বাজার অর্থনীতিতে সমবায়ের প্রয়োজন আছে কি?
ডঃ মিহির কুমার রায়ঃ জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন ও জাতীয় সমবায় পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী পন্যের অপচয় রোধ করে সহজে বাজারজাতকরন নিশ্চিত করতে সমবায়ের গুরত্বের কথা উল্লেখ্য করে বলেন আমাদের সীমিত জমিতে যা উৎপাদিত হয় তা অনেক ক্ষেত্রে মূল্যের যাথাযথ সুযোগের অভাবে কৃষকরা প্রতিনিয়তই বঞ্চিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় গ্রামীন সমবায়কে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে পাড়লে উৎপাদনের মূল্য কৃষকের অনুকূলে যাবে। বাংলাদেশ কৃষি পন্য উৎপাদনে বিশ্বে একটি সম্মানজনক স্থান দখল করতে সক্ষম হয়েছে, যেমন - সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থান, চাল উৎপাদনে চতুর্থ স্থান, আলু উৎপাদনে অষ্টম স্থান, সাধু পানির মাছ উৎপাদনে তৃতীয় স্থান, ফল উৎপাদনে দশম স্থান, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ স্থান ও বিশ্বের মোট ইলিশের উৎপাদনের ৮৩ শতাংশ হয় বাংলাদেশে। এই সকল সাফল্যের পেছনে যে সকল সহায়ক শক্তি রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো- সেচ এলাকা বৃদ্ধি (৭০ লাখ হেক্টর), কৃষি উদ্যোক্তা ঋন (৩৩,৪৩২ জন কৃষক), কৃষি সহায়ক কার্ড (২.১০ কোটি কৃষক), সেচ পাম্প (১২৫০ সৌর চালিত সেচ পাম্প স্থাপন), উৎপাদনমুখী প্রশিক্ষন (৪১,৫০০ কৃষক, ২৮৮৬ উদ্যোক্তা, ৭০০ জন এনজিও কর্মী, ৩৮০ ব্যাংকার ও ২৮৪ সরকারি কর্মকর্তা, কৃষি তথ্য কেন্দ্র ২৫৪ টি ও কৃষি খাতে শেষ আট বছরে বিনিয়োগ হয়েছে ৫৭৭৬ কোটি টাকা (উৎসঃ প্রথম আলো প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সংখ্যা)
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছিলেন দেশের উন্নয়নে যুব শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাটি, জল, বায়ূ ও পরিবেশের সমন্বয়ে সমবায় ভিত্তিক উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামাঞ্চলের বাধ্যতামুলক উৎপাদনমুখী সমবায়ের কথা উল্লেখ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন সমবায় হচ্ছে তারা যে সকল পন্য উৎপাদন করছে সেগুলো তারা শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করে যদি প্রক্রিয়াজাতকরন করা যায় তা হলে গ্রাম বাংলা আর অবহেলিত থাকবে না। বিদ্যমান সমবায় আইনকে যোগোপযোগী করে সমবায় ব্যাংককে কার্য্যকর করতে হবে এবং বর্তমান যুগে ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে সমবায়ের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।
বঙ্গবন্ধু মনে করতেন সমবায় হলো একটি জনকল্যান মুলক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে রয়েছে গনতন্ত্র, উৎপাদন, সুশাসন, আন্দোলন, চেতনা ও আদর্শ এবং ১৯৭২ সালের ৩০ শে জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষন তার জলন্ত প্রমাণ। ১৯৭২ সালে ২৬শে মার্চ জাতীয়করনের নীতি ঘোষনা উপলক্ষ্যে কর্মসুচিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে পাঁচ বছরের প্লানে দেশের ৬৫ হাজার গ্রামে বাধ্যতামুলক সমবায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তিনি উন্নয়নে দর্শনে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সমবায়কে। সেই সমবায় ভাবনাকে পাথেয় করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহুবিধ সমবায বান্ধব কার্য্যক্রম এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে সবাইকে এগিয়ে আসার আমন্ত্রন জানিয়েছেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন বা আশা বাস্তবায়নের সহযোগী কারা হবে- সরকার না জনগন? যদি জনগন হয় তবে তারাই সমবায়ের পতাকাটিকে বয়ে নিয়ে যাবে তাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে, যেখানে সরকার হবে সহযোগী। আর সরকার যদি সুচনা করে তবে তার প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তা বেড়ে উঠবে জনগনের সহযোগিতায়।
