এফএওর আঞ্চলিক সম্মেলন কি বার্তা দিয়ে গেল
ড: মিহির কুমার রায়: স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সনে বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)তে যুক্ত হয় যা’ বৈশ্বিকভাবে খাদ্য নীতি ও সুরক্ষা বিষয়ে কাজ করে। এখানে উল্লেখ্য যে, ১৯৪৫ সনের ১৬ অক্টোবর কানাডার কুইবেকে গঠিত হয় এফএও যার সদর দপ্তর ইতালিতে। জাতিসংঘের সদস্যভূক্ত রাষ্ট্রসমূহ এখানে খাদ্য সম্পর্কিত নীতিমালা, কর্মকৌশল, পরিকল্পনা নিয়ে বহুমুখী সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এফএও’র আঞ্চলিক সম্মেলন ৮-১১ মার্চ ২০২২ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে যাকে বলা হয় এফএও’র এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩৬তম সম্মেলন (এপিআরসি ৩৬)। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানা যায়, বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর সময় এই সম্মেলন আয়োজন বাংলাদেশের জন্য গর্বের ও সম্মানের। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে উদ্বোধনী আয়োজনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে কৃষি খাতে অর্থায়ন ও সহায়তায় বিশেষ তহবিল গঠন, প্রযুক্তি বিনিময় ও গবেষণা বাড়ানোর প্রস্তাব রেখেছেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে কৃষি সচিব বলেছিলেন, মুজিব বর্ষে বাংলাদেশে এশিয়া ও প্যাসিফিক আঞ্চলিক সম্মেলন আয়োজন দেশের কৃষি উন্নয়নের সাফল্যে মাইল ফলক হয়ে থাকবে। এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর কৃষি জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশের কৃষিতে ও এর বিরাট প্রভাব পড়বে। এ অবস্থায়, এ সম্মেলন সদস্য দেশসমূহের মধ্যে জ্ঞান, প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ক্ষেত্র প্রসারিত করবে ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
চার দিনব্যাপী এ সম্মেলন শেষ হয় ১১ মার্চ। এ সম্মেলনে ৪৩টি দেশ (৮টি সরাসরি ও ৩৫টি ভার্চুয়ালি) ও এসব দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের ৪২জন প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া, সদস্য রাষ্ট্র, এফএও’র মহাপরিচালক, জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের প্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও ও সিভিল সোসাইটির প্রায় ৯০০ জন সরাসরি অংশগ্রহন করেছিলেন। মূল অনুষ্ঠানের পাশাপাশি কান্ট্রি শোকেসিং, হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টাল ও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে কৃষি মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অংশগ্রহণে ১৭টি প্রদর্শনী স্টল আয়োজন করেছিল, ৯ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এ ছাড়া ৯ মার্চ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে এবং ১৩ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর সাথে এফএওর মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এই সকল দেশের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের প্রধান আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল কোভিড-১৯ মহামারি বিবেচনায় এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্য ও কৃষির অবস্থা বোঝা, উল্লিখিত অঞ্চলে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থা প্রসারের উদ্যোগ, কৃষি ভ্যালু চেইন ও ডিজিটালকরণ (ডিজিটালাইজেশন), উল্লিখিত অঞ্চলে ‘সর্বজনের স্বাস্থ্য (ওয়ান হেলথ)’ অগ্রাধিকার নিরূপণ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রাণ বৈচিত্র সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ। বাংলাদেশের প্রান্তজনের খাদ্য সংস্কৃতি ও সংগ্রামের জমিন থেকে কিছু পরিবেশ-জিজ্ঞাসা এফএওর ৩৬তম সম্মেলনের