সারের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে কৃষক
ড: মিহির কুমার রায়: সম্প্রতি ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানোয় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কৃষি উৎপাদনে এবং এবার আমন মৌসুমে বৃষ্টি কম হওয়ায় সেচের ব্যয়ও বেড়েছে। এরপর রয়েছে-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট। এ অবস্থায় সারের দাম বাড়ানোয় তারা চোখে শর্ষে ফুল দেখছেন। সবকিছু মিলে কৃষি খাতে উৎপাদনের খরচ বাড়বে।
অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী মৌসুমে চালসহ কৃষিপণ্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প পণ্যের দাম বাড়বে। তবে কেউ কেউ বলছেন, উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়লেও খুব বেশি আশঙ্কার কারণ নেই। এখানে উল্লেখ্য যে ইউরিয়া সারের দাম কেজিতে ৬ টাকা বাড়িয়েছে সরকার যার ফলে প্রতি কেজি সার ১৬ টাকার পরিবর্তে কিনতে হবে ২২ টাকায় যা শতকরা হিসাবে এই বৃদ্ধি প্রায় ৩৮ শতাংশ। আর একজন ডিলার পর্যায়ের দাম ১৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ টাকা করা হয়েছে। এর কারণ হিসাবে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যটির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ঋণ পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার এবং ভর্তুকি কমাতে আইএমএফের চাপ রয়েছে যা সারের দাম বাড়ানোর জন্য এটিও একটি কারণ। সারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে পণ্যের দামে প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে কৃষি পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। এছাড়াও দাম বাড়বে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন শিল্প পণ্যের। সামগ্রিকভাবে যা মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলবে। ‘ইউক্রেন রাশিয়ার যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়েছে। এক্ষেত্রে দেশের বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখার জন্য সরকারের কাছে বিকল্প ছিল ভর্তুকি বাড়ানো। বর্তমানে সামষ্টিক অর্থনীতির যে অবস্থা সেখানে ভর্তুকি বাড়ানো কঠিন।’ এদিকে কৃষকরা বলছেন, চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদন ব্যয় উঠবে কিনা-তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। বেশি সমস্যায় আছেন বর্গাচাষিরা। তারা বলছেন, সারের দাম বৃদ্ধি এবং অনাবৃষ্টিসহ শ্রমিক ব্যয় ও আনুষঙ্গিক যে ব্যয় হবে, তাতে চলতি মৌসুমে আমন চাষে নির্ঘাৎ লোকসান হবে। এর সঙ্গে তাদের নিজেদের শ্রমের মূল্য যুক্ত করলে লোকসানের পাল্লা আরও ভারি হবে। যে সব জেলায় বেশি ধান উৎপাদন হয়, তার মধ্যে দিনাজপুর অন্যতম। কিন্তু সারের দাম বাড়ানোয় দুশ্চিন্তার কথা বলছেন জেলার কৃষকরা। তাদের মতে, এক একর জমিতে এবার আমন আবাদ করতে খরচ বাড়বে ৫শ টাকা এবং বোরো আরও বেশি, প্রতি একর জমিতে আমন আবাদ করতে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয় ৮০ থেকে ৯০ কেজি, টিএসপি সার লাগে ৪০ কেজি, পটাশ ৪০ কেজি, জিংক ৪ কেজি এবং সালফারের প্রয়োজন হয় ২ কেজি। আর কীটনাশক প্রয়োগ করতে খরচ হয় ৪২শ টাকা থেকে ৪৩শ টাকা। জমিতে হালচাষ, ধান রোপণ থেকে কর্তন পর্যন্ত সারসহ সব মিলিয়ে প্রতি একর জমিতে আমন আবাদ করতে খরচ হতো ৩৪ থেকে ৩৬ হাজার টাকা। আর আমন আবাদ হয় প্রতি একরে ৪০ থেকে ৪৫ মন। ধান বিক্রি করে অধিকাংশ টাকাই চলে যায় এই উৎপাদন খরচে। কিন্তু হঠাৎ ইউরিয়া সারের দাম বৃদ্ধিতে প্রতি একর জমিতে বাড়তি খরচ গুনতে হয় ৫শ থেকে ৬শ টাকা। তাই ধানের দাম ভালো না পেলে লোকসান গুনতে হবে তাদের।