অভিনেতা সৌমিত্র চাটার্জি: কর্ম ও জীবন
ড: মিহিরি কুমার রায়: বি’ভূতিভুষণ বন্দোপধ্যয়ের কালজয়ি উপন্যাস ‘পথের পাঁচালি’ ও ‘অপুর সংসার’ এর সফল চলচ্চিত্রায়ণ করেছিলেন উপমহাদেশের একমাত্র অস্কার বিজয়ি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, যার প্রথমটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৫ সালে এবং দ্বিতিয়টি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫৯ সালে। এ দুটির মধ্যে এক অপূর্ব মিলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন পরিচালক সত্যজিৎ, এমনভাবে যে একই লেখকের সৃষ্টি অপু (কানু বানার্জি) শৈশবে পথের পাঁচালিতে আর সেই অপু (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)যৌবনে অপুর সংসারে নিয়ে এসে এক সুন্দর সংমিশ্রন ঘটিয়েছিলেন; যা চলচ্চিত্র প্রেমিদের মনে স্থান করে নিয়েছিল সার্বজনীনভাবে। অবশেষে অপু সৗমিত্র চট্টোপাধ্যায় ঘরে ফিরে গেলেন ১৫ই নভেম্বর, ২০২০ বেলা ১২.৩০মিনিটে। গত ১৫ই নভেম্বর, ২০২১ ছিল তার প্রথম প্রয়াণ দিবস। আর তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক বর্ণময় যুগের অবসান ঘটেছিল। ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও বিনোদন অঙ্গনে। নায়কের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছিলেন না অনেকেই। শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন দুই বাংলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তার অগণিত ভক্ত, সহশিল্পী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন সাইটে তাকে নিয়ে শোক প্রকাশ, স্মৃতিচারণ করছিলেনন ভক্ত থেকে তারকাভক্তরা। এক শোক বার্তায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, সৗমিত্র চট্টোপাধ্যায় তার সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে ভক্তদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। প্রতিভাবান এই শিল্পির মৃত্যুতে সিনেমা জগতে এক শূন্যতার সৃষ্টি হলো যা অপুরনীয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। শুধু সিনেমা নয, সাহিত্য, রাজনীতি, কবিতা- সবক্ষেত্রেই ছিল তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি৷ ১৯৩৫ সালের জানুযারি মাসের ১৯ তারিখ জন্ম হয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। যার পরিবারের আদি নিবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া মহকুমার কয়া গ্রামে, যা ছিল শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথের কোটি বাড়ী থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে।
তবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যাযের ঠাকুরদার সময থেকেই এই পরিবারের সদস্যরা নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে থাকতে শুরু করেন। তার বাবা ছিলেন কলকাতা হাই কোর্টের একজন আইনজীবি এবং জীবনের দশটি বছর সৌমিত্রের কেটেছে কৃষ্ণনগরে, যেখানে সন্ট জেইনিস বিদ্যালয়ে তার প্রাথমিক পড়াশানা। কৃষ্ণনগর শহরটি ছিল সেই সময়ের সংস্কৃতির তীর্থভূমি এবং অনেক থিয়েটার গ্রপের পদচারনে ভরপুর। বিশেষত, প্রখ্যাত নাট্যকার দ্বীজেন্দ্র লাল রায়ের