করোনা নিয়ে গবেষণার ফলাফল কি?

মূল্যস্ফীতির উস্ফালন নিয়ন্ত্রনে থাকুক

ড:মিহির কুমার রায়: কোনো দেশের মুদ্রা যখন ক্রয়ক্ষমতা হারাতে থাকে এবং একই পণ্য কিনতে আগের চেয়ে অধিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়, সেই পরিস্থিতিকে বলা হয় মূল্যস্ফীতি। সাধারণভাবে মূল্যস্ফীতির দুটি কারণ যথা : বাজারে মুদ্রা সরবরাহ  বৃদ্ধি এবং কোনো কারণে পণ্যের উৎপাদন মূল্যের উস্ফালন। একটা সহনীয় মাত্রার মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক উন্নতির নির্দেশক এবং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে। উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির হার ২ থেকে ৩ শতাংশের  মধ্যে থাকা উচিত আর বাংলাদেশে  এটা হওয়া  উচিত ৫ শতাংশের নিচে। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি তথ্য অন্য সব সরকারি তথ্যের মতোই  আস্থাযোগ্য নয়। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আগে সরকারিভাবে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের কাছাকাছি যা আদৌ সঠিক তথ্য ছিল না।  অথচ টিসিবির ২০২০ সালের ১ মার্চ ও সাম্প্রতিক বাজার দরের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সে সময়ের তুলনায় এখন মোটা চালের গড় দাম সাড়ে ৩১ শতাংশ, খোলা আটার ২০ শতাংশ, খোলা ময়দার ৩৩ শতাংশ, এক লিটারের সয়াবিন তেলের বোতল ৪৩ শতাংশ, চিনি ১৯ শতাংশ, মোটা দানার মসুর ডাল ৩০ শতাংশ ও গুঁড়া দুধ ১৩ শতাংশ বেশি। মোটা চালের কেজি ৫০ টাকা পেরিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ এপ্রিল-সেপ্টেম্বর  সময়ে জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করলেও এ সময় দানাদার খাদ্যশস্য, বিশেষ করে চালের মূল্যস্ফীতির হার প্রায় সাড়ে ১২ থেকে শুরু হয়ে ১৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ এ সময় জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে চালের মূল্যস্ফীতি ছিল দ্বিগুণেরও বেশি যা কখনো কখনো তিনগুণের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। এটা ঠিক, জাতীয় গড় মূল্যস্ফীতিতে ভোক্তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তবে খাদ্যপণ্যের, বিশেষ করে প্রধান খাদ্য চালের মূল্যস্ফীতি দেশের স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এটা প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আগেই বাংলাদেশ মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। করোনা মহামারিতে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে বেশিরভাগ মানুষের আয়-রোজগার কমে গেছে, কারো কারো বন্ধই হয়ে গেছে। করোনার পর জীবনযাত্রায় কিছুটা স্বাভাবিকতা ফিরলেও দেশে আয় যেভাবে বাড়ছে, তার তুলনায় ব্যয় বাড়ছে তীব্র গতিতে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়ছিল, যার প্রভাব পড়েছে ছোট-বড় সব দেশে বিশেষ করে দেশে নিত্যপণ্য ও সেবার মূল্য বেড়েছে। ফলে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। । গত অর্থবছরে টানা পাঁচ মাস ধরেই বেড়েছে মূল্যস্ফীতি। খাদ্যসহ ভোগ্য পণ্যের দামের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে সদ্যবিগত বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে যা গত বছরের সর্বোচ্চ। গত ৬ই জানুয়ারি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) হালনাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত মাসে সাধারণ মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৬. ৫ শতাংশ । পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির এই হার ২০২১ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এবং এর আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫. ২৯ শতাংশ। ২০২১ সালের ১২ মাসের মূল্যস্ফীতির গড় দাঁড়িয়েছিল ৫. ৫৪ শতাংশ, যা আগের বছর  
ছিল ৫. ৬৯ শতাংশ। গড় মূল্যস্ফীতর আগের বছরের চেয়ে কম থাকলেও সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না বলে প্রতিয়মান হয়। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৫.৩০ শতাংশের মধ্যে  লক্ষ্য নিয়েছে সরকার এবং বিগত অর্থবছরের ৫ শতাংশের  লক্ষ্য  অর্জিত হয়নি। গত ডিসেম্বর মাসে খাদ্য উপখাতে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৫.৪৬ শতাংশ যা গত ডিসেম্বর মাসে এই হার ছিল ৫.৩৪ শতাংশ। পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত ডিসেম্বরে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেশি বেড়ে ৭ শতাংশে ওঠেছিল, যা আগের বছর একই সময়ে ছিল ৫.২১ শতাংশ।

বিবিএসসের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসেম্বরে গ্রামেও সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৬.২৭ শতাংশ হারে, যা আগের বছরের এই মাসে ছিল ৫.২৮ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ব্যাপক বেড়েছে যা আগের বছরের ডিসেম্বরের ৪.৬৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬.৯৪ শতাংশে ওঠেছে। অপরদিকে শহরাঞ্চলে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫.৬৬ শতাংশ হয়েছে। আগের বছর একই সময়ে ছিল ৫.৩১ শতাংশ। পয়েন্ট টু পয়েন্ট হিসাবে গেল ডিসেম্বরে শহরাঞ্চলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৪.৪১ শতাংশ হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪.৭৭ শতাংশ। আর শহরে এ সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭.০৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৫.৯৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তা সমন্বয় করতে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পণ্য ও সেবা খাতের ব্যয় বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতির হারে উল্লম্ফন ঘটিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে জনজীবনে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে, নিত্যপণ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির প্রভাব নিম্ন আয়ের মানুষকে চরম দুর্দশায় ফেলেছে। এমনিতেই করোনার কষাঘাতে চাকরিহারা, বেকার ও আয়-রোজগার কমে যাওয়া জনগোষ্ঠী দৈনন্দিন খরচের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন, তার ওপর মূল্যস্ফীতির চাপে বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়েছে অনেক পরিবার। এ অবস্থায় যে কোনো উপায়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাতে  না পারলে  মুদ্রার বিনিময় হার, আমদানি ও রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে । বস্তুত করোনা কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসার পর বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী সবকিছুর চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে ধনী আরও ধনী হবে যার ফলে সরকারি পর্যায়ে বেশকিছু নীতি পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়বে; যেমন ব্যাংকের সঞ্চয় সুদ ও ঋণের হার পরিবর্তন ইত্যাদি । 

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) সম্প্রতি প্রকাশিত যৌথ জরিপে জানা গেছে, করোনাকালে নতুন করে দরিদ্র হওয়া মানুষের সংখ্যা বর্তমানে ৩ কোটি ২৪ লাখ। সরকারি হিসাবেই করোনার আগে বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল পৌনে ৪ কোটি। অর্থাৎ নতুন দরিদ্রসহ বর্তমানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে সাত কোটি। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত এস্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে। দেশের কয়েকটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান/সংস্থার মতে, করোনার কারণে দারিদ্র্য হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে। এই যখন অবস্থা, তখন প্রধান খাদ্য চালের মূল্যস্ফীতি দেশের মানুষের, বিশেষ করে অতি গরিব, গরিব, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের জন্য অসহনীয় বোঝা হয়ে উঠেছে। তাই চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সরকারকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা নিতে হবে। এটা এখন খুব স্পষ্ট যে করোনার আগেই শ্লথ হয়ে আসা অর্থনীতি করোনার অভিঘাতে আরও অনেক খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। ওদিকে বৈশ্বিক অর্থনীতি শ্লথ থাকা এবং বৈদেশিক অনেক কর্মী তাঁদের সঞ্চয় দেশে পাঠানোর কারণে করোনার সময় দেশে ডলার রিজার্ভ বেড়েছিল । করোনার প্রভাব কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক কর্মীদের টাকা আসায় ভাটার টান শুরু হয়েছে। ফলে এখন দেশে প্রতিদিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যমান কমছে। এর ফলে সরাসরি ভোক্তার কাছে যাওয়া আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আবার স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই কোনো না কোনো আমদানি করা পণ্য প্রয়োজন হয়, ফলে দাম বাড়ছে সেগুলোরও। এ অবস্থায় উৎপাদন বৃদ্ধি ও বাজার নজরদারি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিকে কমাতে উদ্যোগ নিতে হবে।

লেখক: গবেষক ও  অর্থনীতিবিদ।


Comment As:

Comment (0)