কাছে তুলে ধরছে চলতি আলাপ। খাদ্য আজ কেবল উৎপাদন, বন্টন, বিনিময়ের বিষয় নয়; খাদ্য আজ বহুজাতিক বাণিজ্যের একরফা মুনাফা ও নিয়ন্ত্রণের অংশ। তো এই খাদ্য কিংবা খাদ্য ব্যবস্থা আজকার নিয়ন্ত্রণে? পাশাপাশি কমছে কৃষি জমি, অরণ্য, জলাভূমি কী প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র, নিরদ্দেশ হচ্ছে অগণিত প্রাণ-প্রজাতি ও নানা সমাজের লোকায়ত জ্ঞান ভান্ডর। জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি টলছে করোনা মহামারি, তবুও খাদ্য এসেছে মানুষের ঘরে এবং তারপরেও অনেকের খাদ্য থেকে দূরে ছিল। তাহলে দুনিয়ার সকলে খাদ্য পাবে এমন নিশ্চয়তা একটি নীতিগত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। সংকট রয়েছে করোনা মহামারীর, জলবায়ু সংকট, ইউক্রেন যুদ্ধ, অমীমাংসিত কাঠামোগত বৈষম্য- একটা সময়ে এই গুরত্বপূর্ণ খাদ্য সম্মেলন হয়তোবা এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য কোনো বিশেষ বার্তা দিবে বলে প্রতিয়মান হয়। মহামারির মতো সংকটে সকল ধরণের শিল্প-কারখানা ও উৎপাদন বন্ধ হলেও একমাত্র কৃষি উৎপাদনই চালু থাকে। দীর্ঘ সময় লকডাউন থাকায় গ্রামীণ জনপদে বীজ, ফসল, উপকরণ কী কারিগরি জ্ঞান সবই বিনিময় করেছেন গ্রামীণ নারীরাই। পরিমাণ ও সংখ্যায় হয়তো কম কিন্তু এই উদাহরণ কর্পোরেট দখলমুক্ত হয়ে স্বনির্ভর কৃষির সম্ভাবনা তৈরি করে। কাজ হারানো গ্রামে ফেরা বহু মানুষকে কিছুটা হলেও কাজ দিতে পেরেছে এই কৃষি শিল্প। মহামারির কারণে অনেক ধরণের পেশা ও উৎপাদনের ধরণ ও চাহিদা বদলে গেছে। যারা এই দুম করে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনে অভ্যস্থ হতে পারেন নি পারিবারিক খাদ্য চাহিদা মেটাতে তাদের নিদার শংকায় কেটেছে সময়। কৃষি জমি হ্রাস, শ্রমিক সংকট, ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, ফসলের জাতীয় মূল্য কমিশন না থাকা, জলবায়ু দুর্যোগ, অস্থির বাজার, অনিরাপদ খাদ্য, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, অপুষ্টি কিংবা কাঠামোগত বৈষম্য কিন্তু করোনা মহামারিকালে কমেনি। বরংচ বহাল থেকেছে। তাই খাদ্য প্রশ্নকে কেবলমাত্র কোভিড সংকটের ময়দান থেকে এককভাবে বোঝা যাবে না, এমনকি এককভাবে কোনো নীতি বা পরিকল্পনাও গ্রহণ করা যাবে না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, আন্তর্জাতিক খাদ্য নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইফপ্রি), বিশ্ব ব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেশের চরম দারিদ্র্য (২০১৯-২০ সালে ১০ শতাংশ) নিরসনে কৃষি উৎপাদন গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইফপ্রির বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে ধান, পাট, কাঁঠাল, আম, পেয়ারা, আলু, সবজি ও মাছ উৎপাদনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বার্ষিক খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি প্রতিবেদন ২০১৯ অনুযায়ী, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫০ বছরে দেশের প্রধান প্রধান শস্য উৎপাদন তিন থেকে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি খাতের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আধুনিক ও বিরূপতা সহনশীল জাতের উদ্ভাবন, ফসলের নতুন ধরনের উদ্ভাবন, পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি আবিষ্কার, ভূ-উপরস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ এলাকার সম্প্রসারণ, সমন্বিত পতঙ্গ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি অনুসরণ, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, ট্রান্সজেনিক শস্য উৎপাদন ইত্যাদি। নিউক্লিয়ার ও জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে লবণাক্ত সহনশীল ও স্বল্প ব্যাপ্তির শস্যজাত এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এটি বিশাল উপকূলীয় এলাকায় ধান চাষাবাদের পরিধি প্রসারিত করেছে। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, সেচ যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা বৃদ্ধি, কৃষি সম্প্রসারণ, ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কৃষি উপকরণের ভর্তুকি বৃদ্ধি, কৃষি পণ্যের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য শস্যের পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধাদি নিশ্চিত করা, সব কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বন্যা প্রবণ এলাকায় এক বা দুই ফসলি জমি চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফসলের নিবিড়তা ২১৬ শতাংশ, যা ২০০৬ সালে ছিল মাত্র ১৬০ শতাংশ। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণের কারণে জীবিকা কৃষি ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈরী প্রকৃতির প্রভাবে ক্রমহ্রাসমান চাষযোগ্য জমি, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বন্যা, খরা, লবণাক্ততার বিপরীতে খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে দশম। চাষযোগ্য জমির অল্প অংশ সবজি উৎপাদনে ব্যবহার হলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন ২০.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সবজির উচ্চ ফলনশীল জাত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এ সাফল্য এসেছে। কৃষি তথ্যসেবার হিসাবে, বর্তমানে দেশে ১৫৬টি প্রচলিত ও অপ্রচলিত সবজি চাষাবাদ করা হচ্ছে। যার মধ্যে ৩৫টি হলো প্রধান সবজি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ১১৮টি দেশে ৫০ জাতের সবজি রফতানি করছে।
বাংলাদেশ সারা পৃথিবীর কাছে কৃষি গবেষনা ও উন্নয়নের রোলমডেল হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে যার একটি সোনালী অতীত রয়েছে। ইতিহাস থেকে দেখা যায় ১৮৮৪ সনে জামালপুরের চৈতন্য নার্সারীতে প্রাতিষ্ঠানিক বেগুন গবেষণা শুরু হয়। বাংলাদেশে গভীর পানির ধানের ক্ষেত্র ১৯৩৪ সনে হবিগঞ্জে গভীর পানির ধান গবেষণা শুরু হয়। বিশ হাজার জাতের ধান থেকে শুরু করে অগনিত প্রাণ প্রজাতি ও বাস্তু তন্ত্রের বৈচিত্র্যর গর্বিত অঞ্চল এই ছোট্ট বদ্বীপ। বাংলাদেশের গ্রামীণ কৃষি মূলত গড়ে উঠেছে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র, দেশি জাত বৈচিত্র, লোকায়ত জ্ঞান আর প্রতিনিয়ত জলবায়ু পাঠের অভিজ্ঞতায়। হরিপদ কপালীর হরিধান, ফকুমার ত্রিপুরার ফকুমার ধান, নুয়াজ আলী ফকিরের চুরাক ধান কিংবা দিলীপ তরফদারের চারলতা ধান এখনো এই স্বাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশের ভাসমান ধাপ চাষ আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘প্রাকৃতিক কৃষি ঐতিহ্য’। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষির গতিতে বিকশিত হয়নি বিশেষ করে সবুজ বিপ্লবের ধাক্কায় কৃষি বাস্তুতন্ত্র, পরিবেশ, বৈচিতত্র ও স্বাস্থ্য এক প্রশ্নহীন বিপদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। পাশাপাশি কৃষি জীবনকে প্রতিনিয়ত বিপদ, আপদ, দুর্যোগ সামাল দিতে হয়। অনাবৃষ্টি, খরা, অতি বৃষ্টি, বন্যা, পাহাড়ি ঢল, শৈত্য প্রবাহ, তীব্র তাপদাহ, শিলা বৃষ্টি, বজ্রপাত, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ের প্রাবল্য কিংবা কুয়াশার তারতম্য দেশের কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলসমূহে নানামুখী সংকট তৈরি করছে। কৃষি ও জুম আবাদ সহ সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনে তৈরি হচ্ছে ঝুঁকি ও বিশৃংখলা। জলবায়ু সহনশীল কৃষির বিকাশে দেশের কৃষি জীবনের লোকায়ত জ্ঞান চর্চা, আদি দেশি জাত এবং গ্রামীণ অভিযোজন কৌশলগুলোর সুরক্ষা, মর্যাদা ও স্বীকৃতি জরুরি। জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি গড়ে তুলতে অর্থায়ন ও