জন্মভূমি হওয়ার সুবাদে তার ঠাকুরদা এই সকল থিয়েটার গ্রুপের সভাপতি ছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই একটি সংস্কৃতির আবর্তে বড় হয়ে উঠেছেন তিনি, যা শিল্পি হয়ে উঠার একটি সিড়ি হিসাবে কাজ করেছে। সেখানে তার বাল্যবন্ধু নাটক ব্যক্তিত্ব মৃত্যুজ্জয় শীলের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। বাবার চাকরির বদলিজনিত কারণে ক্লাস ফাইভের পর হাওড়ায চলে আসেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সেখানকার জেলা স্কুলে মাধ্যমিক পর্যন্ত কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে সম্মানসহ স্মাতক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্মাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ফাঁকেই নাট্য নির্দেশক অহিন্দ্র চৌধুরীর হাত ধরেই মঞ্চ নাটকে সৌমিত্রের অভিষেক এবং উইলিয়াম শেকসপিয়ারের কিং লেয়ার অবলম্বনে সুমন মুখোপধ্যায়ের ‘রাজা লিয়র’ নাটকে নাম ভূমিকায় প্রশংসিত হন তিনি, যা অনেকের বিচারে সেটাই ছিল সে সময়ে তার শ্রেষ্ঠ অভিনয়। সিটি কলেজে পড়ার সময় প্রখ্যাত নাট্যকার শিশির ভাদুরীর অভিনয় দেখে তার সাথে সাক্ষাতের চেষ্ঠা করে সফলকাম হন এবং ১৯৫৯ সালে ভাদুরীর মৃত্যুর আগেও তার নিদের্শিত নাটকে অভিনয় করে সুনাম অর্জন করেন।
আবার কলকাতার সিটি কলেজে বাংলা নিয়ে তিনি যখন পড়তেন তখন প্রথম থেকেই কবিতা, আবৃতি, সাহিত্য, বাম রাজনীতির দিকে ঝোঁক ছিল প্রচুর। অভিনেতার কর্মজীবন শুরু আকাশবাণীর ঘোষক হিসেবে। তার আবৃত্তি দশকের পর দশক ধরে মন ভরিয়েছে আপামর বাঙালির। তিনি রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সুনীল, শক্তি এদের পাশাপাশি নবীনদের কবিতাও মঞ্চে দাঁড়িয়ে আবৃত্তি করেছেন, এমন দৃষ্টান্তও আছে। কবিতা লেখার কাজ, পত্রিকা সম্পাদনার কাজ করেছেন। অবসর সময়ে ছবি আঁকতেও ভালোবাসতেন। তাই সৌমিত্র মানেই যে শুধুই সিনেমার পর্দায় ডাকসাইটে অভিনেতা, তা একেবারেই নয়। বরং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেকে মেলে ধরেছিলেন সংস্কৃতির নানা দিকে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ছিপছিপে চেহারা, উজ্জ্বল চোখ ও মন খোলা হাসি। সৌমিত্র মানেই দীর্ঘাঙ্গি সু-পুরুষ নায়ক। উত্তমের পর সে সময় মেযেদের মনে ঝড় তুলতে সক্ষম হযেছিলেন সৌমিত্রই। বাঙাল-ঘটির লড়াইযে সবসমযই উত্তম-সৌমিত্র কেন্দ্রবিন্দু। সত্যজিৎ রায়ের তৃতীয় চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’-এর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। ১৯৫৮ সাল, কম যুগ আগের কথা নয়! এই চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিবিড়। কারণ, সিনেমা শুরুর কিছু পর আমরা দেখতে পাই গল্পের মোড় ঘোরে খুলনার রূপসা নদীর বাঁকে এসে! এক পিতার লগ্ন ভ্রষ্টা কন্যা এবং বন্ধুর বোনকে তাৎক্ষণিক বিয়ে করে একজন ত্রাণ কর্তার চরিত্রে অপু আমাদের হৃদয় জয় করেন। ১৯৫৯ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে সিনেমার রূপালি পর্দায় নাম লেখান তিনি। সেই সিনেমায় সৌমিত্রের(তখন বয়স ২৪)সাথে অভিষেক ঘটে ১৩ বছর বয়সি শর্মীলা ঠাকুরের। সিগারেটের প্যাকেটে লেখা “খাওয়ার পর একটা করে কথা দিয়েছ” -এর মতো দৃশ্য আর শর্মীলা-সৌমিত্র জুটির সেই রসায়ণ দর্শকমনে এখনও অমলীন হয়ে রয়েছে। এরপর তিনি সত্যজিতের ৩৪টি সিনেমার মধ্যে ১৪টি সিনেমায় অভিনয় করেন। তার মধ্যে ‘হীরক রাজার দেশে’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘চারুলতা’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘অশনি সংকেত’ বিশ্বব্যাপী সাফল্য অর্জন করে। তাছাড়াও তিনি মৃনাল সেন, তপন সিংহ, তরুন মজুমদার, গৌতম ঘোষ, ঋতু পর্ণ ঘোষ ও অপর্ণা সেনের সঙ্গে কাজ করেছেন।
তার অভিনীত অনান্য ছবিগুলো হলো- সাত পাকে বাঁধা, আকাশ কুসুম, মণিহার, কাঁচ কাটা হীরে, ঝিন্দের বন্দী, তিন ভোবনের পাড়ে, দেবদাস, গণদেবতা, আতঙ্ক, গণশত্রু, ক্ষুধিত পাষান, তিন কণ্যা, আগুন, শাস্তি ইত্যাদি। তপন সিনহার ‘ঝিন্দের বন্দি’ ছবিতে উত্তম-সৌমিত্রের অভিনযের লডাই তাক লাগিযেছিল সবাইকে। পর্দায যেন অভিনযের যুদ্ধ। তবে শুধুই ঝিন্দের বন্দি নয, দেবদাস, স্ত্রী, যদি জানতাম ছবিতেও উত্তম-সৌমিত্রকে একই সঙ্গে অভিনয় করতে দেখেছে সিনেমা প্রেমী মানুষ। গল্পের বই থেকে সোজা যেন সিনেমার পর্দায এসে দাঁডান সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায। সত্যজিতের তৈরি ফেলুদা চরিত্র যেন তাঁকে ভেবেই লিখেছিলেন। সত্যজিতের আঁকা ফেলুদার ইলাস্ট্রেশনও অবিকল যেন সৌমিত্রের মতোই। তাইতো বাঙালি সৌমিত্র ছাডা ফেলুদা হিসেবে কাউকেই মানিযে নিতে পারেন না।
ছয় দশকের দীর্ঘ চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে প্রায় ২৫০টি ছবিতে অভিনয় করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। পাশাপাশি তিনি পেশাদার মঞ্চে অভিনয় করেছেন যার মধ্যে রয়েছে নাম জীবন(১৯৭৮), রাজকুমার(১৯৮২), ফেরা(১৯৮৭), নীলকন্ঠ(১৯৮৮), ঘটক বিদায়(১৯৯০), নয়ামুত্তি(১৯৯৬) ইত্যাদি। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ৬টি, কবিতার বই ৪টি, ড্রামা ৩টি ও অনুবাদ গ্রন্থ ৪টি। তার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করা হয়। তাছাড়াও জাতীয় পুরস্কার, দাদা সাহেব ফালকেসহ অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় প্রথমে ছিলেন একজন অভিনেতা এবং কবিতা চর্চা, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্য সংগঠন ইত্যাদি ছিল তার নেশা। তার অভিনয় ছিল প্রকৃতি নির্ভর, যা চিন্তাশীল মানুষদের চিন্তার খোরাক যোগাত। এক সত্যজিৎ রায়ই তাকে বিশ্ব দরবারে পরিচিতি করে দিয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। রোমান্টিক হিরো থেকে ভিলেন কিংবা ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে ওঠা- সব চরিত্রেই সিদ্ধহস্ত।
ব্যক্তিগত জীবনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ১৯৬০ সালে দীপা চট্রোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিবাহবন্দনে আবদ্ধ হন, যিনি একজন সংস্কৃতিকর্মী। তাদের এক মেয়ে পৌলমী ও এক ছেলে নৌগত চট্রোপাধ্যায়, যিনি একজন কবি।
লেখক: অধ্যাপক(অর্থনীতি), ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনির্ভাসিটি ও সাবেক জেষ্ট্য সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতিবীদ সমিতি, ঢাকা।



