আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২১ সফল হউক
ড: মিহির কুমার রায়: বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের কাছে নতুন বাংলাদেশকে তুলে ধরার লক্ষ্যে রাজধানীতে ২৮ নভেম্বর ২০২১ দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন-২০২১ শুরু হয়েছে। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে রাজধানীর ‘রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন’ হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করে সম্মেলনটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এ সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রায় ২,৫৭৪ জন ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সামিট ২০২১-এ অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৪৬৫ জন বিদেশী রয়েছেন। তারা তাদের দেশ বা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সংস্থাগুলির প্রতিনিধিত্ব করছেন শারীরিক বা ভার্চুয়াল উভয়ই ভাবেই। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপানসহ ১৫টি দেশের কাছ থেকে শতকোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বিডা ছাড়াও বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনস অথরিটি (বেজা), বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (বেপজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক অথরিটি (বিএইচটিপিএ), পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ), ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই) এবং ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফআইসিসিআই) এই সম্মেলনে সহযোগিতা করছে। ‘বাংলাদেশ: ডিসকভার লিমিটলেস অপারচুনিটিজ’ শীর্ষক একটি ট্যাগ লাইনসহ শীর্ষ সম্মেলনে ১৪টি পৃথক সেশন থাকছে, যার মধ্যে ১১টি নীল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং ওষুধ, পরিবহন এবং লজিস্টিকস, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, আর্থিক পরিষেবা, কৃষি ব্যবসা, চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্য, পোশাক, বৈদ্যুতিক এবং ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে সম্পৃক্ত রয়েছে।
করোনার প্রভাবে দেশে বিদেশী বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এখন বিশ্ব অনেকটা স্বাভাবিক হলেও অর্থনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে প্রয়োজন প্রচুর বিনিয়োগ। সরকার বিনিয়োগ বাড়াতে একের পর এক উদ্যোগ নিচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তি তৈরিতেও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ ঘটেছে। কিন্তু কোথায় যেন সবকিছুর ছন্দপতন ঘটছে। শত পদক্ষেপ নেয়ার পরও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হচ্ছে না। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনার কথা তুলে ধরলেও আশানুরূপ বিদেশী বিনিয়োগ আসছে না। জ্বালানি নিরাপত্তা নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বিনিয়োগকারীরা আসছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ব্যবসা সহজীকরণ ছাড়াও আরো কিছু বিনিয়োগের প্রতিকূল বিষয় রয়েছে। যেমন এডিবি প্রণীত সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারী সুরক্ষা সূচক-২০২১ মতে, বিশ্বের ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৯তম, পাকিস্তান ২৬তম, শ্রীলংকা ৩৮তম ও নেপাল ৭২তম। দেশের পুঁজিবাজারও খুব একটা শক্তিশালী নয়। ডিএসই ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত জুন শেষে জিডিপিতে পুঁজিবাজারের অবদান ছিল: বাংলাদেশে ৯ দশমিক ৪১, ভারতে ৬২ দশমিক ৭৫, শ্রীলংকায় ১৪ দশমিক ৯২, থাইল্যান্ডে ৮৯ দশমিক ২৯ ও হংকংয়ে ১ হাজার ৩১১ দশমিক ১৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৮৪ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে বাংলাদেশে। অন্যদিকে মার্কিন সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান বব মেনেন্দেজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি শ্রম অধিকার ও শ্রমিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর তাগিদ দিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপিতে বৈদেশিক বিনিয়োগের অবদান ১ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের এফডিআই যদি ৫-৬ শতাংশে উন্নীত করা যায়, তাহলে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হবে ১০ শতাংশ। সুযোগও রয়েছে বাংলাদেশের সামনে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যবিরোধ এবং হংকংয়ের ওপর চীনের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে এশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হংকং থেকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে শুরু করেছেন। অনেক বৈশ্বিক কোম্পানি তাদের প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে সরিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সিঙ্গাপুরের রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। তাই সিঙ্গাপুর বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে। দফায় দফায় বাংলাদেশে বিনিয়োগ আগ্রহের কথাও জানিয়েছে সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সিঙ্গাপুর বিজনেস ফেডারেশন (এসবিএফ) সম্প্রতি বাংলাদেশে পোশাক ও ওষুধ খাতে ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বিডার পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত চার বছরে বাংলাদেশে সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ ৩৫ শতাংশ বেড়েছে। চীন ও জাপানের বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখিয়েছে। ইউরোপ থেকেও অনেকে আসতে চাইছেন। ২০১৪ সালে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে ১৩টি প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা হয়েছিল, তারও অন্যতম ছিল দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পাশাপাশি ট্যাক্স, শুল্ক ছাড় এবং মুনাফার প্রত্যাবাসন অন্যতম। দুঃখজনক হলেও সত্য, এক্ষেত্রে অগ্রগতি খুব সামান্যই। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও জমির দুষ্প্রাপ্যতাকেও প্রতিবন্ধকতা মনে করা হয়। এদিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।
পরবর্তী দশকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাংলাদেশের এখন গতি পরিবর্তনের সময়। এজন্য একটি আধুনিক, বৈচিত্র্যপূর্ণ ও প্রাণবন্ত বেসরকারি খাত গড়ে তুলতে বিভিন্ন আইন-কানুন ও নীতির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে সব ধরনের আইনি জটিলতা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ ইকোনমিক জোন অথরিটি (বেজা), অর্থ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলো একত্রে কাজ করছে। এছাড়া ১১টি সংস্থার ৪১ ধরনের পরিষেবা দেয়ার ক্ষেত্রে এসব সংস্থার সার্বিক কার্যক্রমে গতি আনার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্ট সামিট ২০২১ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা। উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশে বিদেশী সহায়তার প্রবাহ ও স্বল্প সুদে ঋণপ্রাপ্তিও কমবে। এছাড়া বাণিজ্য ও শুল্ক সুবিধাও কাটছাঁট হবে। এক্ষেত্রে রফতানিতে একক পণ্যনির্ভরতা ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলবে। এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো ও রফতানি বহুমুখীকরণের কথা বলছেন। এছাড়া প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান-দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। আশা করা যায়, আলোচ্য সামিটের মাধ্যমে এক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল আসবে।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ।



