সংশোধিত বাজেট ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা
ড: মিহির কুমার রায়: বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে বিগত ৩রা জুন ২০২১ইং তারিখে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের এ যাবৎকালের দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট পেশ করেছিলেন বর্তমান সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী, যাকে বলা হয় করোনাকালের বাজেট। সেই হিসাবে বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম দেওয়া হয়েছে 'জীবন জীবিকার প্রাধান্য ও আগামীর বাংলাদেশ'” প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের তেরতম বাজেট এটি এবং অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের এটি তৃতীয় বাজে। এই বাজেটে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা মোট জিডিপির ১৭.৪৭ শতাংশ, আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ৯২ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা এবং ঘাটতি (অনুদানসহ) ধরা হয়েছিল ২ লাখ ১১ হাজার ১৯১ কোটি টাকা, যা জিডিপির হিসাবে ৬.২ শতাংশ। এই বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩৭ হাজার ৭৮ কোটি টাকা এবং পরিচালন ব্যয় ৩ লাখ ৬১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, টাকার অঙ্কে প্রতিবছরই বাজেটের আকার বাড়ছে। কিন্তু করোনার এই বিশেষ পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের আয় কমে গেছে, সেই সঙ্গে কমেছে মানুষের ভোগব্যয়। এখন জোর দিতে হবে মানুষের কর্মসংস্থানে। সাধারণ মানুষের আয় বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বলতাগুলো কাটাতে বিশেষ উদ্যোগ প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, এরইমধ্যে বিগত বছরের অর্ধেক সময় (জুলাই-ডিসেম্বর’২১) অতিবাহিত হয়েছে এবং ধারাবাহিক নিয়মে প্রতি বছরের মাঝামাঝি এসে বাজেট সংশোধন কার্যক্রম শুরু করে অর্থমন্ত্রণালয়, যার ব্যতিক্রম বর্তমান বছরেও হয়নি। এরইমধ্যে চলতি অর্থবছরের (২০২১-২২) সংশোধিত বাজেটের পরিপত্র জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয় যেখানে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেমন কোনোভাবেই অতিরিক্ত বরাদ্দ দাবি ও উন্নয়ন ব্যয়ের সাশ্রয় হওয়া অর্থ পরিচালনা বাজেটে স্থানান্তর করা যাবে না, যেসব প্রকল্প অনুমোদন হয়নি সেসব ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া যাবে না এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সাশ্রয়কৃত অর্থ আর ভিন্ন খাতে স্থানান্তর করা যাবে না।
নির্দেশনায় বলা হয়, মূল বাজেটে সংস্থান ছিল না, এমন কোনো সম্পদ সংগ্রহের নতুন অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে না। আর সরবরাহ ও সেবা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো যাবে না। তবে কোনো আইটেমের মূল্য বাড়লে সেটি বিবেচনায় নিয়ে বরাদ্দ বাড়ানো যেতে পারে। পাশাপাশি অপ্রত্যাশিত খাত থেকে কোনো অর্থ বরাদ্দ হয়ে থাকলে সংশোধিত বাজেটে তার প্রতিফলন নিশ্চিত করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, যানবাহন কেনার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় বরাদ্দের ৫০ শতাংশ করতে পারবে। পাশাপাশি জরুরি ও অপরিহার্য ক্ষেত্র ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবে না। ভ্রমণ ব্যয়ের ক্ষেত্রে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেখান থেকে ৫০ শতাংশের বেশি ব্যয় করা যাবে না। ভ্রমণ ও যানবাহন কেনার বাকি ৫০ শতাংশ বরাদ্দ স্থগিত থাকবে। এই দুই খাতের বরাদ্দ অন্য খাতে স্থানান্তর করা যাবে না। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের নীতি ও উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এডিপি সংশোধনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোকে ১৪টি নিদের্শনা দেওয়া হয়েছে ওই পরিপত্রে যেখানে ধীরগতির প্রকল্পের টাকা কেটে দ্রুতগতির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বন্যাত্তোর, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি পুনর্বাসনসংক্রান্ত প্রকল্প।
মন্ত্রণালয়গুলোর উদ্দেশে বলা হয়, সংশোধিত এডিপিতে অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা যাবে, তবে সে ক্ষেত্রে অনুমোদিত প্রকল্পের ব্যয় ও ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয়ের ভিত্তিতে যুক্তিসঙ্গত ও সম্ভাব্য ব্যয়কে বিবেচনায় নিতে হবে। এতে আরও বলা হয়, আগামী জানুয়ারির মধ্যে যেসব প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো সম্ভব হবে না- সেগুলো আরএডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এ ছাড়া অনুমোদনহীন কারিগরি সহায়তা প্রকল্পও সংশোধিত এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা যাবে না। তবে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাত্তোর পুনর্বাসন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছেএ ছাড়া এডিপিতে প্রকল্পের সংখ্যা সীমিত রাখা, অগ্রাধিকার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাদ দেওয়া, আরএডিপিতে মূল অংশে বরাদ্দবিহীনভাবে কোনো প্রকল্প না রাখা এবং চলতি অর্থবছরে শেষ হবে এমন নির্দিষ্ট প্রকল্পের বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। জারি করা পরিপত্রের আলোকে চলতি অর্থবছরের বাজেট সংশোধনের প্রস্তাব সব মন্ত্রণালয়কে ৫ জানুয়ারির মধ্যে অর্থ বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দ থেকে প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১২ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা খরচ হয়েছে যা শতাংশের হারে ৫. ৩১ ভাগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, নানা কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য মতে, ২০২১-২২ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে এক লাখ ২৬৭ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়েছে। