Shah Newas Deffodil

যেভাবে শেয়ার পোর্টফোলিও সাজালে ভাল প্রফিট করা সম্ভব

মো: শাহ নেওয়াজ মজুমদার: একজন বিনিয়োগকারী হিসাবে আমাদের সকলের একটি নিজস্ব ইনভেস্টমেন্ট পোর্টফলিও থাকা উচিত। পোর্টফলিও ম্যানেজমেন্ট শেয়ার ব্যবসায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কে কতটা ভাল ব্যবসায়ি তা তার পোর্টফলিও দেখলেই বুঝা যায়। প্রকৃতপক্ষে পোর্টফলিও সাজানোর দক্ষতার উপরই শেয়ার ব্যবসায় সফলতার মাত্রা অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই পোর্টফলিও সাজানোর বিষয়টি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পোর্টফলিও সাজিয়ে ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে আনা এবং স্থিতিশীল আয় নিশ্চিত করার জন্য বহুবিধ কৌশল রয়েছে। একজন ভাল বিনিয়োগকারী কখনই কারো দ্বারা প্রভাবিত হয় না। তাকে যা করার শেয়ার ক্রয় করার পূর্বেই করতে হবে, তা নাহলে পরবর্তীতে অপেক্ষা করা ছাড়া তেমন কিছু করার থাকে না।
 
বিনিয়োগকে বহুমুখী করনের তত্ত্ব দিয়ে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন হ্যারি এম মার্কভিজ। একজন বিনিয়োগকারী নিম্নোক্ত কাজগুলো ফলো করে একটি সুন্দর পোর্টফলিও সাজিয়ে ভাল মুনাফা অর্জন করা সম্ভব বলে আমরা মনে করছিঃ-

১. পোর্টফলিও এর আকার নির্ধারন: আপনার পোর্টফলিও এর সাইজের উপর নির্ভর করবে আপনি কতগুলো শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন। বিনিয়োগের পরিমান যদি হয় ১ থেকে ২ লক্ষ টাকার মধ্যে হয় তাহলে চেষ্টা করতে হবে ৩ টি শেয়ারে বিনিয়োগ করতে। ৩-৬ লক্ষ টাকার মধ্যে হলে ৪টি শেয়ারে, ৭-১০ লক্ষ টাকা হলে ৫টি শেয়ারে তার অধিক বিনিয়োগের জন্য সর্বোচ্চ ৬টি শেয়ার পোর্টফলিওতে রাখা যাবে। এতে করে বিনিয়োগকারী বিনিয়োগকৃত শেয়ারের কোম্পানীগুলোর প্রতি ক্লোজ মনিটরিং করতে পারবে অন্যথায় মনিটরিং এ সমস্যা হয় এবং কাংক্ষিত ফলাফল লাভ করতে ব্যর্থ হয়।

২. অপরচুনিটি মানিঃ একজন স্মার্ট বিনিয়োগকারী অবশ্যই তার মোট পুঁজির ৬০% মানি প্রথমে প্রাথমিক বিনিয়োগ অর্থাৎ শেয়ার ক্রয় করতে পারবে। বাকি ৪০% পুঁজি অপরচুনিটি মানি হিসাবে রাখতে হবে। যাতে পরবর্তীতে ভাল কোন কোম্পানীর শেয়ার যদি অনেক কম দামে পাওয়া যায় সেই শেয়ার কেনার জন্য। আবার ক্রয়কৃত ভাল শেয়ারগুলি কোন কারন ছাড়াই দাম কমে গেলে সেই অপরচুনিটি মানি দ্বারা আরো শেয়ার ক্রয় করে শেয়ার মূল্য এভারেজ করতে হবে।

৩. বিনিয়োগের সময় নির্ধারনঃ বিনিয়োগকারীকে একটি টাইমফ্রেম নির্ধারন করতে হবে অর্থাৎ যে সময় পর্যন্ত তিনি শেয়ার হোল্ড করতে পারবেন সেটা ঠিক করে নিতে হবে বা উক্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীকে শেয়ার বিক্রি করতে হবে না। আমাদের যে সকল কোম্পানীর সামনে ডিভিডেন্ট রয়েছে সে সকল কোম্পানীকে টার্গেট করে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করতে হবে। এখানে অবশ্যই বিনিয়োগ সময় স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী মাথায় রাখতে হবে। যে সকল কোম্পানী নিয়মিত ডিভিডেন্ট দেয় সে সকল কোম্পানীতে ডিভিডেন্ট ডিকলারেশন এর আগে ভাল মুনাফা পাওয়া যায়। সুতরাং আমাদেরকে অবশ্যই জুন ও ডিসেম্বর ক্লোজিং চিন্তা মাথায় রেখে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিলে ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে।

