কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে ইউরোপের বৃহৎ গাড়ি নির্মাতারা
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: আগে থেকেই টানা তৃতীয় বছরের মতো বিক্রি পতনের দিকে এগোচ্ছিল ইউরোপের গাড়ি শিল্প। তার ওপর করোনাভাইরাসের সংক্রমণ খাতটিকে অভাবনীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে ইউরোপের সবচেয়ে বড় তিনটি গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি।
এরই মধ্যে ফিয়াট ক্রাইসলার, পিএসএ গ্রুপ ও রেনোঁ গত সোমবার ইউরোপজুড়ে তাদের ৩৫টি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। ভ্রমণ ও জনজীবনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটে তারা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। কোম্পানি তিনটি গত বছর গাড়ি বিক্রি করেছে সর্বোচ্চ ১ কোটি ২০ লাখ। উৎপাদন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি চাহিদা কমে যাওয়ায় এ বছরও তারা খুব বেশি গাড়ি বিক্রি করতে পারবে না বলেই মনে হচ্ছে, যার প্রভাব পড়বে অঞ্চলটির অর্থনীতিতে। কারণ ইউরোপের ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গাড়ি খাত। ইউরোপিয়ান অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, এ খাতের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের।
ইতালিয়ান-আমেরিকান গাড়ি নির্মাতা ফিয়াট ক্রাইসলার সোমবার এক বিবৃতিতে জানায়, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা ইউরোপে তাদের অধিকাংশ কারখানায় সব ধরনের কার্যক্রম ২৭ মার্চ পর্যন্ত বন্ধ রাখবে। এর মধ্যে ইতালিতে বন্ধ থাকবে ছয়টি কারখানা। পাশাপাশি সার্বিয়া ও পোল্যান্ডেও কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
ফিয়াট ক্রাইসলারের এ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাতটি দেশে ১৫টি কারখানা বন্ধের ঘোষণা দেয় পিএসএ গ্রুপ। ফিয়াটের সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা গাড়ি নির্মাতা কোম্পানিটি জানায়, তারা ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যসহ সাতটি দেশে তাদের কারখানায় মার্চের শেষ পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখবে। মূলত ইউরোপে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি, সরবরাহপ্রবাহে বাধা এবং হঠাৎ করেই গাড়ির চাহিদায় পতনের কারণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফরাসি কোম্পানিটি।
এরপর সোমবারই কারখানা বন্ধের বিষয়ে বিবৃতি দেয় রেনোঁ। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ফ্রান্সের ১২টি কারখানায় তারা উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত রাখবে। কভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে কর্মীদের সুরক্ষা এবং রোগটি নিয়ন্ত্রণে ফরাসি সরকারের নেয়া পদক্ষেপের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে পুনরায় কবে কারখানাগুলো চালু করা হবে, সে বিষয়ে কিছু জানায়নি রেনোঁ কর্তৃপক্ষ।
এদিকে কারখানা বন্ধের ঘোষণার পরপরই মিলানে ফিয়াট ক্রাইসলারের শেয়ারদরে পতন হয়েছে ১৯ শতাংশের মতো। পিএসএ গ্রুপের এ পতনের হার গিয়ে দাঁড়ায় ১৫ শতাংশে। অন্যদিকে রেনোঁর শেয়ারদরে পতন হয় ১২ শতাংশেরও বেশি।
শুধু এ তিনটিই নয়, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে ইউরোপের বিলাসবহুল গাড়ির ব্র্যান্ডগুলোও। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ফিয়াট ক্রাইসলারের ব্র্যান্ড মাসেরাতির ওপর। এর আগে রোববার ফেরারি জানিয়েছিল, তারা ইতালিতে সাময়িকভাবে দুটি কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। কারণ যন্ত্রাংশের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় তারা উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে না। আর ইউরোপজুড়ে গাড়ি কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক গাড়ি শিল্পে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ সংক্রমণের কারণে এরই মধ্যে চীনে গাড়ি কারখানা বন্ধ রাখার সময়সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপক হারে কমে গেছে বিক্রি।
ইউরোপে কভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ইতালি। এ অবস্থায় সংক্রমণ প্রতিরোধে নেয়া পদক্ষেপগুলো আগে থেকেই দুর্বল হয়ে পড়া দেশটির অর্থনীতিকে আরো গভীর মন্দার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তীব্র সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ইতালির হোটেল, পর্যটন কোম্পানি, রেস্তোরাঁ এবং অন্য ব্যবসায় খাত। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে ইতালির মতোই কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে জার্মানি ও ফ্রান্স, যা পুরো ইউরো অঞ্চলকে অবধারিত মন্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: সিএনএন বিজনেস
(এসআর/ ১৮ মার্চ, ২০২০)