বাংলাদেশের সমবায়ের ইতিহাসের দুটিরই উপস্থিতি পাওয়া যায় বিভিন্ন অবয়বে- বৃটিশ কিংবা পাকিস্থান আমলে। এর অভিজ্ঞতার ফসলগুলো আমাদের গবেষনার খোরাক যোগাবে এবং বাড়তি নতুন প্রকল্প তৈরিতে সহায়তা করবে, যেমন দুস্তর কিংবা তিন স্তর সমবায কাঠামোর আদলে সার্বিক গ্রামোন্নয়ন কর্মসুচি, পল্লী দারিদ্র বিমোচন কর্মসুচি, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্প, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক ইত্যাদি। কিন্তু বিশেষায়িত ব্যাংক হিসাবে সমবায় ব্যাংক লিঃ এর কিছু হবে কিনা? কথায় বলে (old is gold) যদি তাই হয় তবে প্রধানমন্ত্রীর কন্ঠে আবার সমবায় আইনের সংস্কারের প্রসঙ্গটি উচ্চারিত হলো এবং এর আগেও এই আইনের বিভিন্ন ধারায় সংস্কার হয়েছে কিন্তু বাস্তবায়নেই যত সমস্যা দেখা দেয়, যা সরকারের প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোই বাধা হয়ে দাড়ায়। দেশে প্রচলিত সনাতন পদ্ধতির সমবায় (সমবায় অধিদপ্তর) ও কুমিল্লা পদ্ধতির সমবায় এই দুইটি কেবল দাপ্তরিক নথিতেই সচল আছে তা বলা যাবে না যদিও সরকারী দফতর হিসাবে কর্মকর্তা কর্মচারীরা তাদের চাকুরীর সকল সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু সমবায় সমিতির মাধ্যমে কৃষির রুপান্তরের যে সুচনা হয়েছিল বিশেষত সঞ্চয়ে, বিপননে, ঋন প্রদানে, প্রশিক্ষনে, সামাজিত পুজির বিকাশে তা আর তেমনটি নেই। এখন সেই জায়গাগুলো দখল করে নিয়েছে অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যাদের বলা হয় (NGOs) অথচ অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যবসায়ীক সংগঠন হিসাবে স্থানীয় অর্থনীতির উন্নয়নে সমবায়ের বিকল্প নেই। চায়নার কমিউন সিস্টেম, মেক্সিকোর ইডোস, ইসরাইলীর কিভোজ, রাশিয়ার স্টেট কিংবা কালেকটির ফার্ম, ভারতের সমবায় খামার, জাপানোর কৃষি পন্য বিপনন সমবায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসাবে যথেষ্ট অবদান রাখছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারি পরিকল্পনা দলিলে (৬ষ্ঠ ও ৭ম পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনা) এর উপস্থিতি তেমন দৃশ্যমান নয় আর মাঠ পর্যায়ের কথা বাদই দিলাম। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশনকে পলিসি সাপোর্ট দেয়ার জন্য ষাটের দশকে তদানীন্তন সরকার পাকিস্তান গ্রাম উন্নয়ন একাডেমি, বার্ড মানে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিল, যার প্রায়গিক গবেষনা ফসল কুমিল্লা মডেল (দুস্থ ও বিশিষ্ট সমবায় পল্লী পূর্ত কর্মসুচি, থানা সেচ কর্মসুচি, থানা প্রশিক্ষন উন্নয়ন কেন্দ্র) তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সরকারের অনুকূলে থানা পর্যায়ে তাদের পরিকাঠামো বিস্তার করে সারা পৃথীবিতে দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল এবং এর পরবর্তিতে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়নের জন্য এটাই ছিল সরকারী পর্যায়ে একমাত্র কার্য্যক্রম। সময়ের আবর্তে পল্লী পূর্ত কর্মসুচি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দুস্তর বিশিষ্ট সমবায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড বিআরডিবি, থানা প্রশিক্ষন ও উন্নয়ন কেন্দ্র টিটিডিসি এবং থানা সেচ কর্মসুচি টিআইপি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এগুলোর মধ্যে বিআরডিবি দুস্তর বিশিষ্ট সমবায় বাস্তবায়নে নিয়োজিত ছিল এবং এখনও আছে। প্রতিটি থানায় (বর্তমানে উপজেলায়) থানা সেন্ট্রাল কো অপারেটিব এসোসিয়েশন (টিসিসিএ) যা গ্রাম সমবায় সমিতির (কেএসএস) থানা পর্যায়ে ফেডারেশন সমবায় সংগঠনের কাজ করে যাচ্ছিল এবং সমিতির চেয়ারম্যান মডেল ফার্মার ও ব্যবস্থাপকগন প্রতি মাসেই আসত থানা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষন কেন্দ্রে প্রশিক্ষন নেয়ার জন্য।
