অর্থনীতিতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
ড: মিহির কুমার রায়: সহনীয় মাত্রার মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ভালো হলেও উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। এর কারণ মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারনে মানুষ তার অর্জিত অর্থ দ্রুতই মূল্য হারিয়ে ফেলবে এবং মানুষ ভবিষ্যতে প্রয়োজন হতে পারে এমন ভোগ্য পণ্য এখনই কিনে ফেলতে চাইবে। এতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ আরও বেড়ে যাবে। অপরদিকে পণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এবং অনেক বেশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকার কারণে পণ্য উৎপাদকেরা উৎপাদন কমিয়ে দেবে এবং লোক ছাঁটাই করে বেশি মানুষকে বেকার করবে। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সম্প্রতি প্রকাশিত যৌথ জরিপে জানা গেছে, করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র হওয়া মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ৩ কোটি ২৪ লাখ। সরকারি হিসাবেই করোনার আগে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল পৌনে ৪ কোটি। অর্থাৎ নতুন দরিদ্রসহ বর্তমানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে সাত কোটি। জিডিপির প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু আয় নিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সরকার যা–ই বলুক না কেন, এটা এখন খুব স্পষ্ট যে করোনার আগেই শ্লথ হয়ে আসা অর্থনীতি করোনার অভিঘাতে আরও অনেক খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। এদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি শ্লথ থাকা এবং বিদেশে কর্মরত অনেকেই তাঁদের সঞ্চয় দেশে পাঠানোর কারণে করোনার সময় দেশে ডলার রিজার্ভের বিরাট উল্লম্ফন হয়েছিল। করোনার প্রভাব কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশের টাকা আসায় ভাটার টান পরায় এখন দেশে প্রতিদিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমছে যার ফলে সরাসরি ভোক্তার কাছে যাওয়া আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আবার স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো আমদানি করা পণ্য প্রয়োজন হয়, ফলে দাম বাড়ছে সেগুলোরও। অর্থনৈতিক ধীরগতি, কর্মসংস্থানহীনতা এবং অতি দ্রুত কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া আর সঙ্গে উচ্চ মূল্যবৃদ্ধি এই নির্দেশনা দেয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি স্থবিরতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি সার্বিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশে বছরে জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রায় ৬৫ লাখ টন। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই ৫০ লাখ টন যার মধ্যে ৪০ লাখ টন আমদানি করতে হয় আর মোট চাহিদার ৬৩ শতাংশ আবার ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে। আর সেচ কাজে ব্যবহৃত হয় ১৬ শতাংশ। ফলে ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব জনজীবনের পাশাপাশি পড়বে কৃষিতেও। ধরা যাক ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে খরচ বাড়বে বোরো আবাদে। দেশে মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। কারন এর জন্য জমিতে ভূগর্ভস্থ সেচের পানি দিতে হয় শ্যালো টিউবওয়েল এবং ডিপ টিউবওয়েল ব্যবহার করে। এই সকল যন্ত্রগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে ডিজেল প্রাপ্তির উপর যেখানে বিদ্যুৎ বিতরণের ব্যবস্থা নেই। হঠাৎ করে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বৃদ্ধি করায় আসন্ন বোরো আবাদের ওপর ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যার ফলে প্রতি একরে উৎপাদন খরচ বাড়বে কৃষকের। বিএডিসির সূত্রে জানা গেছে, দেশে মোট কৃষকের সংখ্যা ১ কোটি ৯৭ লাখ ৭৯ হাজার ৭৮ জন অর্থ্যাৎ প্রায় ২ কোটি। এর মধ্যে সেচযন্ত্রের আওতায় ১ কোটি ৯৪ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭২ জন রয়েছে। শুধু ডিজেল সেচভুক্ত কৃষকের সংখ্যা হলো ১ কোটি ২৩ লাখ ৫৯ হাজার। বছরে সেচ বাবদ প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেলের প্রয়োজন পড়বে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সূত্রে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমিতে সেচ ও চাষ দিতে দরকার ২০ লিটার ডিজেল। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে কৃষকদের বিঘা প্রতি ৩০০ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে, এতে মুনাফাও প্রায় ৩ শতাংশ কমে যাবে। এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকের সেচ বাবদ খরচ হবে ৭৫৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) রিপোর্ট অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল স্ট্যাটিসটিকস ২০১৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব উপকরণ ব্যবহারের কারণে কৃষকের খরচ হয় গড়ে ১৪ হাজার ৯০১ টাকা যার প্রায় ৪৩.৪৪ শতাংশ বা ৬ হাজার ৪৭৩ টাকা ব্যয় হয় সেচকাজে। আবার গোটা কৃষি খাতে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় সেচকাজে। দেশে গত অর্থবছরে প্রায় ১৬ লাখ সেচযন্ত্র পরিচালিত হয়েছিল। এর মধ্যে ডিজেলে চলেছে ১২ লাখ ৪৪ হাজার ও বাকিগুলো বিদ্যুতে পরিচালিত হয়েছে। এছাড়া কৃষিপণ্য পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার রয়েছে। এতে চলতি রবি মৌসুমের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে। সম্প্রতি ডিজেলের দাম ৬৫ থেকে প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ৮০ টাকা করা হয়েছে। এ মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলবে কৃষি খাতে। বিশেষ করে আসন্ন বোরো মৌসুমে প্রথম ধাক্কা খাবেন কৃষক। বাড়তি খরচ করে উৎপাদনের পর ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রি করা যাবে কিনা তা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে কৃষকের। এরই মধ্যে আমন ধানে বাড়তি ব্যয় গুনতে হচ্ছে তাদের। জমি চাষসহ নানা কাজে খরচও বাড়তে শুরু করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে উফশী, হাইব্রিড ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে আবাদ হয়েছে প্রায় ৪৮ লাখ ৭২ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। চলতি অর্থবছরে সেটি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু সেচের জন্য তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবারো বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শঙ্কা তৈরি করবে। বোরো ধানের আবাদ ছাড়াও সবজি, তেল, ডালজাতীয় খাদ্য ও দানাদার খাদ্যশস্য উৎপাদন করা হবে। এসব খাদ্য পণ্য উৎপাদনেও সেচের ব্যবহার হয়। এমনিতেই সেচ মৌসুমের শুরুতে কৃষি যন্ত্রপাতি ওভারহোলিং করতে বড় অংকের টাকা খরচ হয় সেখানে সেচ খরচ বেড়ে গেলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। দেশে ধান ছাড়াও কৃষির অন্য খাতেও সেচযন্ত্রের বহুল ব্যবহার হয়। যেমন শীতকালীন সবজি, পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষে সেচযন্ত্রের ব্যবহার হয়। জমি চাষ থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছর শ্যালো মেশিনের ব্যবহার হয়। এসব যন্ত্র ডিজেলনির্ভর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবমতে, শুধু ধান রোপণ বা চাষাবাদে নয়, মাড়াই, পরিবহনের কাজেও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহার হয়। ধান ছাড়াও নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমে শীতকালীন সবজি, গম, সরিষা, ভুট্টাসহ প্রধান ফসলগুলো উৎপাদন হয়। বৃষ্টিহীন এ মৌসুমে সেচ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে সব ধরনের কৃষিপণ্যের ওপরে ডিজেলের এ মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য বলছে, গত বোরো সেচ মৌসুমে ছয় মাসে প্রয়োজন হয়েছিল প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টন ডিজেল। গত অর্থবছরের চাহিদার সমপরিমাণ ডিজেলের ব্যবহার হতে পারে চলতি বছর। এর মধ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বরে তেলের চাহিদা থাকবে ১ লাখ ৯৪ হাজার টন। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ২ লাখ ৩৩ হাজার, ফেব্রুয়ারিতে ৪ লাখ ৬৬ হাজার, মার্চে ৫ লাখ ৫ হাজার, এপ্রিলে সাড়ে তিন লাখ ও মে মাসে প্রায় এক লাখ টন। এসব ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়লে কৃষকের বাড়তি খরচ হবে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে কৃষকের পণ্য পরিবহন ও যান্ত্রিকীকরণের বাড়তি খরচও যুক্ত হবে। ফলে সেচ ও পরিবহন ব্যয়ের বাড়তি খরচ মিলিয়ে কৃষকের প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বাড়তি ব্যয় হতে পারে। অবশ্য এ বাড়তি খরচ মেটাতে হলে কৃষককে বাড়তি দাম দিতে হবে। বাড়তি দাম দিলে চালের দাম বাড়বে। ফলে সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জাতীয় মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদগন।
ফলে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর ফলে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে দেশে সব কৃষিপণ্যের দাম বাড়বে। বাড়তি খরচ দিয়ে ফসল উৎপাদনের পর কৃষক পণ্যের দাম না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। খরচ বৃদ্ধি ও দাম না পাওয়ার শঙ্কায় কৃষক চাষাবাদ কমিয়ে দিতে পারেন, এতে আমাদের উৎপাদন বিঘ্নিত হবে। এমনিতেই সেচ মৌসুমের শুরুতে কৃষি যন্ত্রপাতি ওভারহোলিং করতে বড় অংকের টাকা খরচ হয়। সেখানে সেচ খরচ বেড়ে গেলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। দেশে ধান ছাড়াও কৃষির অন্য খাতেও সেচযন্ত্রের বহুল ব্যবহার হয়। যেমন শীতকালীন সবজি, পুকুর ও ঘেরে মাছ চাষে সেচযন্ত্রের ব্যবহার হয়। জমি চাষ থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, নৌযান চালানোর মতো কাজে সারা বছর শ্যালো মেশিনের ব্যবহার হয়। এসব যন্ত্র ডিজেলনির্ভর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবমতে, শুধু ধান রোপণ বা চাষাবাদে নয়, মাড়াই, পরিবহনের কাজেও ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহার হয়। ধান ছাড়াও নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমে শীতকালীন সবজি, গম, সরিষা, ভুট্টাসহ প্রধান ফসলগুলো উৎপাদন হয়। বৃষ্টিহীন এ মৌসুমে সেচ ছাড়া ফসল উৎপাদন সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে সামগ্রিকভাবে সব ধরনের কৃষিপণ্যের ওপরে ডিজেলের এ মূল্যবৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ভারতে কৃষকরা কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে লাগাতার আন্দোলন করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকরা সংগঠিত নন, তাদের পক্ষে কথা বলারও কেউ নেই। অসহায় কৃষক হয় মুখ বুজে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন, অন্যথায় সেচের ব্যবহার কমিয়ে দেবেন। সেক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আর সেচে ডিজেল কম ব্যবহার করলে জমিতে শস্য উৎপাদনও কমে যাবে। এই বিপদ থেকে কৃষককে রক্ষার একটা উপায় হলো ডিজেলে ভর্তুকি দেয়া। এ কথা মনে রাখতে হবে করোনাকালেও যেসব খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছে, নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও ১৭ কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান করে তার মধ্যে কৃষিই অন্যতম। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সরকার কৃষি সেচের জ্বালানিতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে থাকে। বাংলাদেশও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলে ভর্তুকি দিতে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএওর) বিশ্ব পরিসংখ্যান পকেট বুক-২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কৃষক ২০১৭ সালে যে কৃষিপণ্য উৎপাদন করেছেন, তার আর্থিক মূল্য প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। তারা আরও বলেছে, ২০ বছর আগে কৃষক যে অবদান অর্থনীতিতে রাখতেন, এখন তার দ্বিগুণ রাখেন। তাই কৃষিতে ডিজেলের ওপর ভর্তুকি দিয়ে হলেও কৃষক ও কৃষি কাজকে সচল রাখতে হবে। আশা করি কৃষি বান্ধব সরকার এই সুপারিশটুকু বাস্তবায়ন করবে।
লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক।



