বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শনে সমবায় ও গ্রামীন অর্থনীতি
ড: মিহির কুমার রায়ঃ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ই নভেম্বর, শুক্রবার জাতীয় সমবায় দিবস - ২০২১ উপলক্ষ্যে দেওয়া এক বাণীতে বলেন, জাতির পিতার অন্যতম উন্নয়ন দর্শন ছিল ‘সমবায়’। সমবায়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য মোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বর্তমান সরকার। দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৯৬ হাজার সমবায় সমিতি রয়েছে, যার ব্যক্তি সদস্য ১ কোটি ১৭ লাখ। সমবায় দেশের কৃষি, মৎস্য চাষ, পশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, পুষ্টি চাহিদা পূরণ, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, আবাসন, নারীর ক্ষমতায়ন, অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তিনি বলেন, সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য কাজ করে চলেছে। সরকারের এ লক্ষ্য পূরণে দেশের সমবায় সংগঠনগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা সক্ষম হবো।
এবারের সমবায় দিবসের প্রতিপাদ্য ‘বঙ্গবন্ধুর দর্শন, সমবায়ে উন্নয়ন’ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সমবায় কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনয়নের জন্য সমবায় সমিতি আইন, ২০২১ এবং পরবর্তী সময়ে সমবায় সমিতি (সংশোধন) আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়। সমবায় খাতে বাজেট বৃদ্ধিসহ প্রশিক্ষণ, আর্থিক ও উপকরণ সহায়তা দেওয়ার কারণে সমবায়ীদের জীবনমান ও সামাজিক উন্নয়ন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, মুজিববর্ষে জাতির পিতার গণমুখী সমবায় ভাবনার আলোকে ‘বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ’ করার কাজে হাত দিয়েছি আমরা। প্রাথমিকভাবে দেশের ৯টি জেলার ১০টি গ্রামের মোট ৫ হাজার মানুষ এ প্রকল্পের সুফল পাবেন। গ্রামের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে উন্নত গ্রামীণ জীবনযাপনের সুযোগ ও গ্রাম থেকে শহরমুখী জনস্রোত কমাতে এ প্রকল্প ভূমিকা রাখবে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজন্ম লালিত স্বপ্ন ছিল একটি সুখী-সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সমবায়ের গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশের সংবিধানে সমবায়কে মালিকানার দ্বিতীয় খাত হিসেবে নির্ধারণ করেন তিনি। এ দেশের গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য জাতির পিতা গণমুখী সমবায় আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের অন্যতম সমবায় প্রতিষ্ঠান ‘মিল্ক ভিটা’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হাতেই গড়ে ওঠে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রামাঞ্চলের বাধ্যতামুলক উৎপাদনমুখী সমবায়ের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন সমবায় হচ্ছে তারা যে সকল পন্য উৎপাদন করছে সেগুলো তারা শিল্প কারখানার কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করে যদি প্রক্রিয়াজাত করন করা যায় তা হলে গ্রাম বাংলা আর অবহেলিত থাকবে না। বিদ্যমান সমবায় আইনকে যোগোপযোগী করে সমবায় ব্যাংককে কার্য্যকর করতে হবে এবং বর্তমান যুগে ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলে সমবায়ের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন সমবায় হলো একটি জনকল্যানমুলক প্রতিষ্ঠান যার মধ্যে রয়েছে গনতন্ত্র, উৎপাদন, সুশাসন, আন্দোলন, চেতনা ও আদর্শ এবং ১৯৭২ সালের ৩০ শে জুন বাংলাদেশ জাতীয় সমবায় ইউনিয়ন কর্তৃক আয়োজিত সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষন তার জলন্ত প্রমাণ। ১৯৭২ সালে ২৬ শে মার্চ জাতীয়করনের নীতি ঘোষনা উপলক্ষ্যে কর্মসুচিতে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে, পাঁচ বছরের প্লানে দেশের ৬৫ হাজার গ্রামে বাধ্যতা মুলক সমবায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তিনি উন্নয়নে দর্শনে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সমবায়কে। সেই সমবায় ভাবনাকে পাথেয় করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বহুবিধ সমবায বান্ধব কার্য্যক্রম এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে সবাইকে এগিয়ে আসার আমন্ত্রন জানিয়েছেনে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বা আশা বাস্তবায়নের সহযোগী কারা হবে- সরকার না জনগন? যদি জনগন হয় তবে তারাই সমবায়ের পতাকাটিকে বয়ে নিয়ে যাবে তাদের অভিষ্ট লক্ষ্যে, যেখানে সরকার হবে সহযোগী। আর সরকার যদি সুচনা করে তবে তার প্রতিষ্ঠানিক কাঠামোতে তা বেড়ে উঠবে জনগনের সগযোগিতায়।
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করেন। ২৫ বিঘা মানে প্রায় সব কৃষকের খাজনা মওকুফ করে দেন। সে সময়ে দেশে ভূমির আকার, মাথাপিছু বা পরিবার প্রতি জমির পরিমাণ খুবই কম ছিল। প্রায় কোনো পরিবারই খাজনা মওকুফের সুবিধা থেকে বাদ পড়েনি। সব সার্টিফিকেট মামলা প্রত্যাহার করে নিলেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল তৈরি করেন। পাট গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট করেন, যা একটি জুট স্টাডি সেন্টার ছিল। তুলা উন্নয়ন বোর্ড, ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউটও গঠন করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আনবিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র করলেন। বিএডিসি ও বাংলাদেশ রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট পুনর্গঠন করেন। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়ে তোলেন।
