‘ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ণ নিরুৎসাহিত করতে আইনী কাঠামো তৈরি করতে হবে’

পুঁজিবাজারকে জনপ্রিয় করতে এবং এ বাজারের ব্যাপ্তি বাড়াতে ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ণ নিরুৎসাহিত করতে হবে বলে মনে করেন পুঁজিবাজারের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংক এএফসি ক্যাপিটাল লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাহবুব এইচ মজুমদার। এজন্য প্রয়োজনে আইনী কাঠামো তৈরি করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।

মাহবুব এইচ মজুমদার বলেন, দীর্ঘমেয়াদে ঋণ সরবরাহ করে ব্যাংকগুলো নিজেদের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। একইসঙ্গে উচ্চ সুদে যারা ঋণ নিচ্ছে তাদেরকেও বিরাট  চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিচ্ছে। এতে শিল্পায়ণ বা উন্নয়ণ কর্মকান্ড বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ব্যাংক শর্ট টার্ম ফাইন্যান্সিং করবে, মিড টার্ম ফাইন্যান্সিং করবে। কিন্তু শিল্পায়ণের মূল টাকা আসতে হবে পুঁজিবাজার থেকে।

বিনিয়োগবার্তার সঙ্গে একান্ত আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি।

“পৃথিবীর কোন শেয়ারবাজারে দর কমে গেলে মিছিল-মিটিং হয় না। কিন্তু এদেশে তাই হচ্ছে। ১৫-২০ জন মিছিল মিটিং করে পুরো ৩০ লক্ষ বিনিয়োগকারীর ক্ষতি করছে। এতে বাজারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।”

মাহবুব এইচ মজুমদার বলেন, বিগত ৮/৯ বছরে প্রায় ৭৮টি আইন প্রনয়ণ ও পুরোনো আইনের সংস্কার করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আরো কিছু সংস্কার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে কতগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন এসেছে এবং কতগুলো মাইনর সংশোধন। পৃথিবীর কোনো ক্যাপিটাল মার্কেটে এতো অল্প সময়ে এতোগুলো সংস্কার হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ক্যাপিটাল মার্কেটে বিনিয়োগকারী ও ইস্যুয়ারদের পুঁজির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এসব করা হয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের ইন্টারমিডিয়ারিদেরকে সুশৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্যও এই সংশোধন করা হয়েছে।

বিএসইসি দেশব্যাপি বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিনিয়োগ শিক্ষাগুলোতে কমিশন ও ইন্টারমিডিয়েটসরা এসব আইন-কানুনগুলো সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদেরকে শিক্ষিত ও সচেতন করছে। পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। এছাড়া আইন প্রনয়ণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারের সব অংশীজনদেরও একটি শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে পেরেছে কমিশন। এখন চাইলেই পুঁজিবাজারে কেউ কোনো ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। এসব কাজের মাধ্যমে বিএসইসি রাষ্ট্রের নীতি নিধরিণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়েছে যে- পুঁজিবাজার ছাড়া দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ণ সম্ভব নয়।

আমাদের দেশের কালচার হলো- সরকারি প্রজেক্টগুলো খুব ব্যয়বহুল হয় এবং সময়মতো সেটি শেষ করা যায় না। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে যে কাজগুলো করা হয় সেগুলো খুব দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয় এবং ব্যয় কম হয়। সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ণ করতে পুঁজিবাজারকে অন্যতম প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ব্যাংকও এর সঙ্গে থাকবে। তবে ব্যাংক থাকবে শর্ট টার্ম ফাইন্যান্সিংয়ের জন্য। তবে এই শর্ট টার্ম ফাইন্যান্সিংয়ের জন্যও যে আইন কানুন করা দরকার সেটির কিন্তু ঘাটতি রয়ে গেছে। পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াতে হলে ব্যাংকগুলো যেন দীর্ঘমেয়াদে পুঁজি সরবরাহ না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে আইনি কাঠামো তৈরি করে হলেও ব্যাংকগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ণ থেকে বিরত রাখতে হবে। বিগত দিনের আইন-কানুনগুলোতে এই জায়গাটিতে হাত দেওয়া হয়নি।