সেই সমবায়ের আয়োজন সে সময়ে কৃষি উন্নয়নে একটি গতিশীল ভুমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিল বিশেষ করে উফসী ধান সম্প্রসারনে। কিন্তু আশির দশকে যখন বাজার অর্থনীতি ধিরে ধিরে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে তখন থেকেই কাজ করার সামাজিক আচরন গুলো বাধা গ্রস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে এককেন্দ্রীকতা (ethnocentrism) সমবায়িদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধে নির্বাচিত নতুন গনতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় বসেই একটি ভ্রান্তি সিদ্ধান্ত নিয়োজিত বিশেষত পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋনের সুদ মওকুফ যার আওতায় সমবায়িরা না আসায় আন্দোলনের মুখে সমবায় সমিতিগুলো তাদের নিয়মিত ঋনের কিস্তি পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। এর ফলশ্রুতিতে সমবায়িদের প্রদেয় সোনালী ব্যাংকের নয়শত কোটি টাকা আটকে যায় যার গ্রহনযোগ্য সমাধান না হওয়ার দু স্তর বিশিষ্ট সমবায় কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে। কৃষকরা নিয়মিত থানা প্রশিক্ষন ও উন্নয়ন কেন্দ্র আসা বন্ধ করে দেয় এবং চোখের সামনে একটি জীবন্ত কর্মসুচির পতন ঘটে শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারনে। সমসাময়িক সরকারগুলো ও তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা (৬ষ্ঠ ও ৭ম) সমবায়কে আর সেইভাবে আনতে দেখা যায় না এবং পিআরএসপি (poverty reduction strategy paper) এর দলিল থেকে সমবায়কে বাদ দেয়া হয়েছে সর্ম্পূন ভাবে। এই ধরনের একটি পরিস্থিতিতে সমবায় সংগঠকে আবার পুন:জাগরন করার ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বিশেষত: কৃষি পন্য বিপনের ক্ষেত্রে সমবায়কে ব্যবহার করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষত জাপানে এর সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সফল উদ্যোক্তার প্রয়োজন যারা অঞ্চল ভিত্তি কৃষি পন্যের উৎপাদনের নীবিরতা নিরিখে বিপনন সমিতি গড়ে তুলবে উৎপাদকদের সহযোগীতায়। এখানে উল্লেখ্য যে কৃষি পন্যেও বিপননে মধ্যস্বত্যভোগীরা দলিল ফরিয়া ব্যাপারী এক ধরনের (exploitatrive) ভুমিকা পালন করে, যা কৃষকের স্বার্থে যায় না। সেই ক্ষেত্রে সমবায় সংগঠনের ভূমিকা সমবায়ের জোড়ালো হতে হবে। আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা কৃষকদের দৃষ্টি সমবায়ের প্রতি ফেরাতে পারলে তা অনেকাংশে সম্ভব হবে যদিও কাজটি যথেষ্ট কষ্ট সাধ্য। দেশে প্রতিবছর ব্যবসায় প্রসাশনে অগনিত ছাত্র ছাত্রী স্মাতক ডিগ্রি নিয়ে বেরুচ্ছে এবং তারাই হতে পারে আগমী দিনের সমবায় আন্দোলনের সৈনিক ও কর্ণধার। বর্তমানে খামার বাড়ীতে অবস্থিত কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সমবায় অধিদপ্তরের সাথে একিভূত হয়ে কৃষি পন্যের সমবায় বিপণন পদ্ধতি সারা দেশে চালু করতে পারে। বাংলাদেশের কৃষক লীগ, কৃষক ইউনিয়ন ও কৃষক আন্দোলন এ ব্যাপারে কৃষকদের সংঘটিত করে বিপণন ব্যবস্থাকে জোরদার করতে পাড়ে। তাহলেই সোনার ফসলের মূল্য কৃষকের মুখে হাঁসি ফোটাবে এবং প্রধান মন্ত্রীর আশা পূরন হবে এই বাংলায়।
লেখক: ডীন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, সিটি ইউনিভর্সিটি, ঢাকা-১২১৫।



