এসএমই খাতের উন্নয়নই অর্থনীতির প্রাণশক্তি
ড: মিহির কুমার রায়: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পের অংশগ্রহণ আগের চেয়ে বেড়েছে যা জিডিপির ৩৫ শতাংশ এবং কৃষি নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে দেশে শিল্পের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। দেশে জিডিপির আকার গত অর্থবছরেই প্রথমবারের মতো ৩০ লাখ কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়েছে, যা বর্তমান বছরে এসে দাড়িয়েছে ৩৩ লাখ কোটি টাকা যা এক দশক ধরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রেখেছে, যা অব্যাহত ছিল মহামারীর মধ্যেও। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে গত এক দশকে বড় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাওয়া উৎপাদনমুখী শিল্প খাত। অর্থনীতিতে মূল্যসংযোজনের পরিমাণ বাড়িয়েছে মাঝারি ও বৃহদায়তনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মূল্যসংযোজন বেড়েছে ১৩১ শতাংশেরও বেশি। দেশে উৎপাদন খাতে মূল্যসংযোজনকারী উল্লেখযোগ্য শিল্পের মধ্যে রয়েছে খাদ্য-পানীয়-তামাক, ইস্পাত, সিমেন্ট, বস্ত্র ও পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফুটওয়্যার, কাঠ ও কাঠজাত পণ্য, ভোজ্যতেল, রাসায়নিক, রাবার, প্লাস্টিক পণ্য, গ্লাস, স্টিল, সাধারণ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র এবং পরিবহন যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতিতে মোট মূল্যসংযোজন করেছিল ৯৭ হাজার ৯৯৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা যা ২০২০ সালে এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকায়। এ হিসাবে গত এক দশকে মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যসংযোজন বেড়েছে ১৩১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। স্থানীয় চাহিদা পূরণে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্পগুলোর অবদান সংশ্লিষ্ট খাতে বড় রূপান্তরের আভাস দিচ্ছে। ইস্পাত শিল্পে রড উৎপাদনে প্রয়োজনীয় বিলেট আগে আমদানি করতে হতো যা এখন দেশেই তৈরি হচ্ছে। শ্রমঘন উৎপাদনমুখী শিল্প তৈরি পোশাক পণ্যের কাঁচামাল, সুতা, কাপড় থেকে শুরু করে মোড়ক পর্যন্ত প্রায় সবকিছুই আগে আমদানি করতে হতো যা এখনো অব্যাহত আছে। তবে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও অন্যান্য উপকরণের প্রায় সবই তৈরি করার সক্ষমতা গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। দেশের উদ্যোক্তারা একসময় ছিলেন শুধু ট্রেডিং নির্ভর এবং গত ১০ বছরে উদ্যোক্তারা এখন উৎপাদনমুখী হয়ে উঠেছেন। দেশের বড় শ্রমঘন উৎপাদনমুখী শিল্পের মধ্যে অন্যতম হলো পোশাক শিল্প। এ শিল্পের শুরুর দিকে বিদেশ থেকে উপকরণ আনার পর বাংলাদেশে শুধু সেলাইয়ের কাজটি করা হতো। এখন দেশের নিট পোশাকের ৯০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল দেশেই তৈরি হয়। আবার ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশের মতো উপকরণ দেশেই তৈরি হয়।
মূল্যসংযোজনের মাত্রা বেড়েছে ইলেকট্রনিকস শিল্পেও। একসময় ওয়ালটনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় বাজারে সরবরাহকৃত পণ্যের প্রায় সবকিছুই আমদানি করত। এখন ওয়ালটনসহ আরো বেশকিছু কোম্পানি স্থানীয়ভাবে ইলেকট্রনিকস পণ্য উৎপাদন করছে। স্মার্টফোনসহ নানা মোবাইল ডিভাইসও এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে।
দেশের ইস্পাত খাতেরও একই চিত্র। রড উৎপাদনের কাঁচামাল বিলেট এখন বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। দেশে রাসায়নিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও এখন আমদানিনির্ভরতা কমিয়েছে। হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের মতো পণ্যগুলো এখন আর আমদানি করা হচ্ছে না। আগে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে বিনিয়োগের বিষয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের ঔদাসীন্য ছিল। বর্তমানে অনেকেই এ শিল্পে বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসছেন। শক্তিশালী হচ্ছে প্রকৌশল শিল্পও। ওষুধ শিল্পেরও প্রয়োজনীয় বেশকিছু যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে। প্যাকেজিং শিল্পের অনেক মেশিনারিজও বাংলাদেশেই তৈরি হচ্ছে।
