুর্গা তার চার সন্তান গণেশ, কার্ত্তিক, লী আর সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে  সমতল ভূমির এই বাংলায় বাপের বাড়ী বেড়াতে আসেন। শারদীয় দূর্গাৎসবের আর মাত্র কয়েকদিন বাকী। দেবী দুর্গার আগমনকে ঘিরে স্বনাতন ধর্মাবলম্বীরা ব্যতি-ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। নরসিংদী জেলার বিভিন্ন মন্ডপ সাজ-সজ্জ্বা চলছে, সেই সাথে প্রতিমালয়গুলোতে দেবী মূর্তি নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ, তুলি আচঁড়ে শিল্পি সত্ত্বাকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে মৃৎশিল্পিরা। মূর্তি তৈরির কাজ শেষ এখন গায়ে রঙ ছোঁয়ানোর অপোয় মৃৎশিল্পিরা।

পঞ্জিকা মতে ২৯ সেপ্টেম্বর রবিবার শারদীয় দুর্গোৎসবের পূণ্যলগ্ন, শুভ মহালয়া পিতৃপরে শেষে দেবীপরে শুরু। চন্ডীপাঠের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া। বাঙ্গালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এ হচ্ছে দুর্গা দেবীর আগমনী বার্তা। এবার দেবীদুর্গা আসছেন ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে এবং যাবেনও ঘোটকে চড়ে। এ বছর দেবী দুর্গা মুত্তলোকের বাসিন্দাদের সুবার্তা বয়ে আনছে না। ঝড়-ঝাপ্টা প্রাকৃতিক দূর্যোগেরই ঈঙ্গিত দিচ্ছে।

আগামী ৩ অক্টোবর মহাপঞ্চমীর মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মূলত মহালয়া থেকেই পূজারীরা দুর্গা মায়ের আগমন ধ্বনি শুনতে পান। আগামী ৮ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে ৬ দিনের এ ধর্মীয় উৎসব শেষ হবে। শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে নানা আয়োজনে ব্যস্ত নরসিংদীর হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে সকল ধর্মের মানুষদের মধ্যে। পূজার আনন্দে মাতোয়ারা নরসিংদীবাসী।

নরসিংদীর মন্দিরে মন্দিরে চলছে প্রতিমা সাজ-সজ্জ্বার কাজ। প্রতিমালয়গুলোতে দেবী মূর্তি নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ, তুলি আচঁড়ে শিল্পি সত্ত্বাকে ফুটিয়ে তুলে গায়ে রঙ ছোঁয়ানোর অপোয় মৃৎশিল্পিরা। আয়োজকরা ছুটছেন দর্জিপাড়ায়। মা দুর্গার লাল টুকটুকে বেনারসি শাড়ির জরির কাজ, গণেশের ধুতিতে নকশাদার পাড় বসানো আর মহিষাসুরের জমকালো পোশাক তৈরির কাজ। কেউবা ছুটছেন কামারপাড়ায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে বানিয়ে নিচ্ছেন দেবীর হাতের চক্র, গদা, তীর-ধনুক ও খড়গ-ত্রিশূল। ঘষামাজায় মিস্ত্রিরা ব্যস্ত মন্ডপগুলোকে নতুন রূপে সাজিয়ে তুলতে। ডেকোরেটর কর্মীদেরও ব্যস্ততার শেষ নেই। আয়োজকদের ফরমায়েশ আর ডিজাইন অনুযায়ী গড়ে তুলছেন দৃষ্টিনন্দন অস্থায়ী পূজামন্ডপ। চলছে সংস্কারের শেষ কাজটুকু।

এবার নরসিংদী জেলায় মোট ৩৫৫ টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। নরসিংদীর মন্ডপগুলোতে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ হলেও রং-তুলির কাজ ও সাজসজ্জ¦ার কাজ অনেকটাই বাকী। শেষ মূহুর্তে এসে রং-তুলির আচরে নিজেদের ফুটিয়ে তুলছেন মৃৎশিল্পিরা।

জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার সাহা জানান, এবছর নরসিংদী জেলায় ৩৫৫ টি মন্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে নরসিংদী পৌরসভায় ৩১টি সহ সদর উপজেলায় ৯৯টি, পলাশ উপজেলায় ৪৭টি, শিবপুর উপজেলায় ৭৪টি, মনোহরদী উপজেলায় ৪৪টি, বেলাব উপজেলায় ২৩টি এবং রায়পুরা উপজেলায় ৬৮টি মন্ডপে দেবী দুর্গার আরাধনা করবে পূজারীরা।

নরসিংদীর মৃম্ময়ী প্রতিমালয়ের স্বত্বাধিকারী প্রতিমাশিল্পী সম্ভুনাথ পাল জানান, ‘পূজা শুরুর আগেই প্রতিমা তৈরির কাজ সম্পন্ন করতে মৃৎশিল্পীরা বিরামহীনভাবে কাজ করছেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে তাদের কর্মযজ্ঞ। চাহিদামত প্রতিমাকে গড়ে তুলতে চেষ্টার কোন কমতি নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমার কারখানায় ৫ জন কারিগর নিয়ে মোট ১১ প্রতিমা তৈরি করেছি।

নরসিংদীর তুর্য্য প্রতিমা শিল্পালয়ের স্বত্বাধিকারী দুলাল পাল জানান, ‘প্রতিমা তৈরিতে মূলত মাটি, বাঁশ-খড়, দড়ি, লোহা, ধানের কুঁড়া, পাট, কাঠ, রঙ, বিভিন্ন রঙের শিট ও শাড়ি-কাপড়ের প্রয়োজন হয়। প্রতিমা গড়া শেষ হলে রংতুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় অবয়ব। প্রতিমা তৈরি করা অনেক কষ্টের। বছরের অন্যান্য সময় তেমন কাজ না থাকলেও এই সময় ব্যস্ততা বেড়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী প্রতিমা তৈরির মজুরি বাড়েনি।

বিশ্বকর্মা প্রতিমা শিল্পালয়ের সঞ্জিত পাল বলেন, প্রতিমা তৈরিতে প্রচুর কাঁচাপণ্যের প্রয়োজন হয়। তবে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ায় এবার প্রতিমা তৈরিতে খরচ কিছুটা বেড়েছে। প্রতিমা তৈরি শেষ হলে এরপর শুরু হবে যাবে সাজসজ্জার কাজ।’

বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে অজন্তা, অরিয়েন্টেল, দেবী ও স্বাম্য নামে চার প্রকারের প্রতিমা তৈরি করেন মৃৎশিল্পীরা। আয়োজকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে অজন্তা প্রতিমা।

নরসিংদী জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি প্রফেসর সূর্যকান্ত দাস জানান, ‘সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রতি বছরের মতো এবারও এ উৎসবটি জাকজমকভাবে উদযাপন করা হবে। গত বছরের চেয়ে এবার পূজামন্ডপের সংখ্যা বেশি। তাই উদযাপনটাও বেশি হবে বলে আশা করছি। এখন প্রতিমা তৈরি এবং প্যন্ডেল নির্মাণের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রশাসনের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। পূজা নির্বিঘেœ করতে প্রশাসন থেকে আমরা সার্বিক সহযোগিতা পাবার আশ্বাস পেয়েছি।’

এদিকে নরসিংদী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ডপের সৌন্দর্য্য ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার উপর ভিত্তি করে পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন। পাশাপাশি আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে রাখতে পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছেন।

(এসএইচআর/এসএএম/ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯)


Comment As:

Comment (0)