দারিদ্র্য বিমোচন মডেল ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের রূপকথা
ড: মিহির কুমার রায়: আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার দারিদ্র্য বিমোচন মডেল এরি মধ্যে দেশে বিদেশে সন্মানের স্থান করে নিয়েছে, যা ছিল স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর শ্রেষ্ঠ উপহার। বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে দারিদ্র্য বিমোচনের পথে যাত্রা শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে, যদিও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনটাই কেটেছে গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে এবং তিনি তার এক ভাষনে বলেছিলেন ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যায়, যদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না আসে, যদি দুঃখী মানুষ পেট ভরে ভাত খেতে না পারে, কাপড় পরতে না পারে, বেকার সমস্যা দূর না হয়, তাহলে মানুষের জীবনে শান্তি ফিরে আসতে পারে না। দেশের মাটির সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে, দেশের কালচারের সঙ্গে, দেশের ভূমিকার সঙ্গে, দেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করেই দেশের ইকনমিক সিস্টেম গড়তে হবে।
বঙ্গবন্ধু প্রণীত প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাটি (১৯৭৩-১৯৭৮) ছিল স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা যদিও সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ওই পরিকল্পনায় বিদেশী সাহায্যর উপর নির্ভরশীলতা ৬২ শতাংশ থেকে ১৯৭৭-৭৮ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। কৃষি ও কলে-কারখানায় উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৬ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণের পর দশ মাসের মধ্যে একটি সংবিধান প্রনয়ন করেছিলেন যার অধ্যায়ের ১৫-এর ‘ঘ’ অনুচ্ছেদে বলা হয়- ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবন যাত্রার বস্তুত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন। এই সংবিধানের চারটি মূল ভিত্তি ছিল সমাজতন্ত্র, গনতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম্ম নিরপেক্ষতা।
বঙ্গবন্ধু তখন সারাদেশের চৌষট্টি হাজার গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় সমিতি গঠনের ঘোষনা দিয়েছিলেন যা ছিল তখনকার সময়ের জন্য যুগান্তকারী ঘটনা যখন সে সময়ে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের চেয়েও বেশী।
সুদীর্ঘ ৫১ বছরের পথপরিক্রমায় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লিগ মাত্র তেইশ বছর দেশ শাসনের সুযোগ পেয়েছে এবং বঙ্গবন্ধুর তিন বছর ছয় মাস শাসনকাল বাদ দিলে ১৯৭৫ পরবর্তি দীর্ঘ ২১ বছরের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে দেশের জনগণ জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার উপর আস্থা রেখে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়। এই বছর ২৩শে জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে¡ জনগনের সরকার গঠিত হলে পরিকল্পনা ও নীতিতে স্থান পায় দারিদ্র্য বিমোচনের খাতগুলো যেমন সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসাবে বিধবা ভাতা, মুক্তিযুদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য আশ্রয়ণ, ঘরে ফেরা, একটি বাড়ি একটি খামারসহ আনুসাঙ্গিক বিষয়গুলো। পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে মেয়েদের জন্য বৃত্তি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ উল্লেখযোগ্য।
এই পথ পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যা কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুর লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে করে চলছেন তার মধ্যে রয়েছে গৃহহীনকে গৃহদান, আমার গ্রাম আমার শহর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, অষ্ঠম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কর্মসংন্থানের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান, কভিড-১৯ এর অভিঘাত থেকে গ্রামীন অর্থনীতিকে রক্ষায় প্রণোদনা প্রদান, এস,এম.ই. খাতের জন্য আলাদা আর্থিক প্রণোদনা, গ্রাম/কৃষি গবেষনায় বরাদ্দ বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নের বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপকল্প-২০২১-এর মূল উপজীব্য হিসাবে ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তবায়ন শুরু হলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি ক্রমাগত ২০০৯ সাল থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে। তার সাথে পরিকল্পনা ও নীতিতে সংযোজন হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারন যেমন ২০২০-২১ অর্থ বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশে কাজের বিনিময়ে দুস্থ ভাতাসহ ১২৩টির মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলছে যাতে বাজেট বরাদ্দ রয়েছে প্রায় ৯৫,৫৭৪ কোটি টাকা, যা জিডিপি এর আড়াই শতাংশেরও বেশি। টানা তিন মেয়াদে সরকার পরিচালনার অভিযাত্রায় সমাজের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নতুন নতুন কর্মসূচি যোগ হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ’নির্বাচনি ইশতেহার দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে অসামান্য দলিল হিসাবে আবির্ভূত হয়। এ ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকার একদিকে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের লক্ষ্যে গ্রহণ করে নানামুখী প্রকল্প, অন্যদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নিতে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি করা হয়।
