মিহির স্যার

বাংলা ভাষা কি স্বদেশে প্রবাসী?

ড: মিহির কুমার রায়ঃ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনের সেই দিনগুলো এবং জীবন উৎসর্গ করা স্মৃতিগুলো এখন ইতিহাস। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এই ১৯টি বছর দেশের মানুষ কাটিয়েছে অনেক সংগ্রামের মাধ্যমে জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এবং এর সফল বাস্তবায়ন হয় ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় যা জাতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে পষ্ঠা ৯২ এ লিখেছেন- “সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চকে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্র সভা করে ঐ তারিখের তিনদিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম”। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই ১৯৫২ সালেই বাংলাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে যান। ওই বছর তিনি চীনের পিকিংয়ে (২-১২অক্টোবর) অনুষ্ঠিত বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা করেন। কেন তিনি চীনের বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ দেন তার উল্লেখ রয়েছে 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' (পৃষ্ঠা ২২৮)-তে। তিনি বলেছেন, 'পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথকে না জানে এমন শিক্ষিত লোক চীন কেন দুনিয়ার অন্যান্য দেশেও আমি খুব কম দেখেছি। আমি ইংরেজিতে কথা বলতে পারি। তবু মাতৃভাষায় কথা বলা আমার কর্তব্য।' এরপর স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বাংলায় বক্তৃতা করেন। আসলে বাংলায় বক্তৃতা করে বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাভাষাকে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে পরিচয় করানো নয়, বাঙালির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য এবং ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার বার্তাও পৌঁছে দেন। কিন্তু এত আত্মত্যাগ সেই ভাষা আজ কতটা টেকসই? শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই মাতৃভাষা ভুলে যাওয়া মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বুকের রক্ত দিয়ে গেছেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো অনেকে যার বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলা ভাষা তথা। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই ভাষা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয় ও ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৯৩টি রাষ্ট্রে প্রতিবছরে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে যা বাংলার বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় এটি একটি বড় ধাপ। আমাদের বড় পরিচয় আমরা বাঙালি- আমাদের ভাষা বাংলা। আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য চিন্তা ও বোধ- এক। বাঙালি হিসেবে অহংকার করার মতো আমাদের রয়েছে হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আজ আমাদের গর্বিত পরিচয়- মাতৃভাষার জন্য আমরা রক্ত দিয়েছি বিধায় আমরা একুশের উত্তরাধিকার। কিন্তু আমরা কি এখনো এই ভাষার মর্যাদা যথাযথভাবে দিতে পারছি? ১৯৮৭ সালে দেশে আইন করা হয় যে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার ও প্রয়োগ করা হবে। কিন্তু তা কম মানা হচ্ছে। কিন্তু আমরা এ ব্যাপারে কতটা কী করতে পেরেছি? আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বটে, কিন্তু সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই কেন? এই ব্যর্থতার দায় সবার। কথা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা হবে একমুখী, কিন্তু তাও হলোনা। আমরা রাষ্ট্র বদল করলাম কিন্তু সমাজ বিনির্মাণ করতে পারলাম না যার জন্য প্রয়োজন বৈষম্য দূরীকরণে একমুখী শিক্ষা ব্যস্থার নিশ্চিত করা একুশের শিক্ষা হলো সমষ্টির পক্ষে কোনো বিজয়ই অসম্ভব নয়। স্বাধীন বাংলাদেশেও জোটবদ্ধ আন্দোলনের সুফলের নজির রয়েছে, আমরা যেন বায়ান্ন ও একাত্তরের অঙ্গীকার ভুলে না যাই। ২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে আমাদের নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের অন্যতম অনুষঙ্গ অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ব্যাপকভাবে যে মেলাটি একুশের বইমেলা হিসেবে পরিচিত।