“পুঁজিবাজারে যে ধরনের করপোরেট গভর্ন্যান্স ও অন্যান্য যেসব আইন কানুনগুলো রয়েছে তা দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সকে সুরক্ষা করতে পারে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি থাকবে, কিছু উদ্যোক্তা থাকবে, যারা পুঁজিবাজারকে অপব্যবহার করতে পারে। তাই বলে অবাস্তব আইন করে ভালো উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না।”

ভারতে বিগত অর্থবছরে ২৫% মূলধন এসেছে ক্যাপিটাল মার্কেট থেকে। অনান্য প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমানে পুঁজির সরবরাহ করা হয়। কিন্তু আমাদের এখানে এটি মাত্র ২ শতাংশ। এখানে পুঁজিবাজারের বদলে ব্যাংক লংটার্ম ফাইন্যান্সিংয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক যেন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন না করে সেজন্য অর্থমন্ত্রনালয় বা সরকারকে আইন করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো- আমাদের পুঁজিবাজারের কি সেই সক্ষমতা আছে? আমি বলবো একদম সক্ষম। কারণ, আমাদের পুঁজিবাজারে দেখা যায় একটি আইপিও’র জন্য প্রায় ৪০-৫০ গুন বেশি আবেদন জমা পড়ে। তার মানে ব্যাপক সক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারের কাঠামোটা এরকম যে এখানে যে ধরনের করপোরেট গভর্ন্যান্স ও অন্যান্য যেসব আইন কানুনগুলো রয়েছে তা দীর্ঘমেয়াদি ফাইন্যান্সকে সুরক্ষা করতে পারে। এর মধ্যে কিছু কোম্পানি থাকবে কিছু উদ্যোক্তা থাকবে যারা পুঁজিবাজারকে অপব্যবহার করতে পারে। তাই বলে অবাস্তব আইন করে ভালো উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা যাবে না। যেমন- ২%-৩০% শেয়ার ধারণের যে আইন রয়েছে, অনেক পরিচালক সেই আইন পরিপালন করছেন না। তাদেরকে কিন্তু শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। যদি তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনা না যায় তাহলে বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থাহীনতা তৈরি করবে। আর এ জন্যই বাইব্যাক আইনের প্রয়োজন রয়েছে। বাইব্যাক আইন যেহেতু আমাদের এখানে নেই তাই প্রয়োজনে আইন প্রনয়ণ করে তাদেরকে এই শাস্তি দিতে হবে। যারা যে পরিমাণ শেয়ার বিক্রি করেছে আইন হওয়ার পর তাদেরকে সেই পরিমাণ কিনে নিতে হবে। প্রয়োজনে শান্তি বা এনফোর্স করে শেয়ার কেনাতে হবে। কিন্তু আমাদের মার্কেটে এখনো এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। যদি এটি হতো তাহলে কিন্তু মার্কেটে আস্থা ফিরতো এবং সকলেরই শিক্ষা হতো যে মার্কেটে অন্যায় করে পার পাওয়া যায় না।

“বিশ্বব্যাপী যে বাইব্যাক আইন রয়েছে সেটি হচ্ছে-কোম্পানি তার নিজের শেয়ার নিজে কিনে নেয়। এটা মার্কেটকে স্থিতিশীল করার জন্য কিংবা শেয়ারহোল্ডারদের বেনেফিসিয়ারি করানোর জন্য অথবা কোম্পানির ডিভিডেন্ডের চাপ কমানোর জন্য। কিন্তু আমাদের কোম্পানি আইনে এটা নেই।”

বিশ্বব্যাপী যে বাইব্যাক আইন রয়েছে সেটি হচ্ছে-কোম্পানি তার নিজের শেয়ার নিজে কিনে নেয়। এটা মার্কেটকে স্থিতিশীল করার জন্য কিংবা শেয়ারহোল্ডারদের বেনেফিসিয়ারি করানোর জন্য অথবা কোম্পানির ডিভিডেন্ডের চাপ কমানোর জন্য।
আমেরিকাতে বাইব্যাককে ট্রেজারি স্টক (Treasury Stock) বলা হয়। ঐখানে ২০% ট্রেজারি স্টক (Treasury Stock)) কেনার আইন রয়েছে। কিন্তু আমাদের কোম্পানি আইনে এটা নেই। এই বাইব্যাক আইন করবে অর্থ মন্ত্রনালয়। এটা বিএসইসি, ডিএসই বা স্টক মার্কেটে সম্পৃক্ত কারো কাজ নয়। বাইব্যাক আইন চালু থাকলে কোম্পানির বিদ্যমান শেয়ার সংখ্যা কমে যায়, ইপিএস বেড়ে যায় এবং ডিভিডেন্ডের চাপ কমে যায়। পরবর্তীতে কোম্পানির যদি টাকার প্রয়োজন হয় তখন হাতে থাকা শেয়ার আবার বিক্রি করে দেয়। এটি আমেরিকার মতো উন্নত বিশ্বে রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে নেই। আমাদের দেশে অধিকাংশ বিনিয়োগকারীদের ধারণা যে বাইব্যাক মানে ডিরেক্টররা শেয়ার কিনে নেবে। এরকম আইন পৃথিবীর কোথাও নেই। বাইব্যাক আইন দরকার তবে সেটি হতে হবে আন্তর্জাতিক মানের।

আরেকটি বিষয় হলো দেশের সব কোম্পানি কি লাভ করে? একটি কোম্পানি ব্যবসা করতে এসেছে, দেখা গেছে আইনি জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে ব্যবসা করতে পারে নাই। এটি লিস্টেড বা ননলিস্টেড সব কোম্পানির ক্ষেত্রেই হতে পারে। সেজন্য জোরপূর্বকতো তাকে শেয়ার কিনতে বাধ্য করা যাবে না। আমাদের এখানকার মানুষের ধারণা শেয়ারদর ফেসভ্যালুর নীচে নেমে গেলেই তাকে বাইব্যাক করাতে হবে। এটি কোনো আইনে নাই। কোম্পানির ব্যবসা ভালো হলো লাভ নেবেন আর লোকসান হলে পরিচালকদের শেয়ার কিনে নিতে বাধ্য করবেন-এটিতো হতে পারে না। বিশ্বব্যাপি বাইব্যাক হলো একটি অত্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড আইন। এখানে দেখতে হবে কোনো অপব্যবহার বা মিসইউজ হয়েছে কিনা। আইন-কানুন সে ঠিকমতো পালন করছে কিনা, করপোরেট গভর্ন্যান্স ঠিকমতো পালন করছে কিনা, স্বাধীন পরিচালকের যে দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল সেগুলো পালন করেছে কিনা সেগুলো দেখতে হবে। কিন্তু ব্যবসায়তো কোন কোম্পানি লাভ করবে কোনটি লস করবে সেটাই স্বাভাবিক।

“পৃথিবীর কোথাও প্লেসমেন্ট শেয়ারে ১২ মাসের বেশি লকইন নাই। সব জায়গায় ৩ মাস, ৬ মাস, ৯ মাস, ১২ মাস লকইন কার্যকরি। অথচ, আমাদের এখানে দুই বছরের লকইন দেওয়া হয়েছে। আজ হোক কাল হোক এই আইন আবার পরিবর্তন হবে বলে আমার বিশ্বাস।”

এ কারণে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে বলা হচ্ছে যারা এ শেয়ারমার্কেট সম্পর্কে জানেন না তারা এখানে আসবেন না। এ মার্কেটে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ বারবার বলা হচ্ছে তারপরেও কেন না জেনে এই মার্কেটে আসছে। পৃথিবীর কোন শেয়ারবাজারে দর কমে গেলে মিছিল-মিটিং হয় না। কিন্তু এদেশে তাই হচ্ছে। ১৫-২০ জন মিছিল মিটিং করে পুরো ৩০ লক্ষ বিনিয়োগকারীর ক্ষতি করছে। এতে বাজারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে। বিশ্ববাজারে আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।