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা বলছেন কৃষকরা বরাবরই মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সার ব্যবহার করে থাকেন। এ বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করার চেষ্টা করা হলেও কাজ হয় না। তাই দাম কিছুটা বৃদ্ধির মাত্রাতিরিক্ত ইউরিয়া সারের ব্যবহারের প্রবণতা কমবে। এতে জমির উর্বরা শক্তিও ঠিক থাকবে। এখানে উল্লেখ্য যে চলতি মৌসুমে দিনাজপুর জেলায় ২ লাখ ৬০ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ২ আগস্ট পর্যন্ত ৬০ শতাংশ জমিতে আমন রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। রাজশাহীর, এক কৃষক বলেন চারা রোপণ করতেই ১৪ হাজার টাকা খরচ, এর মধ্যে অনাবৃষ্টির কারণে তাকে সেচ বাবদ বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (বিএমডিএ) দিতে হয়েছে ৩ হাজার টাকা, শ্রমিক বাবদ গুনতে হয়েছে ৫ হাজার, সার বাবদ ব্যয় ২ হাজার, ধানের চারা এবং হাল চাষে খরচ আরও ৪ হাজার টাকা। তাই, এক বিঘা জমিতে চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান মাড়াই পর্যন্ত খরচ হয় ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা আড়াই বিঘা জমিতে খরচ হবে অন্তত ৪২ থেকে ৪৩ হাজার টাকা। কিন্তু এই জমিতে সর্বোচ্চ ৫০ মন ধান হবে, আবার ধান মাড়াইয়ে ৫ মনে ১ মন করে পারিশ্রমিক দিতে হয়, ফলে ঘরে ধান উঠবে ৪০ মন। প্রতি মনের দাম সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা থাকলে আয় হবে ৪০ হাজার টাকা অর্থাৎ ২ থেকে ৩ হাজার টাকা লোকসান হবে। এরপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা তো রয়েছেই, তারপর যদি আবার সারের দামে বাড়তি পয়সা গুনতে হয় তাহলে তো কী করবে বুঝতে পারছি না।
একজন বর্গাচাষি বলেন চলতি মৌসুমে আট বিঘা জমি বর্গা নিয়ে আমন চাষ করেছেন, অনাবৃষ্টির কারণে তাকে সেচ বাবদ প্রথমেই ১৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সারের মূল্য বৃদ্ধি। মৌসুমের শুরুতেই ইউরিয়ার দাম বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গবেষকরা বলছেন সারের দাম না বাড়িয়ে সরকারের সামনে বিকল্প ছিল ভর্তুকি বাড়ানো যা বাজেটেও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে ভর্তুকি বাড়ানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এ কারণে বাড়তি চাপ কমাতেই সারের দাম বাড়ানো হয়েছে। মনে হচ্ছে, প্রভাব সীমিত আকারে থাকবে। কারণ হিসাব মনে হয়, সারের দাম বাড়ানোর ফলে প্রতি কেজি ধান উৎপাদনে ২০ পয়সা বাড়তি ব্যয় হবে। অন্যদিকে যেহেতু চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী এরপর সারের দাম বাড়ানোয়, আগামী মৌসুমে যে চাল বাজারে আসবে, তার মূল্যে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে সামগ্রিকভাবে মনে হচ্ছে, অত বেশি আশঙ্কার কারণ নেই। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি কেজি ইউরিয়া সারের বর্তমান দাম ৮১ টাকা, এর ফলে ৬ টাকা দাম বাড়ানোর পরও সরকারকে প্রতি কেজিতে ৫৯ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। ডিএপি সারে শতকরা ১৮ শতাংশ নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সারের উপাদান রয়েছে। সেজন্য ডিএপির ব্যবহার বাড়িয়ে ইউরিয়া সারের অপ্রয়োজনীয় ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে আনার জন্য সরকার ডিএপি সারের মূল্য প্রতি কেজি ৯০ টাকা থেকে কমিয়ে ১৬ টাকা করে কৃষকদের দিয়ে যাচ্ছে। এ উদ্যোগের ফলে বিগত কয়েক বছরে ডিএপি সারের ব্যবহার দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০১৯ সালে ডিএপি ব্যবহার হতো ৮ লাখ টন, বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে ১৬ লাখ টন। ডিএপি সারের ব্যবহার বাড়ার ফলে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে ইউরিয়ার বেড়েছে। ২০১৯ সালে ইউরিয়া ব্যবহার হতো ২৫ লাখ টন, বর্তমানে ব্যবহার হচ্ছে ২৬ লাখ ৫০ হাজার টন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে তিন ধরনের পণ্যের আমদানি, মোট আমদানি ব্যয়ের ৩০ শতাংশের বেশি। এগুলো জ্বালানি, খাদ্য এবং সার। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তিন ধরনের পণ্যের দামই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে সারে সরকারের ভর্তুকিও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছর পর্যন্ত সাড়ে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।
প্রতি বছর সার, বিদ্যুৎ, ডিজেলসহ কৃষি সরঞ্জামের দাম বাড়ে, আর চাষাবাদে নিজের পারিশ্রমিক হিসাব করলে লোকসান হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি হলে কৃষকের আত্মহত্যা ছাড়া উপায় থাকে না। সরকারি যেসব বরাদ্দ আসে, সেগুলো প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। এমন পরিস্থিতি সারের দাম বৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। বর্ষার মৌসুমে সার বেশি ব্যবহার হয়, ১ একর জমিতে প্রায় ১শ কেজি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়, তবে এই সারের দাম বৃদ্ধির ফলে অনেক খরচ বাড়বে।
ইন্টারন্যাশনাল গ্রেইনস্ কাউন্সিল (আইজিসি) বলছে, ২০২২-২০২৩ সালে বৈশ্বিক খাদ্যোৎ্পাদন কমে যাবে, মজুতও গত আট নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হবে। বিশ্বে খাদ্যোৎ্পাদন যে কমে যাবে তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আর এর পেছনে রয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণ। প্রত্যক্ষ কারণ হলো—যুদ্ধের কারণে দেশ দুটির খাদ্যশস্য রপ্তানি বাধাগ্রস্থ হওয়ায় গুদামে খাদ্যশস্য পচে যাচ্ছে এবং পচে যাওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ প্রলম্বিত হলে যুদ্ধরত দেশ দুটির চাষিরা স্বাভাবিকভাবে খাদ্যশস্য উৎপাদনে নিরুতৎসাহিত হবে। ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন কমে যাবে। অন্যদিকে রাশিয়া বিশ্বের তৃতীয় জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারী দেশ এবং বিশ্বে গ্যাস রপ্তানিতে অন্যতম। রাশিয়া ইউরোপের গ্যাসের মোট চাহিদার ৪০ শতাংশের জোগানদাতা। আমেরিকাসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া ইউরোপে তাদের জ্বালানি তেল ও গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। হু হু করে বেডে যাচ্ছে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম। ফলে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিকারক বিভিন্ন দেশের সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার খরচ বাডছে, যা পরোক্ষভাবে ঐসব দেশে খাদ্যোৎ্পাদন হ্রাসে ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা-ডব্লিউএফপি বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এতবড় খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হয়নি বিশ্ব। সামনে খারাপ সময় অপেক্ষা করছে বলেও সতর্ক করছে সংস্থাটি। ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি আরো প্রকট হলে আমদানি-নির্ভর দেশগুলো বেকায়দায় পড়বে। এমতাবস্থায়, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাটা অতি জরুরি। বিশ্ববাসীর খাদ্য চাহিদা পূরণে বিশ্ব নেতারা যুদ্ধ বন্ধসহ খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই প্রত্যাশা। বাংলাদেশও এর সাথে সহমত পোষন করছে যাতে আগামী দিনেও এই সংকট কাটিয়ে দেশ সামনের দিকে যাবে, যা বর্তমান সরকার এতে আশাবাদি বলে প্রতিয়মান হয়।
লেখক: গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ।
বিনিয়োগবার্তা/ডিএফই/এসএএম//