আমাদের দেশের শিক্ষিত তরুণদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাকে ইংরেজির চেয়ে কঠিন মনে করে। ইংরেজি ভাষার আগ্রাসনের কারণে অনেক দেশের ভাষা-ই এখন অস্তিত্ব সংকটে। বর্তমান বিশ্বে অন্যতম উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে মাতৃভাষাকে টেকসই করতে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থানটা কি তা আলোচনার দাবি রাখে। ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভাষাবিদদের পাশাপাশি রাষ্ট্র এবং প্রযুক্তিবিদদেরও সক্রিয় হতে হয়। মায়ের ভাষায় প্রযুক্তি ব্যবহার করেই দেশকে এগিয়ে নিতে হবে। আমাদের ইতিবাচক দিক হচ্ছে প্রযুক্তিমনস্ক সরকার ক্ষমতায়। প্রযুক্তির ব্যবহার করে বাংলা ভাষায় লেখাপড়া ও চর্চা এবং ভাষাকে টেকসই করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিন্তা এবং তার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টার বিশেষজ্ঞ জ্ঞান থেকে উৎসারিত সরকারি কিছু উদ্যোগ দেশকে আশাবাদী করছে। প্রধানমন্ত্রী এক দরজা থেকে সেবা প্রদানের প্ল্যাটফর্মের (জেলা তথ্য বাতায়ন) নাম বাংলায় রাখেন। এরই ধারাবাহিকতায় সর্ববৃহৎ প্ল্যাটফর্মটিরও নাম রাখা হয় 'জাতীয় তথ্য বাতায়ন'। এতে রয়েছে ৫২ হাজার ওয়েবসাইট, যা বাংলা ও ইংরেজিতে। ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোবাইল ফোনে বাংলায় খুদে বার্তা (এসএমএস) চালুর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ বিনির্মাণের ধারণাকে সামনে রেখে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার চর্চা হলেও এ মুহূর্তে বাংলায় ভালো কনটেন্টের অভাব রয়েছে। তাই দেশের ১৭ কোটির বেশি মোবাইল ফোন, ১৩ কোটিরও বেশি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং ৫ কোটির বেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীর কথা মাথায় রেখে মাতৃভাষায় ভালো ভালো কনটেন্ট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি হবে। আর তা করা হলে শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও মানুষে মানুষে যোগাযোগ বৃদ্ধি, জ্ঞানার্জন এবং তথ্য ও সেবা পাওয়া নিশ্চিত করবেনা, মাতৃভাষাকে বাঙালির মাঝে চিরঞ্জীব করতে সহায়তা করবে। কিন্তু সমস্যাটা হলো এক: মাতৃভাষার মাধ্যমে সব স্তরে এবং সব জনপদে শিক্ষাকে যদি কার্যকরভাবে জনপ্রিয় করা না যায়, তাহলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং এর প্রাসঙ্গিক উন্নয়ন নিয়ামকগুলোর তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি কোনো ভাবেই সম্ভব নয়; দুই: র্বতমান সরকার সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও জাতি গঠন, শিক্ষার মাধ্যম, আধুনিক জ্ঞান ও কর্মশক্তিতে বলীয়ান করা সহ বহু উদ্দেশ্য সামনে রেখে শিক্ষার উন্নয়নে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষা সংস্কারের নামে কমিশন জাতির সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার যে ভিত বিশেষত ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে তা খুবই দর্বল। যেমন ভাষা কি তাহলে মনের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যম তা আমাদের কোমলমতি শিশুদের বোঝানোর মত শিক্ষক তেমন নেই। এই দুর্বলতা নিয়ে যখন এই শিশুরা বড় হয়ে উচ্চপর্যাযে যায় তখর ভাষার প্রতি যে জাতীয়তাবোধ তা আর সৃষ্ঠি হয় না যা একটি বড় দুর্বলতা বলে প্রতিয়মান; তিন: আকাশ সংস্কৃতির কারনে অনেক ক্ষেত্রেই ইংরেজির ব্যবহার বাংলা ভাষার মর্যাদা নষ্ট করে দিচ্ছে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে তা মোটেই সুখকর নয়। এখনো দেশের বিজ্ঞজনদের অনেকেই সভা-সমিতিতে ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করেন। তাঁদের কথা যে সবাই বুঝতে পারছে না, সেটা জেনেও তাঁরা তা করেন। এর মাধ্যমে আমাদের চেতনার মধ্যে ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়; চার: বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণের কাজ এবং মৌলিক জ্ঞানসম্পন্ন সার্ভিস তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, আইওটির মতো প্রাগ্রসর মান (ফ্রন্টিয়ার) প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে। কিন্তু আমাদের ভিত্তিতে যে গলদ রয়ে গেছে তা দিয়ে ভাংলা ভাষা অনুশিলনকারীদের কতটুকু ফলপ্রসু হবে তা গবেষনার বিষয়; পাঁচ: বাংলায় কথা বলা আর শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা এক বিষয় নয়। এই বিষয়গুলোর প্রতি আমাদেল দৃষ্টি খুবি সীমিত। ব্যাপারটা এরকম যে একটি বাচ্চাকে শুদ্ধ ভাষা না শিখিয়ে তার হাতে পিতা মাতা একটি স্মার্টফোন ধরিয়ে দেয় যা ভয়ংকর হতে বাধ্যা এমনকি বিশ্বায়নের কারনে বাংলা ভাষা কি অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় স্থান করে নিতে পারবে? দেশের রাস্তায় বিলবোর্ডগুলোতে অসুদ্ধ বাংলার উচ্চারন বা পাশাপাশি রুচি বিবর্জিত ইংরেজী ছবিগুলো আমাদের অসুস্থতারই লক্ষন বলে প্রতিয়মান হয়। এতে থেকে বেড়িয়ে আসতে জাতীয় সমঝোতার প্রয়োজন।

লেখক: গবেষক ও ডীন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।


Comment As:

Comment (0)