মিহির স্যার

নতুন মুদ্রানীতি অর্থনীতির জন্য সময়োপোগী ও দিক-নির্দেশনামূলক

ড: মিহির কুমার রায়: ২০২৩-২৪ অর্থবছরের (জুলাই-–ডিসেম্বর’২৩) প্রথমার্ধের জন্য বিগত ১৮ই জুন ২০২৩ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতি নিযন্ত্রণসহ সামগ্রিক মার্কেট ইকোনমিক স্থিতিশীতার মাধ্যমে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিষয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য সময়োপোগী ও দিক-নির্দেশনামূলক। ঘোষিত মুদ্রানীতির অন্যতম বৈশিষ্ট হলো- এক: মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে রেপো হার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে, এতে এই হার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হবে ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ, সেই সঙ্গে রিভার্স রেপো হার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২৫ থেকে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে; দ্বিতীয়ত: ব্যাংক ঋণে বেঁধে দেয়া ৯ শতাংশ সুদহারের সীমা তুলে দিয়ে বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। অস্থির ডলারের বাজার সুস্থির করতে টাকা-ডলারের বিনিময় হারও বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে; তৃতীয়ত: বাজারে টাকার প্রবাহ কমাতে নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বেশ খানিকটা কমানো হয়েছে, নামিয়ে আনা হয়েছে ১১ দশমিক ১০ শতাংশে যা গত জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে এই লক্ষ্য ধরা ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ; চতুর্থত: মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে এবার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে; পঞ্চমত: ‘নীতি সুদহার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের সুদহার সীমাও তুলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, সুদহার সীমার বদলে প্রতিযোগিতামূলক ও বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর হবে, যদিও তার মার্জিন থাকবে, টাকার সরবরাহ কমিয়ে এনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাটাই উদ্দেশ; ষষ্ঠত: কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবারের মুদ্রানীতিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেশি জোর দিয়েছে, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে চার ধরনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক মুদ্রানীতি প্রচলিত আছে। যেমন: সুদহার, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রা সরবরাহ এবং বিনিময় হার টার্গেটিং। বাংলাদেশ ব্যাংক এত দিন ‘মূল্যস্ফীতি টার্গেটিং’ মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে আসছিল, এবার ‘সুদহার টার্গেটিং’ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। মুদ্রানীতিতে এটা কাঠামোগত পরিবর্তন বলা যায়; সপ্তমত: নতুন মুদ্রানীতিতে টাকার চাহিদা কমাতে নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। ঋণের সুদহারের যে ৯ শতাংশ ক্যাপ ছিল তাও তুলে দেয়া হয়েছে। নতুন নিয়মে ব্যাংকঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ১২ শতাংশ। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের সুদহার হবে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১২ শতাংশ। এসএমই ও ভোক্তাঋণের তদারকি খরচের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও ১ শতাংশ বেশি সুদ আরোপ করতে পারবে; অষ্টমত: নতুন সুদহার ব্যবস্থা হলো ‘স্মার্ট’ তথা শর্ট টার্ম মুভিং এভারেজ রেট। ১৮২ দিন মেয়াদি সরকারি ট্রেজারি বিলের ৬ মাসের গড় সুদের সঙ্গে আপাতত সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ করিডর বা সীমা দেয়া থাকবে। বর্তমানে ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার ৭ দশমিক ১ শতাংশ। এর মানে গ্রাহক পর্যায়ে ঋণের সুদহার হবে ১০ দশমিক ১০ শতাংশের মধ্যে; নবমত: নীতি সুদহার ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদহারের করিডোর প্রথা চালু হচ্ছে। এখন স্পেশাল রেপোকে বলা হবে স্ট্যান্ডার্ড ল্যান্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ), নীতি সুদ ও রিভার্স রোপোকে বলা হবে স্ট্যান্ডার্ড ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ); দশমত: সরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৪৩ শতাংশ যা আগের মুদ্রানীতিতে প্রাক্কলন ছিল ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৬ দশমিক ৯ শতাংশ। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ এবং সাড়ে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর দিয়েছে; এগারতম: বাংলাদেশ ব্যাংক এখন থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের হিসাব ‘দুই পদ্ধতিতেই’ করবে অর্থাৎ, আগে যে পদ্ধতিতে করা হত, সেভাবেও করা হবে, আবার বিপিএম ৬ পদ্ধতিতেও করা হবে; বারতম: ডলার সাশ্রয়ে টাকার পেকার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কার্ড দিয়ে দেশে কেনাকাটা, বিভিন্ন বিল পরিশোধ ছাড়াও ভারত ভ্রমণের সময় রুপিতে খরচ করার সুযোগ পাবেন বাংলাদেশিরা। এতে ৬ শতাংশের মতো খরচ কমবে; তেরতম: নতুন মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সমর্থনের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। ঘোষিত মুদ্রানীতিতে একটি উন্নত ও বিকশিত পুঁজিবাজার দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। উন্নত ও বিকশিত পুঁজিবাজারের অভাবে দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। বন্ড মার্কেট এই বৃহৎ অর্থায়নের চাহিদা পূরণ করতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি খাত বন্ডের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে তাদের ব্যয় কমাতে পারে এবং পারিচালনাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে। এছাড়াও সরকার বন্ড-এর মাধ্যমে কম খরচে বাজেটের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, এতে ৬ শতাংশের মতো খরচ কমবে: বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ উত্তোরনে পুঁজিবাজারে পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করার জন্য চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্রোকারেজ হাউজ, মার্চেন্ট ব্রাংক ও স্টক ডিলারদের দেয়া ব্যাংকের শ্রেণীবদ্ধ ঋণের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত প্রভিশন ২ শতাংশ থেকে কমিযে ১ শতাংশ করেছে। এছাড়াও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ না নিয়ে বন্ড ইস্যু করে অর্থের সংস্থান করার জন্য নির্দেশনা দিযেছেন। মুদ্রানীতিতে পুঁজিবাজারের প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সমর্থন পুঁজিবাজারের সম্প্রসারণ তথা সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়৷

একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষনে দেখা যায় যে, নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন থেকেই দেশে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদসীমা উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষয় ঠেকাতে ডলার বিক্রি বন্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনতে হলে বাজারদরে অর্থ পরিশোধ করতে হবে। রিজার্ভের হিসাবায়নের ক্ষেত্রেও আইএমএফের বেঁধে দেয়া শর্তের বাস্তবায়ন ঘটাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেক্ষেত্রে দেশের নিট রিজার্ভের পরিমাণ ২৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসবে। আবার রেপো, রিভার্স রেপো ও কলমানির মতো মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোও বাজারভিত্তিক করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। রেকর্ড মূল্যস্ফীতি, চলতি অর্থবছরেই টাকার প্রায় ১৮ শতাংশ অবমূল্যায়ন, রিজার্ভের অস্বাভাবিক পতনসহ বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জন্য ঘোষিত মুদ্রানীতি অর্থনীতির প্রত্যাশিত গতি অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৩০ শতাংশও পেরোয়নি। বিপরীতে দেশের মূল্যস্ফীতির হার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে ঠেকেছে। মে মাসে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, যা গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। রিজার্ভ মানি, ব্রড মানির মতো মুদ্রানীতির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকগুলো অর্জনের হারও তুলনামূলক ভাবে কমেছে। ডলার সংকটের কারণে আইএমএফ থেকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ ঋণ প্রাপ্তির অন্যতম শর্ত হলো ব্যাংকঋণের সুদহার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া। এজন্য একটি করিডোরভিত্তিক সুদহার প্রণয়নের সুপারিশ করেছে আইএমএফ। নতুন মুদ্রানীতিতে আইএমএফের সুপারিশের বাস্তবায়ন ঘটানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদের সঙ্গে ৩ শতাংশ করিডোর দেয়া হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় সুদহার প্রায় ৭ শতাংশ। এর সঙ্গে ৩ শতাংশ করিডোর যুক্ত হলে ব্যাংকঋণের সুদহার ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে ব্যাংকঋণের সুদহার ১০ শতাংশের বেশি হবে। আইএমএফের সুপারিশ মেনে রেপো, রিভার্স রেপো ও কলমানির মতো মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোরও সংস্কার আনা হয়েছে। এসব হাতিয়ার ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, কলমানির সুদহার যাতে অস্বাভাবিক বেড়ে না যায়, সে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। মুদ্রানীতির হাতিয়ারগুলোকে এমনভাবে সাজানো হবে, যাতে অর্থের চাহিদা তীব্র হলে ব্যাংকগুলো সহজেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করতে পারবে।

মুদ্রানীতি বিশ্লেষনে দেখা যায় যে এবার সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি ভঙ্গি অনুসরণ করা হয়েছে, যা কিছুটা সংকোচনমুখী। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে যে সুদ হারে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ দেয়, তাকে বলে ব্যাংক রেট। এসব নীতি হারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য প্রবাহ আর অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করে, যাতে বাজেটে ঘোষিত সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধির উপযুক্ত আর্থিক পরিবেশ তৈরি হয়, আবার বাজারে পণ্যমূল্যও সহনীয় মাত্রায় রাখা যায়। সরকার বাজেটে যে নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচী ঠিক করে, তা বাস্তবায়নের জন্য সহায়ক আর্থিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে অর্থের প্রবাহ ঠিক রাখাই মুদ্রানীতির লক্ষ্য। এমনভাবে এই নীতি সাজানো হয় যাতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হয়। সে হিসাবে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারনে অনেক সংস্কার আনা হয়েছে যা আর্থিক খাতের জন্য শুভ লক্ষন বলে প্রতিয়মান হয়। প্রস্তাবিত মুদ্রানীতিতে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন এনে খেলাপি ঋণের অংক কমানোর বিষয়টি উল্লেখ হয়নি। এরি মধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন আসছে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নেও খেলাপি ঋণ বাধা অথচ দেখা যাচ্ছে বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবাহ আগের তুলনায় কমলেও এই ঋণ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে কিনা কিংবা এই ঋণের টাকা দেশের বাহিরে চলে যাচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখার বিষয়। তবে এবারকার মুদ্রানীতি সতর্কতা, ঋণের মান ও মুল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রনে রাখার দিকে নজর দেয়া হয়েছে, তবে ঋণের ব্যবহার খাতে উৎপাদনশীল বহুমূখী ভাবে দেশের সর্বত্র যেন ছড়িয়ে পড়ে সে ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্কতার নীতি অবলম্বন করছে বলে প্রতীয়মান। তবে মুদ্রানীতির উদ্দেশ্য যদি হয় অর্থ সরবরাহ তা নিয়ন্ত্রনে যে হাতিয়ারগুলো রয়েছে তার মধ্যে গুনগত হাতিয়ার (qaulitive instruments) যেমন নৈতিক ভাবে প্ররোচিত করা, রেশনিং, প্রচারনা, ইত্যাদি কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে তেমন কোন আলোচনা মুদ্রানীতিতে দেখা যায় না। অথচ গুনগতদিক বিবেচনায় এগুলোর বড়ই প্রয়োজন এবং খেলাপি ঋণের ছোবল থেকে ব্যাংকগুলোকে রক্ষা করার জন্য মানবিক আচরনে পরিবর্তন জরুরি যদিও বিষয়টি রাজনৈতিক। তবে মুদ্রানীতির শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারী ব্যাংকগুলোর দক্ষতা বাড়াতে হবে যা বর্তমানে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। শুধু তাই নয় এ খাতে অনৈতিক (Unethical) কাজগুলো সার্বিক অর্জনকে কুলষিত করছে যা অনেকের কাছে দৃষ্টিকটু। এ ব্যাপারে সুশাসনের বিষয়টি আর্থিক খাতে সফলভাবে প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার ব্যাপারে তফসীল ব্যাংকগুলোর আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন আনতে নজরদারি (monitoring) বাড়ানো পূর্বেকার মত অব্যাহত রাখে তবে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের হার অনেকাংশে বাড়বে। তা ছাড়াও এই খাতকে গতিময় করতে শুধু অর্থঋণ আদালতই যথেষ্ট নয় বরংচ বিশেষ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে মামলাগুলোর দ্রুত নিস্পত্তি করতে হবে। হিসাব অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন খাতে আনুষ্ঠানিক আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থের যোগান হয় তা দেশের জি.ডি.পি. এর প্রায় তিন শতাংশের সমান। সাধারণ ভাবে তত্ত্ব (theory) বলছে দুর্ণীতি বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (growth) স্থিমিত করে, পণ্য মূল্যকে প্রভাবিত করে এবং সর্বপরি সুশাসনকে বাধাগ্রস্থ করে। কাজেই এই সকল সমস্যাগুলো সমাধান করে মুদ্রানীতির বাস্তবায়নকে ত্বরান্বিত করতে হবে। তা হলেই দেশের কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত পদ্ধতি রয়েছে যেমন সরকারি ব্যাংকগুলোর জন্য অর্থ মন্ত্রনালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং সব বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিদেশী ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় যা সঠিক নয়। আর্থিক খাতের সংস্কার ও তাকে পুনরুজ্জীবিত করা (ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজার) এবং আর্থিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যাংকগুলোর ভূমিকার ক্ষেত্রে আর্থিক বহির্ভূত উদ্যোগ ও অধিক উদ্ভাবনমূলক আর্থিক পণ্য যেমন তহবিল, উপাদান, বিপণনযোগ্য সিকিউরিটিজকে কার্যকর করে তোলার সময় এসেছে ও এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ব্যবস্থাপনারও উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সর্বশেষ অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার ক্ষেত্রে কভিড-১৯-এর প্রভাবের দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজর দেয়া উচিত। এক্ষেত্রে বিদ্যমান অসমতা দূর করা উচিত, যা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দেয়ার ফলে তৈরি হয়েছে। তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষক এবং প্রান্তিক জনগণের অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বৃদ্ধির জন্যও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।

লেখক: অধ্যাপক (অর্থনীতি), ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।

বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//


Comment As:

Comment (0)