বাংলাদেশের অর্থনীতির সালতামামি
২০২১ সালে কেমন ছিল মানুষের জীবন জীবিকা
ড: মিহির কুমার রায়: ২০২১ সালটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর কারন করোনা মহামারিতে বিধ্বস্ত জীবন-জীবিকার সাল ২০২০ থেকে নতুন তিক্ত সফলতা-বিফলতা, উন্নয়ন-অনুন্নয়ন এর অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২১ সালের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটু বুক ভরা আশার আলোর স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু সেই স্বপ্নের কতটুকু সফল বাস্তবায়ন হয়েছে, তা সময়ই বলে দিবে। তারপরও কথায় বলে আশায় বসতি। এই বছরটি অনেক দিক থেকে উল্লেখযোগ্য ছিল বলা যায় যেমন বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ (মুজিব বর্ষ) পালনের বছর, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছর, মুক্তিযুদ্ধ ৫০তম বছরে পদার্পনের বছর, ধারাবাহিক ভাবে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের এক যুগপূর্তি, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (জুলাই ২০২০- জুলাই ২০২৫) ঘোষণার বছর, শিক্ষার কার্যক্রম সীমিত আকারে শুরুর বছর, বন্ধ হওয়া ব্যবসায় স্বাস্হ্যবিধি মেনে চলার বছর, ভুয়া করোনা টেষ্টের সিন্ডিকেট ব্যবসা দমনের বছর, সরকারি ক্রয় ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের এবং করোনার হাত থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখার সকল পদক্ষেপ গ্রহণের বছর। এই বছরের আরও একটি যুগান্তকারী ঘটনা হলো বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতার জন্মশতবর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিকে শপথ গ্রহণ করিয়েছেন। এবার স্বাধীনতা দিবসেরও ছিল সুবর্ণজয়ন্তী। দেশের সব কটি জেলায় তরুণদের প্রাধান্যসহ সমাবেশের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে এই শপথ গ্রহণ করানো হয়। মূল অঙ্গীকার ছিল মুক্তিযুদ্ধে এবং বাংলাদেশের রূপায়ণে বঙ্গবন্ধুর অসামান্য ভূমিকা উপলব্ধি এবং তার স্বপ্ন অনুযায়ী অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ। এই ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় দিবসে উপস্থিত ছিলেন বন্ধু রাষ্ট্রের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, ভারতীয় ও রাশিয়ার সশস্ত্রবাহীনির প্যারেড যে দেশ দুটি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার সময় সাহায্য করেছিল যার ফলে নয় মাস যুদ্ধের ফসল এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
তথাপি বিদায়ী (২০২০) সালের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী ২০২১ সাল কেমন কাটলো এই বিশ্লেষন করাই এ প্রবন্ধের মূখ্য আলোচনার বিষয়:
এক: কভিড-১৯ এর প্রভাবে ২০২০ সালে প্রবাসে কর্মী পাঠানো হ্রাস পেলেও ২০২১ সালে কর্মী পাঠানো বেড়েছে, আবার একই সময়ে প্রবাসী আয় কমেছে বিধায় এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাস পুরোপুরি বন্ধ ছিল বিদেশে গমন করোনার প্রভাবের কারনে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে গেছেন ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৮৯৩ জন কর্মী। এই অভিঘাতে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত প্রায় ১৬ লাখ এবং মৃত্যুবরন করেছে প্রায় ২৯ লাখ মানুষ।
দুই: বিশ্লেষনে দেখা যায় যে, করোনার কারণে রফতানি খাতে ২০২০ সালে যে কমতি দেখা দিয়েছিল, ২০২১ সালে সেটা অনেকটা কেটে গেছে। প্রবাসী আয় কমলেও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরেক বড খাত পণ্য রপ্তানি এ বছরে বেড়েছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বরে) ১ হাজার ৯৭৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশীয় মুদ্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২১৫ কোটি টাকার সমান। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বলছে, বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। তবে এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে করোনাভাইরাসের নতুন ধরন, যার নাম ‘অমিক্রন’ যার ফলে রপ্তানিকারকেরা কিছুটা শঙ্কায় রয়েছেন। কারণ বিশেষত ইউরোপের কয়েকটি দেশে এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করার কারনে।