বহুমুখী নীতি কৌশল গ্রহণ করতে হবে যেখানে প্রান্তিক কৃষক ও খাদ্য উৎপাদনকারীর সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। গবেষক হিসাবে কৃষি অর্থনীতিবিদগনের ধারনা এফএও এর আয়োজিত আঞ্চলিক সম্মেলন উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর উপর নজর দিয়ে বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার একটি ভান্ডার তৈরী করবে যেখানে বাংলাদেশ হবে এই পথের কান্ডারী তথা পথপ্রদর্শক যেমন :১) করোনা সারা পৃথীবিকে দেখিয়ে দিয়ে গেছে পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশ খাদ্য নিরাপত্তায় যে স্বনীর্ভর হওয়া উচিত তার অগাম বার্তা। যেমন ধরা যাক। খাদ্য ঘাটতি পূরণ করে বাংলাদেশ এখন খাদ্য রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, গুণগত খাদ্য নিশ্চিত সহ সব মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, জনসংখ্যা দ্বিগুণ বৃদ্ধি, কৃষি জমি অর্ধেক কমে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখন প্রায় খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশ এবং বিভিন্ন দেশে চাউল রপ্তানী করছে যা খাদ্য নিনাপত্তার একটি জলন্ত দৃষ্ঠান্ত; ২) জলবায়ু পরিবর্তন ও কোভিড-১৯ অতিমারিতে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্থ পুরো বিশ্ব। ১৯৬০ সাল থেকে শতাধিক বিপর্যয়ের জেরে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পৃথিবী ৫০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ। ২০২০ সালে আবহাওয়ার অবনতি ও জলবায়ুর পরিবর্তনগত কারণে ঘর ছাড়া হয়েছে ৪ কোটি মানুষ।।এই সংখ্যা বর্তমান বিশ্বের শরণার্থী জনসংখ্যার দ্বিগুণ। বিশেষত গত ২০ বছরে এশিয়ায় পরিবশগত কারণে উত্খাত হওয়া মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যেমন চীন, ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে লাখ লাখ মানুষ নিচু তটবর্তী অঞ্চলে বা বদ্বীপ-সংলগ্ন এলাকায় থাকে। এ্ই আঞ্চলিক সম্মেলন সেই সকল এলাকার কৃষি ও খাদ্যে যোগান/উৎপাদনে জলবায়ু তহবিল ফান্ড গঠন ও সুষ্ঠু বিতরনে সহায়তা করবে ;৩) ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানুষ জনপ্রতি প্রায় ২০০ গ্রামের মতো চাল খেয়ে থাকে যার পরিমাণ জনপ্রতি প্রায় ৪০০ গ্রাম যা কমিয়ে আনতে পারলে চালের উৎপাদন টেকসই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। পুষ্টিকর খাবার দুধ, মাছ, মাংস, ডিম, ফলমূল প্রভৃতি খাবার গ্রহণের পরিমাণ বাড়াতে পারলে চালের এ ব্যবহার কমবে। করোনা মহামারিতে ও দেশে খাদ্য সংকট হয়নি এবং দেশের উর্বর ভূমি ও পানি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে কৃষি আরও অনেক দূরে এগিয়ে যাবে; ৪) কৃষি ভ্যালুচেইনে অর্ন্তভূক্তিমূলক ডিজিটালকরণ প্রযুক্তিকে কৃষি খাতের বিকাশে সৃজনশীলভাবে কাজে লাগানোর আলোচনা শুরু হয়েছে ভার্চুয়াল দুনিয়ার বাস্তবতায়। কৃষকদের একত্র করে সমিতি গঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা প্রদান, ডিভাইস সহযোগিতা এবং কৃষকদের বিভিন্ন উপযোগী অ্যাপ ব্যবহার করণের ভেতর দিয়ে কৃষি কাজে একটা ভিন্ন মূল্যসংযোজনের কাজ করছেন অনেকেই। এফএও ডিজিটাল ক্লাব এবং ডিজিটাল গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে যেখানে অবশ্যই প্রযুক্তি ও অবাধ তথ্য প্রবাহের আওতায় সকলের সমান অভিগম্যতা জরুরি তবে তথ্যের ভিন্ন ব্যবহার খাদ্য উৎপাদনকে বিঘ্নিত না করে সেই বিষয়ে নজর দিতে হবে। সম্প্রতি সমাপ্ত ‘খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর সম্মেলন এই বার্তাই দিয়ে গেল বাংলাদেশের মাটিতে বসে প্রথমবারের মত যা বাংলাদেশ সরকারের অনেক অর্জনের মধ্যে আরও একটি নূতন সংজোযন।
লেখক: উন্নয়ন গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও ডিন, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা



