চীনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকরা
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: করোনাভাইরাসের সংক্রমণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় চীনের দিকে তাকিয়ে আছেন বৈশ্বিক নীতিনির্ধারকরা। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা ও নীতির বিষয়ে দেশটির পরবর্তী পদক্ষেপের মুখাপেক্ষী হয়ে রয়েছে বিশ্বের বহু কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও দেশ। এমনকি সৌদি আরবের রিয়াদে আসন্ন জি টোয়েন্টি সামিটেও নভেল করোনাভাইরাসের কারণে চলমান অর্থনৈতিক সংকট নিয়েই বেশি আলোচনা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। সামিটে অংশ নেবেন বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা গত শুক্রবার বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে রক্ষায় সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও আরো ভালো পদক্ষেপ প্রয়োজন। তবে এসব পদক্ষেপের অনেক কিছুই নির্ভর করছে চীনের গৃহীত নানা সিদ্ধান্তের ওপর। যার মধ্যে রয়েছে স্বল্পমেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঋণের সুদহার আরো কমানো, অধিকতর ক্ষতিগ্রস্ত খাতে শুল্ক রহিতকরণ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আরো অর্থছাড়ের মতো পদক্ষেপ। তবে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত যেন কোনো কিছুই না করা হয় বর্তমানে সে বিষয়েও বেশি জোর দিতে হবে।
চীনের কারখানাগুলো বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বহুদিন ধরে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে হুবেই প্রদেশে। প্রদেশটির অর্থনৈতিক আকার সুইডেনের সমতুল্য। ফলে স্বাভাবিকভাবেই চীনের উৎপাদন খাত ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও। এ অবস্থায় দেশটির সার্বিক অর্থনৈতিক চেহারা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা আরো জটিল হয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য, নতুন করে চীনের চলতি বছরের প্রকৃত জিডিপির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এর আগে এ পূর্বাভাস ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রকৃত জিডিপি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ হলে তা হবে গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এইচএসবিসি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নভেল করোনাভাইরাসের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এশিয়ার পর্যটন শিল্পে। বহুলাংশেই এ শিল্পের আয় কমে যাবে। তাছাড়া চীনে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বৈশ্বিকভাবেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ইলেকট্রনিকস শিল্পে। ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের টম অরলিকের বিশ্লেষণ বলছে, নভেল করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, হংকং ও থাইল্যান্ডের ওপর। এছাড়া ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, জার্মানি ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশ।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ভাইরাসের সংক্রমণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে প্রভাব পড়লেও তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। এমনকি তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদকে এক টেলিফোন কথোপকথনে জানিয়েছেন, শিগগিরই ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব হবে।
তবে একটি বিষয় চীনকে বেশ চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সরবরাহ খাতে ঘাটতির কারণে দেশটির পণ্য উৎপাদন ও বিতরণ প্রায় থমকে আছে। এ অবস্থায় নিম্ন সুদহার ও উচ্চ সরকারি ব্যয়ের মতো প্রথাগত প্রণোদনা উদ্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ অলিবার ব্ল্যানচার্ড বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সংকটে পড়া অর্থনীতিকে দ্রুত পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হবে না বলেই মনে হচ্ছে। তার মতে, চীনের এ সংকটের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ প্রবাহে ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে।
এদিকে পরিস্থিতি সামলাতে এশিয়াজুড়ে নানা পদক্ষেপ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বিভিন্ন দেশের সরকার। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উপদেষ্টা কোইচি হামাদা বলেন, ভাইরাসের সংক্রমণজনিত পরিস্থিতির অবনতি হলে আরো আর্থিক প্রণোদনার প্রয়োজন হবে।
আইএমএফের জর্জিয়েভা ও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোমি পাওয়েলের মতো নীতিনির্ধারকরা বলছেন, তারা নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি খুব সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় এরই মধ্যে প্রধান সুদহার কমিয়েছে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন। ফলে বর্তমানে ভাইরাসের সংক্রমণ ও তা রোধে চীনের গৃহীত পদক্ষেপের ওপর সতর্ক নজর রাখা ছাড়া নীতিনির্ধারকদের উপায় নেই। ব্লুমবার্গ অবলম্বনে
(এস আর /১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০)