বিগত ৯ বছরে যে আইন-কানুনগুলো হয়েছে, এগুলো কিন্তু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যথেস্ট। কোনো কোম্পানি আইনগুলো যথাযতভাবে পরিপালন করছে কিনা, কর্পোরেট গভর্ন্যান্স পরিপালন করেছে কিনা কিংবা অনান্য অংশীজনরা কোনো জায়গায় আইনের বায়োলেশন করেছে কিনা- সেসব বিষয়ে দৃষ্টিপাত দিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদেও সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। এজন্য বিনিয়োগকারীদের সচেতন হতে হবে। বিনিয়োগ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হবে।

পুঁজিবাজারে উত্থান-পতন থাকবে- এটাই পুঁজিবাজারে মূল বৈশিষ্ট্য। এজন্য আন্দোলন করে লাভ নেই। বরং ভুলগুলো খুঁজে বের করে সংশোধনের সুযোগ করে দিতে হবে। আর এ ভুল ইচ্ছাকৃত হলে তার জন্য উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।

আরও একটি বিষয় বলতেই হয় যে, আইপিও বন্ধ করে দিয়ে কখনোই মার্কেট বড় করা যায় না। এতে পৃথিবীতে আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। যাচাই-বাছাই করে ভাল কোম্পানির আইপিও অধিকহারে দিতে হবে। আইপিও’র সংখ্যা বেশি হলে বিনিয়োগকারীদের পছন্দ করার উপায় থাকে, সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিনিয়োগকারীরা কোম্পানির স্পন্সর ডিরেক্টরদের তথ্য নিতে পারে, কোম্পানির ব্যবসা কি, রিস্ক কি, ডিসক্লোজার ঠিকমতো আছে কিনা সেগুলো সম্পর্কে বিশ্লেষণ করতে পারে। আমাদের দেশে ডিসক্লোজার ব্যাসিসে আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। এর অর্থ হলো-সমস্ত তথ্য ডাটাগুলো ডিসক্লোজ করা হয়েছে কিনা- এটাই হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল কাজ।

“পুঁজিবাজারকে মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌছাতে সকল দায়িত্বশীল পক্ষেরই আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারকে সরকারের জায়গায়, কমিশনকে নিয়ন্ত্রন ও পর্যবেক্ষনের জায়গায়, একইসঙ্গে অংশীজন ও বিনিয়োগকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”

বিএমবিএর এই নেতা বলেন, পৃথিবীর কোথাও প্লেসমেন্ট শেয়ারে ১২ মাসের বেশি লকইন নাই। সব জায়গায় ৩ মাস, ৬ মাস, ৯ মাস, ১২ মাস লকইন কার্যকরি। অথচ, আমাদের এখানে দুই বছরের লকইন দেওয়াহয়েছে। লকইন দিয়েতো শেয়ার সাপ্লাই বাড়ানো যায় না, এতে ভলিউম কমে যাবে। যত বেশি লকইন হবে, তত লেনদেন কম হবে। আর লকইন যত কম হবে ট্রানজেকশন ভলিউম তত বাড়বে। যদি লকইন বেশি দিয়ে শেয়ার লেনদেন কমিয়ে দেয় তাহলে ব্রোকাররা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি করবে। লকইন বেশি হলেই ১০ টাকার শেয়ার ৭০-৮০ টাকায় চলে যায়। যদি প্রথম দিন থেকেই লকইন ফ্রি থাকতো তাহলে ভলিউম বেশি হতো, এতে শেয়ারদর এতো বাড়তি হতো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে লকইন ১২ মাসের বেশি দেওয়ার পক্ষে নই। আজ হোক কাল হোক এই আইন আবার পরিবর্তন হবে বলে আমার বিশ্বাস।