এখন প্রধানমন্ত্রীর দারিদ্র্য বিমোচন মডেল নিয়ে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা যাক: এক: মুজিব বর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার হিসাবে বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ প্রকল্পটি গ্রামোন্নয়নের অনেক উদ্যোগের মধ্যে আরও একটি প্রয়াশ।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে সমবায় অধিদফতর ‘আমার গ্রাম-আমার শহর’ধারণায় গ্রামের বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখে ইতোমধ্যে ‘বঙ্গবন্ধু মডেল ভিলেজ’প্রকল্পের প্রস্তাবনা তৈরি করেছে। দেশের ১০ জেলার ১০ উপজেলার ১০ গ্রামে গড়ে পাঁচ হাজার জন করে মোট ৫০ হাজার মানুষ প্রকল্পটির উপকারভোগী হবেন। এই প্রকল্প দেশের আট বিভাগের নির্বাচিত জেলাগুলোয় বাস্তবায়ন করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর ও টাঙ্গাইল জেলা, ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর, চট্টগ্রামের কুমিল্লা, সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ, খুলনা বিভাগের যশোর, রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল জেলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে আগামী ১লা জুলাই, ২০২২ থেকে এবং সমবায় অধিদপ্তর হবে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন সংস্থা।
বঙ্গবন্ধুও কৃষি এবং পল্লী উন্নয়নকে সামগ্রীক উন্নয়নের মূল শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। এই প্রকল্পেও গ্রামের বৈশিষ্ট্য সমুন্নত রেখে সম্পদের সুষ্ঠু ও সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির আধুনিকায়ন-যান্ত্রিকীকরণ এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ ও বাজার অবকাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাকৃতিক ও মানব সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার করে ১০টি গ্রামের কৃষিখাতে ২৫ শতাংশ কৃষি উৎপাদন বাড়ানো হবে, মধ্যম আয়ের দেশ থেকে পর্যায়ক্রমে উন্নত দেশের মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষভাবে ১০ গ্রামের ১০ হাজার লোককে দক্ষভাবে গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা হবে। প্রত্যাশিত আর্থিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে ১০টি সমবায় সমিতি গঠনসহ প্রায় ৫ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ১০টি কমিউনিটি ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ১০টি গ্রাম সমবায় সংগঠিত করা, কৃষি উৎপাদনের যান্ত্রিক ও উত্তম পদ্ধতির প্রচলন করা, ১০টি গ্রামে দুটি এক একর পুকুরে মৎস্য চাষ ও প্রাণি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় দুটি গরু পালনের মাধ্যমে আধুনিক ও উত্তম পদ্ধতির প্রচলন, গ্রামীণ সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্জাগরণ এবং গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার কমানোর লক্ষ্যে কাজ করা। প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা মোতাবেক গ্রামকে শহরে পরিণত করার জন্য সরকারী সম্পদের শতভাগ সুষম বণ্টন, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা অনুযায়ী রাস্তা, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ, শতভাগ ভিক্ষুক মুক্ত করণ, শতভাগ বাল্য বিবাহ রোধ, শতভাগ ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত, বৃক্ষ রোপণ, মাদক নির্মূল, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন, কৃষককে সর্বোচ্চ সুবিধা প্রদান, পরিচ্ছন্ন হাট-বাজার, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিতে অগ্রগতি, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠন এবং বর্তমান সরকারের ব্যাপক উন্নয়নে গত কয়েক বছরের ব্যবধানে বদলে গেছে দেশের চিত্র যার আরও একটি সফল সংযোজন হবে এই প্রকল্প।
কৃষি খাত ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যেন গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের দ্রুতগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে। গ্রামীণ সমাজে জীবিকার বিচিত্রতা আনয়নের প্রচেষ্টায় দুটি প্রধান নিয়ামক রয়েছে: প্রথমত: গ্রামীণ অর্থনীতির প্রতিকূলতা যা গ্রামীণ জনগণ, বিশেষত দরিদ্রদের বিদ্যমান ক্ষেত-খামার ভিত্তিক কৃষিকাজের পাশাপাশি অকৃষি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করে এবং দ্বিতীয়ত: নতুন জীবিকার চাহিদা। এ ধারণা ব্যাপকভাবে গৃহীত যে কৃষি খাতের সঙ্গে অকৃষি খাতের সম্মিলন দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। অকৃষি খাতের উন্নয়ন সার্বিকভাবে কৃষি খাতের উন্নয়নকেও সহায়তা করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত বাংলাদেশে এ ধরনের জীবিকার সহমিশ্রণ গ্রামীণ সমাজকে আরো বেশি আত্মনির্ভরশীল করে তুলবে এবং দুর্যোগ কবলিত এলাকাগুলোকে স্থিতিশীল হতে সহায়ক হবে; তৃতীয়ত: বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ছিল বৈষম্যহীন সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা। জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যহীন সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সময়ে সর্বসাধারণের জন্য যে পেনশন-ব্যবস্হা প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছেন তা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।
বৈষম্যহীন কল্যাণকর রাষ্ট্র গঠন ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অঙ্গীকার। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর এ মাহেন্দ্রক্ষণে সর্বসাধারণের জন্য পেনশন স্কিমের উদ্যোগ সরকারের দূরদর্শী চিন্তার একটি সফল প্রতিফলন এবং সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসাবে সর্বসাধারণের জন্য ঘোষিত পেনশন-ব্যবস্হা উন্নয়ন অগ্রগতিতে আরো একধাপ নতুন মাত্রা সংযোজন করল; চতুর্থ্ত: বর্তমান সরকার কীভাবে দেশের অসহায় ছিন্নমূল মানুষের জন্য কাজ করছে, আশ্রয়ণ প্রকল্পই তার জলন্ত প্রমান যা সামগ্রিকভাবে পরিবারের কল্যাণ ও সামাজিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬০৮ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এ থেকে বাদ যায়নি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর মানুষও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতাধীন সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীভুক্ত ৪ হাজার ৮৩২ পরিবারের জন্য গৃহ নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে বসবাসরত ৮ হাজার ১০৬ পরিবারকেও গৃহ প্রদান করা হয়েছে। তাদের পেশা উপযোগী প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়েছে; পঞ্চমত: চতুর্থ শিল্প বিপ্লরের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ব্লকচেইন, আইওটি, ন্যানো টেকনোলজি, বায়ো টেকনোলজি, রোবটিকস, মাইক্রো প্রসেসর ডিজাইনের মতো ক্ষেত্রগুলোতে জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের পথে নেতৃত্ব দিতে সবাইকে একসঙ্গে উদ্ভাবনের পথে একযোগে কাজ করতে হবে, তাহলেই আমরা এগিয়ে যাব। বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কার, বিদ্যুতের ব্যবহার এবং ট্রানজিস্টার আবিষ্কার ব্যাপক শিল্পায়ন সৃষ্টির মাধ্যমে মানব সভ্যতার গতিপথ বদলে দিয়েছিল বলে ঐ তিন ঘটনাকে তিনটি শিল্প বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এখন বলা হচ্ছে, ডিজিটাল প্রযুক্তির নিত্য নতুন উদ্ভাবনের পথ ধরে আসছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, যেখানে বহু প্রযুক্তির এক ফিউশনে ভৌত জগত্, ডিজিটাল জগত্ আর জীব জগত পরস্পরের মধ্যে লীন হয়ে যাচ্ছে। ৪র্থ শিল্প বিপ্লব শুধু আমাদের কর্মজীবনেই পরিবর্তন করছে না, পালটে দিচ্ছে সবকিছুকেই। এটি প্রভাব ফেলবে পরিচয় সত্তায় এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব কিছুতে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তায়, সম্পদ মালিকানার ধরনে, ভোগের ধরনে, কাজ ও বিশ্রামের সময়ে, কর্মজীবন গড়ায়, দক্ষতা চর্চায়, মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতে এবং পারস্পরিক সম্পর্কে। ষষ্ঠত: ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় আর্থ-সামাজিক ব্যবধান কমিয়ে আনা হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নিতে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বহির্ভূত অধিকাংশ (প্রায় ৬০ শতাংশ) মানুষকে (যাদের আবার অধিকাংশই গ্রামের মানুষ) ব্যাংকিং সেবার অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১০ বছর আগে চালু হওয়া মোবাইল ব্যাংকিং খাতে নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ৯ কোটি ৬৪ লাখ এবং ২০২১ সালের এপ্রিলে লেনদেন হয় ৬৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থ বছরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে সরাসরি ৮৮ লাখ ৫০ হাজার ভাতাভোগীর কাছে ভাতা পৌঁছে দেওয়া হয়। ভাতাভোগীদের মধ্যে রয়েছে ৪৯ লাখ বয়স্ক মানুষ, ২০ দশমিক ৫০ লাখ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা এবং ১৮ লাখ প্রতিবন্ধী। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হয়েছে প্রতিবন্ধী, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসরদেরও; সপ্তমত: সরকার রূপকল্প-২০৪১ ঘোষণা করে তার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এ রূপকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য-২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত ও জ্ঞান ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। একই সময়ে একটি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ উপহার দেওয়া। ‘রূপকল্প-২০৪১’কে নীতিমালা ও কর্মসূচিসহ একটি উন্নয়ন কৌশলে রূপান্তরের জন্য এ প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-২০৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ দলিল মূলত ২০৪১ সালের মধ্যে এক সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ অর্জনে সরকারের উন্নয়ন রূপকল্প, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যগুলোর একটি কৌশলগত বিবৃতি এবং তা বাস্তবায়নের পথ-নকশা। চারটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি যেমন-সুশাসন, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠিত এ পরিকল্পনার সুফলভোগী হবে জনগণ এবং তারাই হবে প্রবৃদ্ধি ও রূপান্তর প্রক্রিয়ার প্রধান চালিকা শক্তি: অষ্টমত: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের গত দুই মেয়াদে বিদ্যুত খাতে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। তার দূরদর্শী নেতৃত্বে বিদ্যুত খাতের উন্নয়নে নেয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনা। সারাদেশে শতভাগ ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত নিশ্চিতে বিদ্যুত খাতে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। আওয়ামী লীগ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। সেটা আজ বাস্তব। দেশে এখন ৯৯.৫০% মানুষ বিদ্যুত সুবিধা পাচ্ছে, যা অচিন্তনীয়। সবই সম্ভব হয়েছে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী গণ মানুষের নেত্রী জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কল্যাণে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগেই স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর বিদ্যুত পায় ছিটমহলবাসী। ছিটমহলের ৩০৮ কিলোমিটার বিদ্যুত লাইন নির্মাণের ফলে ১১ হাজার ৮৮২টি পরিবার বিদ্যুত পেয়েছে। সম্প্রতি সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরের দ্বীপাঞ্চল সন্দ্বীপ ও বিদ্যুতের আলোয় হয়েছে আলোকিত। সরকাররে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সাহায্য করেছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড্। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্ভাবনী উদ্যোগ ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুত’পৌছে দেয়ার অঙ্গীকারকে সামনে রেখে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড্ তথা আরইবি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পল্লী বিদ্যুত সমিতির আওতাধীন ঝিনাইদহের- হরিণাকুন্ডু উপজেলা, ঠাকুরগাঁও সদরের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ও কালুখালী উপজেলা, পিরোজপুরের বামনা উপজেলা, হবিগঞ্জের লাখাই, শায়েস্তাগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও বাহুবল উপজেলা এবং জামালপুরের মেলান্দহ ও ইসলামপুর উপজেলার শতভাগ বিদ্যুতায়ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌছে দেয়ার কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলমান। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৮৬টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পাওয়ারসেলের তথ্য অনুসারে ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুত কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ২৭, যা বর্তমানে হয়েছে ১৪৬টি। ২০০৯ সালে বিদ্যুতের উৎপাদন ক্ষমতা ছিল চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াট। বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা ২৫ হাজার ২৩৫ মেগাওয়াট। তখন দেশে বিদ্যুতের গ্রাহক সংখ্যা ছিল এক কোটি আট লাখ এবং বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা চার কোটি ১৪ লাখ। সঞ্চালন লাইন ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার। বর্তমানে তা ১২ হাজার ৯৯৬ সার্কিট কিলোমিটার। মাথাপছিু বিদ্যুত উৎপাদন ছিল ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। বিগত কয়েক বছরের দৃশ্য তুলনা করলে বোঝা যায়, বিদ্যুতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভারত এবং পাকিস্তানের মতো দেশগুলো যেখানে এক্ষেত্রে শতভাগ সফলতা পায় নি, সে জায়গায় বাংলাদেশের এরূপ অর্জন সত্যিই ভূয়সী প্রশংসার দাবিদার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দারিদ্র্য বিমোচন মডেল বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। তারই নেতৃত্বে বাংলাদেশ কল্যাণ রাষ্ট্র হিসাবে বেড়ে উঠছে। গণমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনা, নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নের কারণে বাংলাদেশ একদিকে উন্নয়ন অভিযাত্রায় গৌরবময় অধ্যায় পার করেছে, অপরদিকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের অধিকতর দায়িত্ব গ্রহণে একের পর এক কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে অভাবনীয় উন্নতি হচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের আগেই দেশ হবে দারিদ্র্য শূন্য।
লেখক: গবেষক, উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও সিন্ডিকেট সদস্য, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।



