মিহির স্যার

রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়, হৃদয় মন্ডল এবং বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

ড: মিহির কুমার রায়: এখনও মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালনের আমেজ কাটেনি এবং দেশ যেখানে নূতন বাংলা বছরকে আলিঙ্গনে ব্যাস্ত তখনই কিছু কিছু ঘটনা বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলে যা দেশটির সৃষ্টির আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রতিয়মান হয়্। মুক্তিযুদ্ধের ৫১ বছর পর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ আজ কোথায় দাঁড়িয়ে এ প্রশ্ন এখন প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রগতিশীল সংগঠনসমূহের প্রতিনিধি ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো মুখে যেন কুলুপ দিয়েছে,  এখানেই সাম্প্রদায়িকতাকে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেওয়ার জায়গা। দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে লালনের মাঝে আমরা ঘৃণার সংস্কৃতি চালু করেছি। যার বিকল্প বা সাধারণ প্রতিশব্দ হলো ঘৃণা। এ রকম একটি মানসিক বিদ্বেষ এর শিকার হয়েছেন বিজ্ঞানের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডল। একটি পরিকল্পিত শত্রুতা বা বিদ্বেষের আশু সমাপ্তি ঘটাতে সরকার ব্যর্থ হলে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে মুক্ত করতে দেশে-বিদেশে মৌলবাদ বিরোধী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে। সাম্প্রদায়িকতার চারটি প্রধান বিষয় আমাদের শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছে যা হলো নেতিবাচকতা;  সংকীর্ণতা; অন্যায়কে মেনে নেয়া এবং সমাজের স্বার্থকে উপেক্ষা করা। সাম্প্রদায়িকতা সমস্যার এ বীজ বপন হয়েছে ১৯ শতকে,  ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকদের আমল থেকে এবং বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সাম্প্রদায়িকতা ছড়িযে ও নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর এক শ্রেণীর মানুষ।

বাংলাদেশ তার ৫১ বছর চলার পথ পরিক্রমায় অনেক উন্নতি সাধন করলেও কিছু কিছু প্রশ্ন এখনও অমিমাংসিত রয়ে গেছে যার বিস্ফুরন জাতি কিছু দিন পর পরি শুনতে পায় যা জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু কখনও কল্পনা করেন নি। এই সকল ঘটনার তালিকা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সমাজ বিশ্লেষক,  গবেষক, শিক্ষাবীদ যারা অসাস্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তাদেরকে ভাবিয়ে তুলছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষকের মান অপমান এখন আলোচনার তুঙ্গে যারা মানূষ গড়ার কারিগর বলে প্রথাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত/সন্মানিত হওয়ার কথা সমাজে। কিন্তু আমরা এখন কোথায় অবস্থান করছি, কিভাবে আছি তা মিডিয়ার বদৌলতে সবার ঘরে ঘরে যে বার্তাটি পাওয়া যাচ্ছে তা আমাদেরকে সাবধান করছে বার বার যেমন ধর্ম্ম নিয়ে সমাজে এক শ্রেনীর মানুষের মধ্যে্ উৎসুক, হয়রানি, রাজনীতি, বানিজ্য যেখানে বিশেষ শ্রেণী গোষ্ঠির শিক্ষকরা বার বার লাঞ্ছিত হচ্ছে যা সমগ্র শিক্ষক সম্প্রদায়কে দেখিয়ে দিচ্ছে মানুষ গড়ার কারিগররা তাদের অবস্থানে নেই যার সদ্যপ্রাপ্ত প্রমাণ বিক্রমপুরের ধলেশ্বরীর তীরে অবস্থিত মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুরের শত বর্ষ পার হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের ঘটনা যেখানে নিরীহ বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলকে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দুটি মামলা ও ১৯ দিনের কারাবাস,  তীব্র আন্দোলনের মুখে সেই শিক্ষক জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন ইত্যাদি। এখন সবাই দায় খালাস করে বলছেন,  শিক্ষক হৃদয় মন্ডল খুব ভালো মানুষ ছিলেন,  জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা তারা ধলেশ্বরীর স্রোতে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। ঘটনার বিবরনে প্রকাশ শত বর্ষ পার হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে বছর ত্রিশেক আগে  ‘আর কে’ উচ্চ বিদ্যালয় করার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা মাথা চড়া দিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছায়,  স্কুলে ১৩ জন অমুসলিম শিক্ষকের চাকরি করাই দায় হয়ে পড়ে। কিছু হলেই ধর্মের বিষয় টেনে এনে অমুসলিমদের কটাক্ষ করা হতো। 