ইস্পাত শিল্পের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) তথ্যমতে, বর্তমানে শিল্পটির বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকায়। সংগঠনটির সদস্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৪০। ইস্পাত খাতে বর্তমানে ৯০ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবহার হচ্ছে ৫৫ লাখ টন। যদিও করোনার কারণে গত বছর সেটি ৩০-৩৫ লাখ টনে নেমে এসেছিল। অবশ্য এ বছরের শুরুতে ইস্পাতের চাহিদা আবার বেড়েছে। এ খাতে এরই মধ্যে ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন উদ্যোক্তারা। ইস্পাতের বাজারে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে আবুল খায়ের, বিএসআরএম গ্রুপ, জিপিএইচ ইস্পাত, কবির স্টিল ও এমওএইচ স্টিল। সরকার ও শিল্পোদ্যোক্তারা দেশে মেগা শিল্পের বিকাশ ও আমদানি বিকল্প শিল্পোৎপাদনকে ত্বরান্বিত করার বিষয়ে সচেষ্ট রয়েছেন। যাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা রয়েছে, তারা এগিয়ে আসছেন। এর সুফল পাচ্ছে ছোট ছোট উদ্যোগ। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প ও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা মেগা প্রকল্পগুলো সামনে রেখে উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। অর্থনীতিতে মূল্যসংযোজনের পরিসংখ্যানে এর সুফলই দেখা যাচ্ছে। নির্মাণ খাতের আরেক বড় অনুষঙ্গ সিমেন্ট। শুধু আবাসন খাতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় নিয়েই সিমেন্ট বা ইস্পাতের মতো শিল্পগুলোর আরো অনেক বড় হওয়ার সুযোগ দেখতে পাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্যমতে, মাথাপিছু ইস্পাত ও সিমেন্ট ব্যবহারে বাংলাদেশ এখনো প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। তবে এখন একটু একটু করে হলেও এ চিত্র বদলাচ্ছে। একসময় দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ছিল শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক। এখন তা বিভাগীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। সিমেন্ট খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) তথ্যানুসারে, বর্তমানে দেশে সিমেন্টের বাজার ২৮ হাজার কোটি টাকার। এ খাতে ৩৬টি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। এর মধ্যে পঁচিটি বহুজাতিক। সিমেন্ট খাতের সম্মিলিত উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে ছয় কোটি টন। যদিও ব্যবহৃত হচ্ছে সাড়ে তিন কোটি টন। উদ্যোক্তারা এ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন। সিমেন্ট খাতের শীর্ষ উৎপাদকদের মধ্যে রয়েছে আবুল খায়ের, লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ, বসুন্ধরা সিমেন্ট, সেভেন রিংস সিমেন্ট ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ।
করোনাভাইরাসের প্রকোপে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকারখানা মালিক ও সেবা খাতের বড় ব্যবসায়ীদের জন্য গত বছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা ঋণ দিয়েছিল ব্যাংকগুলো যার মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের ব্যবসায়ীদের ৪ শতাংশ সুদে দেয়া হয় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের ধরন ছিল চলতি মূলধন, যা দিয়ে দৈনন্দিন খরচ মেটানোর কথা। ঋণের টাকার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আপৎকালীন অর্থ প্রদানে সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতি দেখা যায়নি। শর্ত অনুযায়ী প্রাপ্ত ঋণের অর্থ প্রতিষ্ঠানের চলতি মূলধন হিসেবে ব্যয় হওয়ার কথা। বিশেষ এক পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সচল রাখতে দেয়া হচ্ছে এ প্রণোদনার অর্থ। সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসএমই ফাউন্ডেশন দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও পণ্যের বাজারজাতে সহায়তা করছে। সেই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও অন্যদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহ দেয়া উচিত। স্থানীয় বাজার নির্ভর শিল্পগুলো, তা ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ যে শিল্পই হোক সরকারের আরো মনোযোগী হতে হবে। এ শিল্পগুলোর সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা নিশ্চিতে সরকারি ও বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই আরো আধুনিক ধ্যানধারণা আয়ত্ত করা প্রয়োজন। স্থানীয় বাজার নির্ভর শিল্পগুলোর অবদান অর্থনীতিতে অনেক বেশি। তাই এ শিল্পগুলো বিকাশে আরো জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশিত। এ ভূমিকা নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক দশকে দেশের শিল্প খাতকে এক অনন্য উচ্চতায় দেখা যাবে বলে আশা করা যায়। দেশের এসএমই খাতের উন্নয়নে সম্পদের সুষম বরাদ্দ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিবাচক ও সহায়তাপূর্ণ মানসিকতা তৈরি করা দরকার। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সঠিক সেবা দেয়ার জন্য একটি ডাটাবেজ এবং প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে সহায়তাপূর্ণ মানসিকতাও জরুরি।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ



