ট্রাম্পের অপসারণ, অভিশংসন অথবা পদত্যাগ

বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টকে দেশের আইনপ্রণেতারা, এমনকি তাঁর নিজের দলের নেতারা, অবিলম্বে পদত্যাগ করতে বলছেন এমন পরিস্থিতি বিরল। তদুপরি মন্ত্রিসভাকে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে নিতে বলা হচ্ছে, এমন ঘটনা অভূতপূর্ব। কিন্তু শুক্রবার ওয়াশিংটনের আলোচনার মুখ্য বিষয় ছিল এটাই।

ক্যাপিটল ভবনে সমর্থকদের হামলার কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে এমনকি রিপাবলিকান দলের সিনেটর লিসা মারকাওয়াস্কি এবং প্রতিনিধি সভার সদস্য অ্যাডাম কিনজিঙ্গার বলেছেন, তাঁরা চান ট্রাম্প এখনই বিদায় নিন। তাঁদের সঙ্গে একমত পোষণ করেন এমন অনেকেই আছেন যাঁরা এখনো মুখ খোলেননি।

অ্যাডাম কিনজিঙ্গার স্পষ্ট করেই বলেছেন, ট্রাম্প পদত্যাগ না করলে সংবিধানের ২৫তম সংশোধনীর আওতায় তাঁকে অপসারণ করা হোক। এই সংশোধনী যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানোর ব্যবস্থা রেখেছে, তার সূচনা করতে হবে মন্ত্রিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকে। এরপর তাতে ভাইস প্রেসিডেন্টের সম্মতি দরকার হবে। এখনো তার কোনো লক্ষণ নেই। তদুপরি এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ আর মাত্র ১০ দিন।

একই পরিস্থিতি প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত (ইমপিচ) করার ক্ষেত্রেও। সোমবার, ১১ জানুয়ারি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিনিধি পরিষদের সভায় অভিশংসনের প্রস্তাব তোলার সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি কার্যত এই সপ্তাহ সময় দিচ্ছেন, যেন ট্রাম্প পদত্যাগ করেন। পেলোসি চাইছেন, রিপাবলিকান দলের নেতারা অভিশংসন প্রস্তাবে ভোট দেওয়ার পরিস্থিতি এড়াতে ট্রাম্পকে পদত্যাগে বাধ্য করুক। বিব্রতকর এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর এই সিদ্ধান্তের চেয়ে রিপাবলিকানরা বরং চাইবেন, ট্রাম্প স্বেচ্ছায় চলে যান।

৫০ বছর আগে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কারণে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন যখন অভিশংসনের মুখোমুখি, সে সময় রিপাবলিকান দলের কেউ কেউ তাঁকে বলেছিলেন, অপমান এড়ানোর উপায় হচ্ছে পদত্যাগ করা। নিক্সন প্রথমে তাতে রাজি না থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের এটিই একমাত্র ঘটনা।

কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন—সময়স্বল্পতা ও ট্রাম্পের আচরণের কারণে। গত বুধবারের পরে অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে ট্রাম্পকে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়ার মতো কোনো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি তাঁর কাছে নেই। যদিও গত চার বছরে দেখা গেছে, ট্রাম্প কারও পরামর্শ গ্রহণ করেন না, তবু তাঁকে বলার মতো কিছু লোক ছিলেন। এখন মন্ত্রিসভার কিছু সদস্য এবং হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের পদত্যাগের কারণে প্রেসিডেন্ট কার্যত একা। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের সঙ্গেও যোগাযোগ আছে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ আছে।

ডেমোক্র্যাটরা জানেন যে অভিশংসন বা ২৫তম সংশোধনীর আওতায় অপসারণের সম্ভাবনা প্রায় নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাঁরা এই দুই বিষয়কেই সামনে এনেছেন, যাতে করে ট্রাম্পের ওপরে পদত্যাগের চাপ তৈরি হয়।

প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ট্রাম্পের এই মুহূর্তে সরে যাওয়ার দাবির প্রেক্ষাপট গত বুধবার কংগ্রেস ভবনে সন্ত্রাসী হামলা। এতে প্রত্যক্ষ উসকানি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে এটি তাঁকে শাস্তি দেওয়ার একটি কারণ; একমাত্র বা প্রধান কারণ নয়। প্রধান কারণ, বেপরোয়া ও মানসিকভাবে অস্থির ট্রাম্প এখন যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেন, এই ভয়।

সবচেয়ে বড় ভয় হচ্ছে, তিনি দেশের বাইরে এমন কিছু করতে পারেন, যাতে করে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক আছে, এমন দেশের ওপর ট্রাম্প পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন, এমন ভয়ও আছে। এ কারণে স্পিকার পেলোসি শীর্ষস্থানীয় জেনারেলদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

উল্লেখ্য, জাতীয় নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্র বিষয়ে প্রেসিডেন্ট জরুরি ভিত্তিতে যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপ নিতে পারেন। নতুন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তাই নিছক কল্পনা বলে বাতিল করে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ, ট্রাম্পের আচরণ এখন কারও কাছেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

ফলে ডেমোক্র্যাটরা এখন প্রেসিডেন্টের ওপর চাপ তৈরি করে তাঁকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেষ্টা করছেন। তাঁরা এতে সফল হবেন, নাকি এই চাপ প্রেসিডেন্টকে আরও বেপরোয়া করে তুলবে, সেটা নিয়েও চিন্তা আছে। চাপের ফলে ট্রাম্প-সমর্থকেরা আরও বেশি ক্ষুব্ধ হতে পারেন, তেমন আশঙ্কা আছে।

অন্যদিকে এ–ও মনে করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেয়াদ শেষ হওয়ার এক দিন আগে পদত্যাগ করতে পারেন, যাতে করে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স দায়িত্ব নিয়েই ট্রাম্পকে ক্ষমা প্রদর্শন করেন। আগে অনুমান করা হচ্ছিল, ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প সম্ভবত নিজেকে ক্ষমা ঘোষণা করে ক্ষমতা ত্যাগ করবেন।

প্রেসিডেন্ট নিজেকে ক্ষমা করতে পারেন কি না, সে বিষয়ে সংবিধানে সুস্পষ্ট কোনো বিধান নেই। এতে করে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে গড়াবে বলে মনে করা হচ্ছিল। এত দিন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে বাইডেন প্রশাসন ফেডারেল পর্যায়ে কোনো মামলা করবে না বলে মনে করা হচ্ছিল, যে কারণে ট্রাম্প নিজেকে ক্ষমার বিষয়টি সম্ভবত বিবেচনা থেকে বাদ দিয়েছিলেন।

কিন্তু ক্যাপিটল ভবনে হামলার আগে গত বুধবারের সমাবেশে ট্রাম্পের ভাষণ বিদ্রোহ ও সহিংসতায় উসকানি দিয়েছে কি না, এখন আইন মন্ত্রণালয় তা বিবেচনা করছে বলে খবর বেরিয়েছে। যদিও আইন মন্ত্রণালয় সেটি স্বীকার করেনি। ডেমোক্র্যাটরা এরই মধ্যে আইন মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে তদন্ত করতে আহ্বান জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অপসারণ, অভিশংসন বা পদত্যাগ—এই তিন বিকল্পের মধ্যে ট্রাম্পকে আটকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে ট্রাম্প আরও বড় ধরনের কোনো বিপদ না ঘটান।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

(ডিএফই/১০ জানুয়ারি, ২০২১)


Comment As:

Comment (0)