তিন: বাংলাদেশ ব্যাংকের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ব্যাংকগুলোর আয় বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে মুনাফাও। ২০২১ সালে ৩২টি ব্যাংকের মধ্যে ২৬টি ব্যাংক ২০২০ এর তুলনায় বেশি মুনাফা করেছে এবং ৬টি ব্যাংকের মুনাফায় নেগেটিভ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। তবে করোনার মধ্যে ব্যাংকিং খাত বেশ চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে চলছে, সব ধরনের সুদের হারের সীমারেখা বেঁধে দেওয়ার ফলে ভোক্তা-ঋণ ও অন্যান্য রিটেইল ব্যবসায় ব্যাংকগুলো আগ্রহ হাড়িয়েছে। তবে বিশাল জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে ২০২১ সালের সফলতা ছিল উল্লেখযোগ্য যেমন এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সেবা ইত্যাদি। আর করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালে কোনো টাকা পরিশোধ না করলেও সেই গ্রাহককে খেলাপি করতে পারেনি ব্যাংকগুলো। ২০২১ সালে নতুন সুযোগ-সুবিধা দিতে হয়েছে গ্রাহকদের, অন্য দিকে তলবি ঋণ চলতি বছরের মার্চ থেকে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আটটি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর পরও ২০২১ সালে নতুন করে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ১২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি ‘ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশন’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাসের শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ১৬৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, যা মার্চ মাসের শেষে ছিল ৯৪ হাজার ২৬৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। শুধু এপ্রিল-জুন’২১ সময়ে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৯৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। জুন ’২১ পর্যন্ত দেশে বিতরণকৃত মোট ঋণ ১১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকার মধ্যে বেড়েছে ১০ হাজার ৭০১ কোটি টাকা, যেটি মোট ঋণের ৮.৬১ শতাংশ এবং গত মার্চে এর হার ছিল ৮.৪৮ শতাংশ।
চার: বর্তমান সরকার কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পকিল্পনা গ্রহণ করেন যার মধ্যে রয়েছে রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১ এর আলোকে জাতীয় কৃষিনীতি, ৮ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট, ডেল্টাপ্লান: ২১০০ এবং অন্যান্য পরিকল্পনা। এ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার (২০১০-২১) রূপকল্প ২০২১ সালে বাস্তবায়ন হলো। এর ধারাবাহিকতায় ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পূর্ণ বাস্তবায়ন হলো এবং ২০২১ সাল থেকে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে। এ পরিকল্পনাগুলোর মাধ্যমে দেশ বড় রকমের অগ্রগতি অর্জন করল। কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার আগে প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। অবশ্য এরপর কিছুটা কমে এসেছে। বর্তমানে শিক্ষার হার ৭৫ শতাংশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে যেখানে ভারতের শিক্ষার হার বর্তমানে ৬৬, পাকিস্তানে ৭০ শতাংশ, মাতৃমৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি হাজারে ১৬৫-তে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে, শিশুমৃত্যু ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কমিয়ে এনে ২০২১ সালে পরিবারের গড় আকার ৪ এ এসেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতিতে ১ নম্বরে রয়েছে বিশেষত প্রবৃদ্ধির দিক (৫.৪%), মাথাপিছু আয়ে (২,৫৫৪ মার্কিন ডলার), শিক্ষার ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের দিক থেকে। মোটকথা, দক্ষিণ এশিয়ার সব সূচকে (স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মাথাপিছু আয়) বাংলাদেশ ১ নম্বরে। এই সর্বক্ষেত্রে অর্জন সম্ভব হয়েছে, বাস্তবায়নযোগ্য দেশের পরিকল্পনাগুলোর জন্য যার মধ্যে ছিল প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং বর্তমানে চলছে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এ অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কৌশলগত প্রস্তুতি। ২০৩১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে হতদারিদ্র্যমুক্ত দেশ, ২০৪১ সালে অভীষ্ট লক্ষ্য কী অর্জন হবে; সেই সময় দারিদ্র্য কত থাকবে, বেকারত্বের হার কত থাকবে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রূপ কী হবে, কৃষি ক্ষেত্রের ভূমিকা কী হবে, শিল্প খাতের ভূমিকা কতটুকু থাকবে ইত্যকার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তৈরি হবে যা হলো ২০২১ থেকে ২০৪১ সময়ে।