ছাত্ররা সাধারণত শ্রেণী কক্ষে শিক্ষকের বক্তব্য রেকর্ড করে না। তবে সেদিন তারা মুন্সীগঞ্জ জেলায় এই স্কুলের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের বক্তব্য রেকর্ড করেছে সেখানে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার সময় কয়েক জন ছাত্রকে বার বার ধর্মের প্রসঙ্গ টেনে প্রশ্ন করতে শোনা যায়। ঐ শিক্ষকের কাছে ধর্ম ও বিজ্ঞান নিয়ে ছাত্রদের যে ধরনের প্রশ্ন ছিল তা আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে করা হয়েছে বলেই অনেকের ধারণা। আর এর পরই তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করা হয়।  ঘটনা পরম্পরায় স্কুলটির শিক্ষক এবং সেখানকার আইনজীবীদের অনেকেই সন্দেহ করছেন পুরো ঘটনাটি পূর্ব পরিকল্পিত। অনুসন্ধানে জানা যায় দীর্ঘ দিন ধরে এই স্কুলের মেনেজিং কমিটিতে দ্বন্দ বিদ্যমান এবং বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ে দুই শিফটে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। আগে শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করলেও এখন পরিচালনা কমিটির কারণে স্কুলটি করুণ অবস্থা পৌঁছেছে। তাদের নানা রকম আর্থিক দুর্নীতির কারণে স্কুলটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। স্কুল কমিটির সদস্য ও প্রধান শিক্ষক মিলে মিশে এই টাকা ভাগ বাটোয়ারা করে নেন। এসবের বিষয়ে শিক্ষকরা কথা বললেই কমিটির লোকজন তাদের অপমান,  হেনস্ত করেন যা দুর্বল শ্রেনীর শিক্ষকরাই বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সার্বিক মূল্যায়নে দেখা যায় যে- 

এক:  বাংলাদেশ ধর্মের নামে সাম্প্রতিক সময়ে এমন সব কর্মকান্ড সংঘটিত হয়ে আসছে যা নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী, অসাংবিধানিক,  লজ্জাকর ও দুর্ভাগ্যজনক। দেশে মৌলবাদী শক্তি তাদের অবস্থানকে অনেক পাকাপোক্ত করে ফেলেছে। বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী হয়তো বড় রকমের সহিংস কোনো ঘটনা ঘটাতে পারছে না তবে এরা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিয়োজিত কর্মকর্তা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতর অনুপ্রবেশ করতেও সমর্থ হয়েছে। সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিক্ষক,  শিল্পী ও সাধারণ মানুষকে নানা ভাবে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনায় মূল চার নীতি যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান স্মারক তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মানুষের মৌলিক অধিকারকে অগ্রাহ্য ও অবমাননা করছে। মুন্সীগঞ্জের বিনোদপুর রাম কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মন্ডলের বিরোধীয় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে তাকে সুপরিকল্পিতভাবে হয়রানিমূলকভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে যা একটি দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। এখানে উল্লেখ্য বার বারই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র এবং বিশেষ ধর্মীয় শ্রেনীর শিক্ষকদের টার্গেট করা হচ্ছে যেমন নারায়নগন্জের বন্দর থানার শিক্ষককে স্থানীয় এমপি লাঞ্ছিত করেছে যা ছিল দু:খজনক;

দুই: রাম কুমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিষয়টিকে মিটমাট করে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তা না করে অফিস সহকারিকে দিয়ে মামলা করিয়ে হৃদয় চন্দ্র মন্ডলকে জেলে দিয়েছেন। তাতে প্রধান শিক্ষকের মান বাড়ল না স্কুলের মান বাড়ল তা ভেবে দেখার বিষয়। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত;

তৃতীয়ত: স্থানীয় ক্ষমতাসিন দলের নেতাগন (এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান)  কেন বিষয়টিকে আমলে না নিয়ে বিষয়টিকে একটি জাতীয় ইস্যুতে রুপান্তরিত করেছেন যেখানে সরকারের ভাবমুর্তির বিষয় জড়িত রয়েছে;

চতুর্থত: স্বাধীন দেশে বিজ্ঞান চর্চা করতে গিয়ে একজন শিক্ষককে গ্রেফতার হতে হয়েছে -এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা। বিজ্ঞানের ক্লাসে কেন ধর্মের প্রশ্ন আসবে?  এমনটা মেনে নেয়া যায় না। মৌলবাদীদের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা দেশের নৈতিক অবস্থানের ওপর আঘাত হানছে। প্রগতিশীল সমাজ গড়ার পক্ষে বাধা সৃষ্টি করছে। এই অপশক্তিকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস আর বিজ্ঞান হচ্ছে প্রমাণিত সত্য - এমন যুক্তিনিষ্ঠ কথার জন্য কারাগারে যেতে হয়েছে হৃদয় মন্ডলকে। এ কারণেই অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল দুঃখ করে বলেছেন,  হৃদয় মন্ডলকে যেহেতু গ্রেফতার করা হয়েছে তাকেও গ্রেফতার করা হোক।

সর্বশেষ: বাংলা নববর্ষের প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান বিদাত বলে ঘোষণা আমাদের মনে এই ছায়াপাত করে যে,  রাষ্ট্র কাঠামোর অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী মৌলবাদী শক্তি তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছে। বিচ্ছিন্নভাবে ধর্মান্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী সহিংস ঘটনা ঘটিয়েছে যা সামাজিকভাবে জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছে। 

লেখক: গবেষক


Comment As:

Comment (0)