আর ৩০ কোটি ও ৫০ কোটি টাকার আইপিও’র যে আইনটি করা হয়েছে, সেটি মোটামুটি আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ঠিক আছে। কারণ, আমাদের অর্থনীতি বড় হয়েছে, এখানে বড় বড় কোম্পানি আসবে। যদি ছোটো কোম্পানি হয় তাহলে এটি নিয়ে ম্যানিপুলেশন করার সুযোগ থাকে। অল্প টাকা দিয়ে যেকোন একটি গ্রুপ এটিকে ম্যানপুলেট করতে পারে। কিন্তু ভলিউম যদি বেশি থাকে সেক্ষেত্রে এটিকে ম্যানিপুলেট করা সম্ভব হয় না। আর ছোট ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য স্মল ক্যাপিটাল প্লাটফর্ম নামে নতুন যে আলাদা ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে-তাও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানিগুলো প্রান ফিরে পাবে। আর শিল্পেরও বিকাশ ঘটবে।

মনে রাখতে হবে ক্যাপিটাল মার্কেট একটি ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা। এখানে ভালো কোম্পানি, মিডিয়াম, খারাপ সব ধরণের কোম্পানি আসবে। ১৫/২০টা ভালো কোম্পানির সঙ্গে ২/১টি খারাপ কোম্পানি আসতেই পারে। সেজন্য আইপিও একেবারে বন্ধ করে রেখে দেওয়ার কোন যৌক্তিকতা নাই। ভাল কোম্পানির আইপিও আসলে বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হন। আর বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হলে তাদের বিনিয়োগ বাড়ে। আর বিনিয়োগ বাড়লে বাজারের ব্যাপ্তিও বাড়ে। তাই অধিকহারে ভাল কোম্পানির আইপিও দিতে হবে।

“ক্যাপিটাল মার্কেটের মূল উদ্দেশ্য হলো শিল্প ও ব্যবসা-বানিজ্যে দীর্ঘমেয়াদী পুঁজির ব্যবস্থা করা। এছাড়া অনান্য সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পগুলোতে কিংবা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদী অর্থের যোগান দেওয়া। এসবের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে নতুন নতুন ইনভেস্টমেন্ট টুলস যুক্ত করতে হবে।”

একটি কথা আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্যাপিটাল মার্কেটের মূল উদ্দেশ্য হলো শিল্প ও ব্যবসা-বানিজ্যে দীর্ঘমেয়াদী পুঁজির ব্যবস্থা করা। এছাড়া অনান্য সরকারি-বেসরকারি প্রকল্পগুলোতে কিংবা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদী অর্থের যোগান দেওয়া। এসবের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে নতুন নতুন ইনভেস্টমেন্ট টুলস যুক্ত করতে হবে। এসবের ক্ষেত্রে কিছুই আমাদের এখানে হচ্ছে না। বহুজাতিক বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো আসছে না, বড় শিল্পগ্রুপগুলো এখানে যথাযত পার্টিসিপেট করছে না। এসবের জন্য দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। মুখে মুখে বলা হচ্ছে বাজার বড় করা হবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অথচ, এসব কোম্পানিগুলো বাজারে আসলে আমাদের দৈনিক ট্রেড চার-পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারতো। বাজারের সাইজ বড় হতো।

তাই আমি বলতে চাই, পুঁজিবাজারকে যদি মানুষের আস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌছাতে হয়, তাহলে সকল দায়িত্বশীল পক্ষেরই আচরণগত পরিবর্তন আনতে হবে। সরকারকে সরকারের জায়গায়, কমিশনকে নিয়ন্ত্রন ও পর্যবেক্ষনের জায়গায়, অংশীজনদের তাদের রুল প্লে, একইসঙ্গে বিনিয়োগকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

(এসএএম/ ০৬ অক্টোবর ২০১৯)

 


Comment As:

Comment (0)