বঙ্গবন্ধু কৃষিশিক্ষা আধুনিকায়নের জন্য নির্দেশ দিলেন। সমবায়ভিত্তিক গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ ও দলভিত্তিক ঋণ বিতরণের জন্য বাংলাদেশ রুরাল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করলেন। দেশের দুগ্ধ উৎপাদনকারী খামারি ও কৃষকদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতের জন্য ১৯৭৩ সালে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্কভিটা)। খামারিদের দারিদ্র্য বিমোচনের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা সমবায় প্রতিষ্ঠানটিকে আরো শক্তিশালী করে তুলতে প্রতিনিয়তই নিত্যনতুন উদ্যোগ নিয়ে চলেছে সরকার। বাড়ানো হয়েছে এর উৎপাদন সক্ষমতাও। এ অঞ্চলের দরিদ্র খামারি-কৃষকরা বরাবরই বঞ্চিত। স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রাপ্য মুনাফায় ভাগ বসিয়েছে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়া-দালালরা। এ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি কৃষকদের সমবায়ের মাধ্যমে সুসংগঠিত করা, দুধের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি ও বাজার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য থেকে গড়ে তোলা হয়েছিল মিল্কভিটা। অন্যদিকে খাঁটি ও স্বাস্থ্যসম্মত দুধের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে শহরাঞ্চলের ভোক্তাদেরও উপকৃত করে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশকে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তোলা নিয়েও বড় আশা জাগিয়েছিল মিল্কভিটা। প্রতিষ্ঠানটিকে নিয়ে সরকারি উদ্যোগ ও আন্তরিকতারও ঘাটতি নেই। প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাবলম্বী করতে নানা উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। তার পরও এগোতে পারছে না সংবিধিবদ্ধ এ জাতীয় সমবায় প্রতিষ্ঠানটি। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি দুগ্ধ সংগ্রহ বাড়াতে পারছে না। এতে প্রান্তিক খামারিদের কাছে প্রতিষ্ঠানটির সুফলও পৌঁছাচ্ছে এখন আগের চেয়ে অনেক কম। যদিও প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়নে একের পর এক প্রকল্প হাতে নিয়ে চলেছে সরকার। মিল্কভিটায় এখন ৪৯৮ কোটি টাকার তিনটি প্রকল্পকাজ চলমান রয়েছে। গ্রহণ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে আরো ২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প। তবে সেসবের সুফল প্রান্তিক পর্যায়ের দুধ উৎপাদকদের কাছে পৌঁছবে কিনা, সে বিষয়ে সন্দিহান অনেকেই। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের ‘আমূল’ পদ্ধতি অনুসরণ করে দুগ্ধ শিল্প গড়ে তোলার নির্দেশনা দেন। তার এ নির্দেশনার উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উৎপাদিত দুধের ন্যায্যমূল্য ও শহুরে ভোক্তাশ্রেণীর জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত দুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা। এর ভিত্তিতে ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনডিপি) ও ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন এজেন্সি ড্যানিডার সহযোগিতায় দেশে দুগ্ধ শিল্প নিয়ে সমীক্ষা করানো হয়। সমীক্ষার সুপারিশগুলো বিবেচনায় নিয়ে ১৯৭৩ সালে ‘সমবায় দুগ্ধ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় তৎকালীন সরকার। কৃষকদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও দুগ্ধ শিল্পের বিকাশ নিশ্চিত করতে দেশের পাঁচটি যুক্ত এলাকায় স্থাপন করা হয় কারখানা। যাত্রা করে মিল্কভিটা। বর্তমানে দেশের সব বিভাগেই মিল্কভিটার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এতে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক কর্মরত ১ হাজার ১০০ জন। সারা দেশে মিল্কভিটায় নিবন্ধিত প্রাথমিক সমিতি রয়েছে ৩ হাজার ৪৭৪টি। কেন্দ্রীয় সমিতির সংখ্যা ৮১। এসব সমিতিতে মোট সদস্য হিসেবে রয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৩৬৮ জন।
বঙ্গবন্ধু দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। দারিদ্র্যমুক্ত মানে ৩ শতাংশের নিচে মৃদু দারিদ্র্য থাকবে। আর ২০৩১ সালের মধ্যে হতদরিদ্র নির্মূল হবে। দারিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের কম হলে আন্তর্জাতিকভাবে এটিকে শূন্য দারিদ্র্য বলা হয়। আমরা রূপকল্প ২০৪১ -এ বলেছি কর্মহীনতা বা বেকারত্ব থাকবে না। আমরা বলেছি জিডিপিতে কৃষি ৫ শতাংশ অবদান রাখবে, বাকি ৪৫ শতাংশ শিল্প থেকে আসবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ হবে শিল্পায়িত একটি দেশ। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রক্ষা করা হবে। হিউম্যান রাইটস থাকবে এবং আমাদের দেশ বহুমতের ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের দেশ হবে। ধর্মনিরপেক্ষ কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে এটিকে গড়ে তুলব। ২০৪১ সাল পর্যন্ত প্রত্যেক বছরে কী হবে, তা বর্ণনা করা হয়েছে রূপকল্প দলিলে। আমরা ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হব। দেশ এমন সুপরিকল্পিতভাবে এর আগে পরিচালিত হয়েছে বলে মনে হয় না। ২০০৯ সাল থেকে দেশ যেভাবে পরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে এবং বাজেটের সঙ্গে পরিকল্পনার যেভাবে সমন্বয় করা হচ্ছে, তা এর আগে ঘটেনি। বাংলাদেশ উচ্চ প্রবৃদ্ধির যুগে প্রবেশ করার অন্যতম কারণ হলো বাস্তবায়নযোগ্য সুন্দর পরিকল্পনা। এই প্রক্রিয়ায় সমবায় হউক উন্নয়নের সহযোগী হাতিয়ার এবং গ্রামোন্নয়নের মর্মবাণী।
লেখক: গবেষক, সিন্ডিকেট সদস্য ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।