৪. বিনিয়োগ দরঃ আমাদেরকে অবশ্যই বিনিয়োগের পূর্বে নুন্যতম গত ৫২ সপ্তাহে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন দর দেখে বিনিয়োগ সীমা অথ্যাৎ শেয়ারের ক্রয়মূল্য বের করতে হবে। এরপর সর্বনিম্ন দরে আসলে কয়েক ধাপে শেয়ার ক্রয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে হবে।

৫. সেক্টর নির্বাচন: একই সেক্টরের সব শেয়ারে বিনিয়োগ না করে ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরের শেয়ারে বিনিয়োগ করতে হবে। কেননা মার্কেট মুভমেন্ট হয় সেক্টর ওয়াইজ। তাইতো ভিন্ন ভিন্ন সেক্টরে বিনিয়োগের মাধ্যমে পোর্টফলিওতে ভাল মুনাফা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরের একটি নির্দিষ্ট মুভমেন্ট টাইম থাকে তা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। 

৬. ওয়াচ লিষ্ট তৈরি করে রাখতে হবেঃ আমাদেরকে বছরব্যাপী ব্যবসায়িক পরিকল্পনার আওতায় একটা ওয়াচলিষ্ট তৈরি করতে হবে। অর্থাৎ যে সকল কোম্পানীর শেয়ারে আমরা বিনিয়োগ করতে চাই তার একটা তালিকা তৈরি করে কখন কম দামে পাওয়া যায় তা বের করে বিনিয়োগ ও সর্বোচ্চ দামে বিক্রির পরিকল্পনা থাকতে হবে। কারন সকল শেয়ার পর্যবেক্ষন করা সম্ভব নয় এবং ভাল ফলাফল পাওয়া যায় না।

৭. নিউজ কালেকশন করতে হবেঃ যে শেয়ারই কিনুন না কেন সে শেয়ার সম্পর্কে সকল নিউজ কালেক্ট করতে হবে। এনালাইসিস করতে হবে এবং নিউজের মার্কেট প্রভাব কেমন হবে তা অনুধাবন করতে হবে।  একজন সফল বিনিয়োগকারীর সফলতা অনেকটা নিউজ এর উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহনের উপর নির্ভর করে।

৮. প্রফিট টেক করাঃ স্মার্ট শেয়ার ব্যবসায়ীগন শর্ট টার্মে (৩ মাস) ৫-১০% লাভে শেয়ার সেল করে। ঘন ঘন বাই সেল মার্কেটে ক্ষতির প্রবনতাকে বাড়িয়ে তোলে। যদি শেয়ার দর আরো বাড়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেল করে অপেক্ষা করতে হবে। পরবর্তীতে ২৫% করে বিক্রি করে লাভ নিশ্চিত করতে হবে। এতে আপনার ইক্যুইটি ভ্যালু বৃদ্ধি পাবে এবং লস হওয়ার প্রবনতা হ্রাস পাবে। 

৯. লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবেঃ দক্ষ বিনিয়োগকারীগন তাদের গৃহীত লক্ষ্যে অটুট থাকে। যত ঝড় ঝাপটা আসুক তাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে না। একটা শেয়ার তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে আগের মত গতিপথ পরিবর্তন করে এক বেঁকে লক্ষ্যে পৌঁছে। তাই লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে। 

১০. বাজার সম্পর্কে নিয়মিত ধারনা রাখতে হবে: টোটাল মার্কেট সম্পর্কে ধারনা রাখতে হবে।  যদি মার্কেট ডাউন ট্রেন্ডে থাকে তাহলে সর্ট টার্মের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। লাভ হলে নিয়ে নিতে হবে।  নির্দিষ্ট একটি লস নেয়ার সীমা নির্ধারন করতে হবে অথ্যাৎ যাকে স্টপ লস বলে।  আবার শেয়ার মার্কেট আফ ট্রেন্ডে থাকলে লং টার্মের জন্য ইনভেস্ট করা অধীক লাভজনক। 

অবশেষে আমরা বলতে পারি যদি কোন বিনিয়োগকারীর পোর্টফলিওতে ভালো মানের ও ভাল সেক্টরের ৫ থেকে ৬টি কোম্পানীর শেয়ার রাখা যায় তাহলে একটি শেয়ারের দাম কমলে অন্য কোম্পানীর শেয়ারের দাম বেড়ে পোর্টফলিওতে একটি ভারসাম্য তৈরী হয় আর এভাবেই ভাল প্রফিট করা যায়। আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে পোর্টফলিও ঝুকিমুক্ত রাখা একটি অত্যন্ত কঠিন কাজ তবে যতটুকু ঝুঁকিমুক্ত রাখা যায় তার চেষ্টা করতে হবে।

লেখক ও কলামিষ্ট: হেড অব অপারেশন ও সহযোগী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি, চট্রগ্রাম।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//


Comment As:

Comment (0)