পাঁচ: বর্তমান সরকার কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন সর্বাগ্রে যার প্রতিফলন পাওয়া যায় সব কাজে যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ফসলের ৩০৬টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে ৩৬৩টি। ধান বাদে অন্য সব ধরনের ফসল নিয়ে গবেষণা করা এই সংস্থা বর্তমানে ২১১টি ফসল নিয়ে গবেষণা করছে। ২০২১ সাল পর্যন্ত কৃষি খাতে উৎপাদন বেড়েছে বহুগুণ যেমন চাল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, পাট উৎপাদনে দ্বিতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, চাষকৃত মৎস্য উৎপাদনে দ্বিতীয়, গম উৎপাদনে সপ্তম ও আলু উৎপাদনে অষ্টম বলে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ, গম দুইগুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচগুণ। আলু, মৎস্য, মাংস ও ডিম উৎপাদনে বাংলাদেশ উদ্বৃত্ত। কৃষিকাজে যন্ত্রের ব্যবহার বিশেষত: ভূমি কর্ষণ, ফসল কর্তন ও মাড়াই, ধান ভানা ইত্যাদি বেড়েছে, কৃষিযন্ত্র সংগ্রহে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য সরকার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি মূল্যে যন্ত্র বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে যা হাওর, চরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় ভর্তুকির পরিমাণ বেশি। বর্তমানে কৃষি খাতে হার জিডিপিতে প্রায় ১২ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে শষ্য খাতের অবদান সর্বাগ্রে রয়েছে। বাজেটে কেবল কৃষি খাতে ১৬,১৯৭ কোটি টাকা ২০২১ সালে বরাদ্ধ রয়েছে আবার তার সাখে যদি মৎস, পশু সম্পদ, বন ইত্যাদিকে যোগ দিলে সার্বিক কৃষিখাতে বাজেট দাড়ায় ৩১ হাজার ৯৯৫ কোটি টাকা যা মূল বাজেটের ৫.৩ শতাংশ। কাজেই ব্যাপক অর্থে পল্লী উন্নয়ন খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা উন্নয়ন বাজেটের ২৯.৬ শতাংশ এবং অনুন্নয়ন বাজেটের ২০.২ শতাংশ বলে প্রতিয়মান হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, কৃষি যেহেতু একটি অগ্রাধিকারভুক্ত খাত এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এর সংগে সম্পৃক্ত তাই গত বছরগুলোতে এই খাতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছিল ৩২ হাজার ৫০২২ কোটি টাকা যা গড়ে প্রতি বছর দাড়ায় ৬৫০১.৪ কোটি টাকা এবং চলতি বছরের বাজেটের ভর্তুকির পরিমান হয়েছে ১০হাজার ০৯৯ কোটি টাকা। বর্তমান গনতান্ত্রিক সরকার মনে করছে কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকরন, কৃষি গবেষনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, কৃষির বহুমুখীকরন, রপ্তানীমুখী কৃষি পন্যের বানিজ্যিকীকরন, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরন ও গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী বিপুল জনগোষ্টির জীবন মান উন্নয়ন ইত্যাদিতে জোড় দিতে হবে। সেই ক্ষেত্রে বর্তমান বছরের বাজেটে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির (জিডিপি) যে টার্গেট ধরা হয়েছে তা অর্জনে কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম বিধায় সেই খাতে প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ৪.৫ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে বলে কৃষি অথনীতিবীদগন মনে করেন। কভিড-১৯ দেখিয়ে দিয়েছে রপ্তানিমুখী চিন্তা পরিহার করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্য উৎপাদন খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়ন বিষয়ে। কারণ ২০২০-২১ অর্থবছরে কভিডের কারণে ভারতসহ অনেক দেশের জিডিপিতে যেখানে নেতিবাচক সূচক পরিলক্ষিত, সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে খাতগুলো প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে, কৃষি তার মধ্যে প্রধানতম। এই অকালেও বাংলাদেশের জিডিপিতে গড় প্রবৃদ্ধি বিশ্বব্যাংকের মতে ৩.৬ শতাংশ, এডিবির মতে ৫.৫-৬ শতাংশ এবং সরকারি তথ্য মতে ৫.২ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি যা-ই হোক না কেন তা অর্জিত হয়েছে মূলত কৃষি, প্রবাসী আয় এবং পোশাক রপ্তানি খাত থেকে।
