যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে ২৫ হাজার কোটি ডলারের ব্যবসায়িক চুক্তি
বিনিয়োগবার্তা ডেস্ক, ঢাকা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরে দেশ দুটির মধ্যে ২৫ হাজার কোটি ডলারের ব্যবসায়িক চুক্তি সই হয়েছে। এ তালিকায় চীনের সয়াবিন, উড়োজাহাজ আমদানি থেকে শুরু করে আলাস্কা থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রফতানি চুক্তিগুলো রয়েছে। বিপুল অংকের চুক্তি সই হলেও চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয়টি পুনরায় উত্থাপনে পিছপা হননি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অবশ্য এক্ষেত্রে চীনের কোনো দোষ নেই বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। খবর এএফপি, বিবিসি ও রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘একপক্ষীয় ও অন্যায্য’ বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সমালোচনা করলেও তিনি এক্ষেত্রে চীনকে নির্দোষ মনে করছেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘আমি চীনকে দোষারোপ করছি না।’ চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ‘নিজেদের নাগরিকের দোহাই দিয়ে কোনো দেশ যদি অন্য দেশের থেকে সুবিধা গ্রহণ করে, তাহলে তাকে কে দোষারোপ করবে?’ এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘কীভাবে এ অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য ঘাটতি সহ্য ও বেড়ে ওঠা মেনে নেয়া হলো?’
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বেশ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগুচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত ব্যবসার চর্চা নিয়ে এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে দেশটি। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণা থেকেই চীনের ভুল বাণিজ্য চর্চার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। তবে দায়িত্বগ্রহণের পর তিনি বেইজিংকে আর ‘কারেন্সি ম্যানিপুলেটর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেননি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে কিছু ‘বৈসাদৃশ্য’ থাকার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তা সত্ত্বেও চীনের উদ্যোগে নির্মাণাধীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পে আরো বেশি মার্কিন কোম্পানিকে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি। ইউরোএশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সংযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে।
চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে কিছু কিছু চুক্তির কথা এখন পর্যন্ত উল্লেখ না করায় মোট কতগুলো চুক্তি সই হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শেষে চীনা বাণিজ্যমন্ত্রী ঝং শান প্রশংসা করে বলেন, ‘সত্যিকার অর্থেই এটি অলৌকিক ঘটনার মতো। এটি শুধু চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে নয়, গোটা বিশ্বের ইতিহাসের জন্যই অবাক করার মতো ঘটনা।’
চীন-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি জেনারেল ইলেকট্রিকের (জিই) সঙ্গে ৩৫০ কোটি ডলার এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জায়ান্ট উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি বোয়িংয়ের সঙ্গে ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের চুক্তিটি শীর্ষে অবস্থান করছে।
চীনের সঙ্গে আকাশসেবা ও ইঞ্জিনসংশ্লিষ্ট তিনটি চুক্তি সই করেছে জিই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতিতে দুপক্ষের মধ্যে এ চুক্তিটি সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে জুনেয়ো এয়ারলাইনস কোম্পানির একটি ইঞ্জিন ক্রয় ও জিইএনএক্স-১বি ইঞ্জিন সারাই সংশ্লিষ্ট। এ চুক্তির আর্থিক মূল্যমান ধরা হয়েছে ১৪০ কোটি ডলার। আইসিবিসি লিজিং কোম্পানি ৪০টি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজের জন্য ৮০টি লিপ-ওবি ইঞ্জিন ক্রয়ে ১১০ কোটি ডলারের আরো একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। প্রসঙ্গত, চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না লিমিটেডের লিজিং শাখা আইসিবিসি।
গ্যাস টারবাইনসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ সরবরাহ করতে চীনের দাতাং গ্রুপের সঙ্গে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের আরেকটি কাঠামো চুক্তি সই করেছে জিই।
এছাড়া বোয়িংয়ের কাছ থেকে ৩০০টি উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে চায়না এভিয়েশন সাপ্লায়ারস হোল্ডিংস কোম্পানি (সিএএসসি)। চুক্তিতে এক-করিডোর ও দুই-করিডোর উভয় ধরনের উড়োজাহাজ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিবৃতিতে বোয়িং জানিয়েছে, চুক্তিতে উড়োজাহাজ ‘ক্রয় ও প্রতিশ্রুতির’ উল্লেখ রয়েছে। তবে এর বেশিকিছু কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়নি।
এর আগেও ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিএএসসির কাছ থেকে ৩০০টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ পেয়েছিল বোয়িং। চুক্তিটির আর্থিক মূল্যমান ধরা হয় ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম উড়োজাহাজ বাজার চীনে অবস্থান পোক্ত করতে বোয়িং ও এর ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে যাচ্ছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য আলাস্কা, আলাস্কা গ্যাসলাইন ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন, চায়না পেট্রোকেমিক্যাল করপোরেশন (সিনোপেক), চায়না ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন (সিআইসি) ও ব্যাংক অব চায়নার মধ্যে ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের চুক্তি সই হয়েছে। যৌথ এ চুক্তির সুবাদে ১২ হাজার মার্কিন নাগরিকের কর্মসংস্থান হবে। সে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এশিয়ার বার্ষিক ১ হাজার কোটি ডলার করে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে। আর এ চুক্তির মাধ্যমে চীন পাবে কম মূল্যে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চীন সফরকে উপলক্ষ করে সই হওয়া এ বড় চুক্তিগুলো দুপক্ষের বাণিজ্যে ভারসাম্য আনতে খুব একটা কার্যকর হবে না বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, যেসব কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র যথাযথভাবে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছে না, সেগুলো আগে দূর করতে হবে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান বাণিজ্য ঘাটতি ৩১ হাজার কোটি ডলার।
(এএইচএন/ এসএএম/ ১০ নভেম্বর ২০১৭)