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। তবে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩ হাজার ৯৮ কোটি টাকা কম আদায় হয়েছে। রাজস্ব সংশোধনের ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় বলা হয়, বিগত দুই অর্থবছরের (২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১) প্রথম ছয় মাসে এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে আদায়ের গতিধারা বিবেচনায় নিয়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদগনের ভাষ্য হলো বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া অর্থ পুরোটা খরচ করতে পারে না অনেক মন্ত্রণালয়। ফলে নতুন করে অর্থ চাইবে কেন। নতুন বরাদ্দ দিলেও ব্যয় করতে পারবে না। মন্ত্রণালয়গুলোর যে প্রকল্প আছে সেখানে অর্থ ব্যয়ের প্রভিশন আছে। সেটি সীমিত রাখাই উচিত। এক খাতের অর্থ অন্য খাতে নেওয়ার প্রবণতা থাকা উচিত নয়। এমনিতে অনেক প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় একনেকে। এর মধ্যে অনেক প্রকল্পে অর্থ সংস্থান থাকে না। ফলে অনুমোদন প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়া উচিত।
বাজেট বিশ্লেষন দেখা যায়, করোনার মধ্যে গত বছরের বাজেট বাস্তবায়নে অর্ধেক হওয়ার বিষয়টি আমলে না নিয়েই তৈরি করা হয়েছে বর্তমান অর্থ বছরের বাজেট প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রী তার ২০২১-২০২২ আর্থিক বছরের বাজেট সমাপনী বক্তৃতায় মহান জাতীয সংসদে বলেছিলেন, কবোনা মোকাবেলা করে বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন অর্থের কোনোরকম অভাব হবে না। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে, যা সরকার অবগত আছে। কিন্তু এর উন্নয়নের গতিধারায় কবে নাগাদ এই সক্ষমতা একটি গ্রহনযোগ্য পর্যায়ে পৌছাবে তা বলা দুস্কর। এর জন্য প্রশিক্ষন ও তদারকির কোন বিকল্প নেই সত্যি কিন্তু একটি রোড ম্যাপ ধরে আগাতে হবে।
প্রায়শই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর সক্ষমতা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীভূক্ত প্রকল্পগুলোর ব্যয় দক্ষতা/ব্যয়ের মান নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন শোনা যায়; কভিড-১৯ অতিমারীর কারণে স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আরো প্রকট হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ .৩ শতাংশ এবং মোট বাজেট বরাদ্দের ৭.২ শতাংশ। কিন্তু স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দকৃত বাজেটের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। এমনকি ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ১০০ কোটি টাকা স্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দ ছিল অথচ খরচ হয়নি বরাদ্দের এক টাকাও বিধায় এ খাতে অর্থ বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ মনিটরিং প্রয়োজন। কভিড-১৯ ও অন্যান্য রোগ বিষয়ে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও তার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে, সেক্ষেত্রে এ বিভাগের বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে।
করোনাকালীন বাজেট বাস্তবায়নের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ লক্ষ্যনীয়।
রাজস্ব আহরন, অবকাঠামোগত ঘাটতি, অগ্রাধিকার ভিত্তিক সরকারি ব্যয় নির্ধারন, ঘাটতি বাজেটের আর্থিক ব্যবস্থাপনায়, বৈদেশিক ঋন প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তি ঋনের প্রতিবন্ধকতা, রফতানী আমদানী বানিজ্যে সমতা আনয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সঞ্চয় বিনিয়োগের ভারসাম্য রক্ষা ইত্যাদি চ্যালেঞ্জগুলো রয়েছে যা বর্তমান বছরেও একেবারেই দৃশ্যমান। এখন বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা রোড ম্যাপ তৈরি, রাজস্ব আদায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, প্রকল্পের গুনগত বাস্তবায়ন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করলে অনেক চ্যালেঞ্জই মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। অর্থনীতিবিদদের কাছ থেকে যার ভিত্তিগুলো সরকারকে আমলে নেয়া উচিত।
কারণ, রাজস্ব আয়ের আহরণের একটি বড় প্রতিষ্ঠান হলো এনবিআর যার সাথে সরকারের স্থায়ীত্বশিলতার প্রশ্নটি জড়িত। সে ক্ষেত্রে উক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নৈতিক ভিত্তি তথা প্রশাসনিক কাঠামো আরো জোরদার করতে হবে, নতুন নতুন করদাতা সংগ্রহ, উপজেলায় আরও অফিস স্থানান্তর করতে হবে এবং বেশী বেশী কর মেলার আয়োজন নতুন অঞ্চলগুলোতে করতে হবে। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন দক্ষতা বৃদ্ধি, ব্যয়ের মান উন্নয়ন ও অব্যাহত দুর্নীতি প্রতিরোধে উদ্যেগী মন্ত্রনালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, পরিকল্পনা কমিশন, অর্থমন্ত্রনালয়ের অর্থ অনুবিভাগকে উন্নয়নের সহযাত্রী হিসাবে কাজ করতে হবে। সর্ব শেষে বলা যায় বাজেট সংশোধনের প্রয়োজন হয় বাস্তবায়নের অপরিপক্ষতার কারনে যার সমাধান জরুরী নচেত দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন বেহত হতে বাধ্য।
লেখক: গবেষক ও অর্থনীদিবিদ, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।
বিনিয়োগাবার্তা/এসএএম//