ছয়: স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশক ধরে বেসরকারী খাতে শিল্প তিন হাজার থেকে বেড়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে (২০২১) প্রায় ৮৮ লাখ কারখানায় পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করা হচ্ছে। এককালের বাংলাদেশের অর্থনীতি আগামী ২০৩৫ সালে হতে যাচ্ছে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ যেখানে দেশের কর্মক্ষম সাড়ে ৮ কোটি মানুষের অন্তত ৮০-৮৫ শতাংশেরই জীবিকা জড়িত বেসরকারী শিল্প খাতের সঙ্গে। বিশ্লেষকগন বলছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে কৃষিনির্ভর থেকে পুরোপুরি শিল্পনির্ভর দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালে বাংলাদেশের মোট জাতীয় উৎপাদনে (জিএনপি) কৃষি খাতের অবদান ছিল ৫৯.৪ শতাংশ, আর শিল্প ও সেবা খাতের অবদান যথাক্রমে মাত্র ৬.৬ শতাংশ ও ৩৪ শতাংশ। স্বাধীনতার পর বিগত ৫০ বছরে সময়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলো পাল্টেছে, ক্রমশ শিল্প ও সেবা খাতের বিকাশ হয়েছে, যা অর্থনীতির মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরের হিসাবে, মোট জিডিপি তিনটি খাতের মধ্যে কৃষি খাতের অবদান তৃতীয় স্থানে, সেবা খাতের অবদান শীর্ষে। গত অর্থবছরে জিডিপিতে সেবা খাতে অবদান ছিল ৫৩.১২ শতাংশ আর কৃষি খাতের অবদান কমে ১২.৩৫ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প খাত জোগান দিয়েছে ৩৪.৫৪ শতাংশ। শিল্পায়নের সম্ভাবনার কথা বিবেচনায় সরকার ১শ’টি অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেছে যার মূল লক্ষ্য বিনিয়োগকারী আকর্ষণ ও শিল্পায়নের মাধ্যমে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। শিল্প-বাণিজ্যসহ সব খাতের ক্রমবর্ধমান বিকাশে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে দেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বের ৪৫টি দেশের মধ্যে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে যার আওতায় খাতভিত্তিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকার মূলক ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী রফতানি হচ্ছে ১৯০টি দেশে। কৃষিভিত্তিক এবং আমাদানি নির্ভর দেশ হতে বাংলাদেশ ক্রমে পরিবর্তিত হয়ে একটি উৎপাদন নির্ভর রফতানিমুখী দেশে পরিণত হয়েছে। শিল্প খাতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি সাধিত হয়েছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআরইউ) ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি থাকবে ৭.৭ শতাংশ। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হবে এই ধারণা সংস্থাটি দিয়ে রেখেছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। করোনার আঘাত খানিকটা থমকে দিলেও সার্বিক চিত্র বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ সে পথেই হাঁটছে এবং উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশের প্রাথমিক শর্ত পূরন করতে পেরেছে যার চুড়ান্ত রুপ মিলবে।
সাত: সর্বশেষ চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। করোনা সত্ত্বেও এ বছর প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫.২৪ শতাংশ। মহামারির মধ্যেও রফতানি আয় হয়েছে ৩৮.৭৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্হা সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)-এর একটি প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বিকাশ অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশটি হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্হান বহু ধাপ ওপরে উঠে পৌঁছে যাবে ২৫ নম্বরে। বাংলাদেশ যেহেতু করোনাভাইরাসের মধ্যেও কিছুটা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে, তাই সামনের বছরগুলোতে বাংলাদেশে ধারাবাহিক ও জোরালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশা করছে সিইবিআর।
সর্বশেষে বলা যায়, ২০৭১ সালে বাংলাদেশের বয়স হবে ১০০ বছর তখন ৮৫ শতাংশ মানুষ হবে শহরবাসী। শহরের মানুষ যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, গ্রামের মানুষও একই রকম সুবিধা ভোগ করবে যেমন পাইপের মাধ্যমে পানি যাবে, বিদ্যুৎ যাবে এবং গ্রাম গড়ে তোলা হবে পরিকল্পিতভাবে। এই ভাবেই এগুচ্ছে দেশ তবে করোনা কাল (২০২০-২১) আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে যে মাথা উচু করে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের সকল ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে হবে মানবিকতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে। আসুন প্রবিনের অভিঙ্গতা ও নবিনের উদ্যম নিয়ে আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হই।
লেখক: গবেষক ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।



